‘ঢাবি ভিসির বক্তব্য একদম ঠিক হয়নি’


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-07-09 23:25:02 BdST | Updated: 2018-09-20 17:10:53 BdST

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের তালেবান জঙ্গিদের সঙ্গে তুলনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান যে বক্তব্য দিয়েছেন এর কড়া সমালোচনা করেছেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। ভিসির এই বক্তব্য একদম ঠিক হয়নি বলে মনে করেন প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ। তার মতে কোনো প্রমাণ পেশ না করে উপাচার্যের মতো দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসা উচিত নয়।

রবিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন।

রবিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলন নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, ‘তালেবান জঙ্গিরা বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে যে রকম উস্কানিমূলক ভিডিও বার্তা পাঠায়, তার অবিকল উগ্র চরমপন্থী মতাদর্শী প্রচারণামূলক ভিডিও আমি নিজে দেখেছি। জঙ্গিরা যেভাবে শেষ অস্ত্র হিসেবে নারীদের ব্যবহার করে, সেভাবে কোটা আন্দোলনেও ছাত্রীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় এসব মেনে নেবে না। ফৌজদারি অপরাধ করলে আইনের শাসন কার্যকর হতে হবে।’

ভিসির এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর বা সরকারি বুদ্ধিজীবী এমন তথ্য যদি জানেন তাহলে তাদের প্রমাণটা জনগণের সামনে হাজির করা উচিত। কিন্তু প্রমাণ হাজির না করে যে বলছেন, এটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে আরেকটু দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে চিন্তা করা উচিত, মত প্রকাশ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর যারা হবেন তারা সরকারকে বা সরকারি দলকে রক্ষা করার জন্য কেন আসবেন।’

আন্দোলনকারীদের জঙ্গিদের সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই অনুমান এবং এই প্রচার একটুও ঠিক নয়। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দেশ এখন দুই ভাগে বিভক্ত মন্তব্য করে আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘যারা খবরের কাগজ পড়েন তারা এই বিষয়টা বুঝতে পারবেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, একদিকে ক্ষমতাসীন সরকার এবং অপরদিকে সরকারি দলের বাইরে অন্য সব দলের মতের লোকেরা। সরকারি দলের অনেকে আছেন যারা কোটা সংস্কার দাবিকে ন্যায়সঙ্গত মনে করেন। কিন্তু তারপরেও সরকারি মহল ও তার সঙ্গে পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি যারা আন্দোলনকে বাধা দিচ্ছে। প্রথম দিকে পুলিশ র‌্যাব দিয়ে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে, এখন দলীয়ভাবে সরকারি ছাত্র সংগঠন দিযে দমন করা হচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষকদের যারা সরকার সমর্থক তারা আন্দোলনের বিরোধিতায় এগিয়ে আসছেন। অন্যদিকে শিক্ষকদের অপর অংশ বলছে, এই আন্দোলন ন্যায়সঙ্গত, দাবি ন্যায়সঙ্গত।’

দীর্ঘদিন ধরে কোটা সংস্কারের জন্য একরকম দাবি আছে মন্তব্য করে আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘ফেনী, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন হয়েছে। সেইটা এখন ঘনীভূত হয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ঢাকায় আরম্ভ হয়েছে। এটা সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি কলেজেও ছড়িয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা একে সমর্থন করছে। কিন্তু তাদের দমন করা হচ্ছে।’

আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘যে জিনিসটা আমি লক্ষ্য করি, যারা সত্যনিষ্ট অবস্থান থেকে চিন্তা করতে চান তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক আন্দোলন মনে করেন। এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইউজিসি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের যারা উচ্চ অবস্থানের কেন্দ্রীয় অবস্থানের ব্যক্তি; তারা দেখা যায় সরকারকে, সরকারি দলকে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠকে সমর্থন করছেন। অন্দোলন যারা করাছেন তাদের সম্পর্কে নানা ধরনের কটূক্তি করছেন। বলছেন এই আন্দোলন রাজাকারদের আন্দোলন, এই আন্দোলন জামায়াতের আন্দোলন, এই আন্দোলন জঙ্গিবাদের আন্দোলন। এখন যারা সাধারণ মানুষ দল করেও সত্যনিষ্ঠার পথে থাকতে চান, তারা প্রকৃত বিষয় বোঝার চেষ্টা করবেন এবং এটা বোঝা কঠিন না।’

প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘যারা উগ্র দলীয় মত এবং নানা স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেন, সিন্ডিকেট তৈরি করে স্বার্থ আদায় করেন, তারা এই কোটা সংস্কারের আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন।’

‘আন্দোলনের যখন একেবারেই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিলেন কোটাপদ্ধতি বিলুপ্ত করে দেয়া হবে। কোনো কোটা থাকবে না। তবে যারা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী এরকম কোনো কোনো গোষ্ঠীর বিষয়ে আলাদাভাবে বিবেচনা করে হবে। এ সংবাদ যারা বিভিন্ন গনমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে শুনেছে তারা প্রধানমন্ত্রীর কথা সরলভাবে বিশ্বাস করেছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়াদুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এরপর আন্দোলন এক পর্যায়ে সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখা হয়েছিল। যারা আন্দোলন করেছিল তারা এই আশায় ছিল যে, শিগগিরই একটা কিছু ঘোষণা আসবে। এরপর যখন দেখলো সময় পার হয়ে যাচ্ছে, রোজার মাস গেল, ঈদের ছুটিও গেল, আড়াই মাস পার হয়ে গেছে, তখন আবার আন্দোলন আরম্ভ হয়েছে।’

আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়ে এই বিষয়টা দেখার জন্য একটা কমিটি করে দিলেন। কিন্তু মাঝখানে আড়াই মাসের বেশি সময় গেছে। এতে করে আন্দোলন যারা করে তাদের ধারণা আন্দোলন না করলেতো কিছুই হবে না। কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন তারা বলছেন কোটাপদ্ধতি আমরা সম্পূর্ণ বিলোপ চাই না। আংশিক বিলোপ চাই।’

‘প্রধানমন্ত্রী বারবার মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেন। আন্দোলনকারীরা কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেনি, তারা সাধারণভাবে কোটাপদ্ধতির সংস্কার চেয়েছে। তাদের দাবি ৫৬ ভাগ কোটা থাকা অবান্তর। এটা কমিয়ে আনার। অনেকে বলেছেন ২০ ভাগে আনা হোক। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আরও কয়েকজন মন্ত্রী, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যায়লের ভাইস চ্যান্সেলর, সরকারি দলের শিক্ষক, সরকারি দলের বুদ্ধিজীবী কেউ কেউ বলতে লাগলেন যে, এটা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। যার ফলে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে একটা রূপ নিয়েছে। আসলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষ কথাটা ঠিক না। সারাদেশের প্রায় সব মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আওয়ামী লীগের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল, তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে।’

আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে তাদের সংখ্যা সবসময়ই কম ছিল, এখন আরও কম। কিন্তু এটাকে অনেক বড় করে কোনো কোনো মহল দেখানোর চেষ্টা করছে। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতারা সব সময় যে সমস্ত কথা বলছেন, এতে মনে হয় যে তারা অত্যন্ত ভীত যে, কখন আবার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ক্ষমতা নিয়ে নেয়। এই যে আওয়ামী লীগের মনোভাবটা এটা আমাদের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। কারণ আমরা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি সরকার, সরকারি দল, সরকারি ছাত্র সংগঠন, সরকারি বুদ্ধিজীবী দল এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। লোকের মুখে এই কথাই শোনা যায় যে, যদি সামনে নির্বাচনও হয় আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতায় আসবে।’

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।