এমআইটিতেও ভর্তি হওয়া সম্ভব


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-10-21 08:17:13 BdST | Updated: 2018-11-13 10:45:54 BdST

বাবার ব্যবসার কারণে ছোটবেলায় আমেরিকায় থাকতেন মাইশা। একটু বড় হতেই বাবার মনে হলো, সন্তানদের নিজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার। সে জন্য ২০১০ সালে সবাইকেই তিনি দেশে পাঠিয়ে দেন। তবে বলে দেন, ‘স্কুল পর্ব শেষ করে, পড়াশোনার জন্য চাইলে আবারও আমেরিকায় ফেরা যাবে।’

দেশে এসে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন মাইশা। এরপর নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। এ পর্যায়ে ভাবলেন, আমেরিকায় ফেরা যাক! কিন্তু কোথায় পড়বেন, সে সিদ্ধান্ত তখনো নিতে পারেননি। কোনো এক গল্পের বইয়ে পড়েছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) কথা। বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট ঘাঁটলেন। আগ্রহ বাড়তে থাকল। জানলেন, আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অনেক রিকোয়ারমেন্টস দরকার। যেমন, স্যাটের স্কোর, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিস (ইসিএ)। এত কিছু লাগবে ভেবে শুরুতে ভড়কে গিয়েছিলেন মাইশা। ভেবেছিলেন, আমেরিকায় যেতে পারলে হয়তো কোনো সাধারণ মানের কলেজেই পড়তে হবে তাঁকে। নয়তো দেশেই বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। তবে আস্থা ছিল, খাটতে পারলে এমআইটিতে ভর্তি হওয়া সম্ভব। সে নবম শ্রেণি থেকেই এক্সট্রা কারিকুলারে মন দিলেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকলেন। ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘স্পেলিং বি’তে হলেন সেমিফাইনালিস্ট। এরই মধ্যে গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছেন প্রতিবছর। এর পর বায়োলজি অলিম্পিয়াডেও নাম লেখালেন। এ প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্বও করলেন তিনি। পাশাপাশি লেখালেখিতেও মনোযোগ দিলেন মাইশা। নটর ডেম কলেজের স্টোরি রাইটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম হলেন। এভাবে সমৃদ্ধ হলো তাঁর এক্সট্রা কারিকুলারের ভাণ্ডার।

তবে মাইশার একসময় খেয়াল হলো, কমিউনিটি সার্ভিস বা সমাজ সেবামূলক কোনো কাজ করা হয়নি তাঁর। অথচ আমেরিকান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। সেখানকার প্রতিটি হাই স্কুল শিক্ষার্থীকে যেকোনো হাসপাতাল, সিটি করপোরেশন ইত্যাদি জায়গায় দিতে হয় স্বেচ্ছাশ্রম। অথচ বাংলাদেশে সে নিয়ম বলতে গেলে একেবারেই নেই। মাইশা তাই ভাবনায় পড়ে গেলেন। তারপর কী করলেন, শোনা যাক তাঁর কাছ থেকেই—“আমি দুটি ফাউন্ডেশনের খোঁজ পেলাম—‘জাগো’ ও ‘দুর্নিবার’। ওদের হয়ে পথশিশুদের মাঝে খাবার বিলি করাসহ বেশ কয়েকটি ইভেন্টে কাজ করলাম। মনে পড়ে, একদিন ‘জাগো’র জন্য সারা দিন ঘুরে ঘুরে তহবিল সংগ্রহও করেছি। আরেকটি মজার কাজ আমি নিজ উদ্যোগেই করেছিলাম—ছোট ভাইকে ইংরেজি ও অঙ্ক পড়ানো। পাশের বাসার বাচ্চাদের হোমওয়ার্কেও সাহায্য করতাম। তবে এটি ঠিক টিউশন ছিল না। পড়াতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে। এসব যদিও শুরুতে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি ভেবে করিনি, তবে কলেজে আবেদনের সময় এগুলোও উল্লেখ করে দিলাম। আর একাদশ শ্রেণিতে উঠে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম ‘স্যাট’র। ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস ছিল বলে তা আমাকে বেশ সাহায্য করেছে। প্রতিদিন নিয়ম করে খুব সকালে পড়তে বসাও কাজে দিয়েছে। ও-লেভেলে ৯ বিষয়ে ‘এ প্লাস’ ও এক বিষয়ে ‘এ’ এবং এ-লেভেলের প্রথম বর্ষে পাঁচটি ‘এ প্লাস’ পেলাম। ও-লেভেলে দেশসেরা রেজাল্ট করেছি তিন বিষয়ে—ইংরেজি ভাষা, বাংলাদেশ স্টাডিজ ও এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট। এ-লেভেলে বায়োলজিতে পেলাম দেশসেরা নম্বর। তারপর একে একে আমেরিকার বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আবেদন করেছি। এর ফল হিসেবে ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়ায় ওয়েটিং লিস্টে নাম উঠল। আর টিকে গেলাম ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া ও এমইটিতে। পেনসিলভানিয়া আমাকে বেশ আকর্ষণীয় অফার করেছিল—চার বছরের আন্ডারগ্র্যাজুয়েশনের সঙ্গে মাস্টার্স ও বৃত্তি। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পছন্দের সাবজেক্ট—বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয় না। তাই সবদিক ভেবে এমআইটিতে ভর্তি হলাম।”

তারপর এক নতুন জগতের দেখা পেলেন মাইশা। এত দিন সাধারণত একই রুমে কিংবা একই বিল্ডিংয়ে ক্লাস করে অভ্যস্ত থাকলেও, এমআইটিতে প্রতিটি ক্লাসের শেষে রুম, তলা, এমনকি কখনো কখনো বিল্ডিংও পাল্টে যায়। তাই একটি ক্লাস করেই আরেকটির জন্য তাঁকে ছুটতে হয় অন্য কোথাও। তা ছাড়া নিয়মিত ক্লাসের বাইরে অন্যান্য কাজও থাকে—হয়তো কোনো ক্লাব মিটিং কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে এপয়েন্টমেন্ট। এখানে প্রতিটি বিভাগের জন্যই প্রতি সেমিস্টারে বিশেষ কিছু কোর্স থাকে। কিছু কোর্স থাকে বিভাগের বাইরের বিজ্ঞান ও মানবিক বিদ্যা থেকেও। প্রতি কোর্সের জন্য সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে তিনটি ক্লাস। আর হোমওয়ার্কে লেগে যায় ৮-১০ ঘণ্টা। প্রতি সেমিস্টারে প্রতি কোর্সের জন্য দিতে হয় তিনটি করে মিডটার্ম ও একটি ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশোনার এমন ব্যস্ততা বেশ উপভোগই করেন মাইশা। প্রথম দুটি সেমিস্টারে বেশ ভালো ফল করে এখন তিনি তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী। মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ্যে জানায় না; বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একাকী ডেকে নিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। তাই অন্যের ফল নিয়ে মাথাব্যথা কিংবা অহেতুক কৌতূহল থাকে না কারো।

মাইশা 

ক্লাসের বাইরে লেখালেখিতেও সময় দিচ্ছেন মাইশা। আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে কিভাবে বাংলা শিখেছিলেন—সেই গল্প লিখে এমআইটির এক রচনা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিভিন্ন ওয়েবসাইটে। এর বাইরে একটি বায়োমেকানিকস ল্যাবে এক পিএইচডি গবেষকের গবেষণা সহকারী হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। এমআইটিতে জীবনযাপন সম্পর্কে মাইশা জানালেন, ‘আমি যে ছাত্রাবাসটিতে থাকি, সেখানে বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে আমার। এ ছাড়া একটি ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছি। ওখানেও কিছু বন্ধু রয়েছে। ওরা সবাই খুব মনখোলা ও উপকারী।’

জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঢাকার কোনো কিছু মিস করেন কি না? জানালেন, ‘আমার ক্যাম্পাসের পরিবেশ খুবই নির্জন। এখানে ঢাকার কোলাহল খুব মিস করি। যদিও এখানকার তুষারপাত ভালো লাগে, তবে ঢাকার বৃষ্টির কথা মনে পড়ে খুব। তা ছাড়া ঢাকার মতো শিঙাড়া, সমুচা আর চানাচুর তো এখানে নেই!’

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।