বুক রিভিউঃ “শঙ্খনীল কারাগার” সমাজের এক বাস্তব চিত্র?


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2019-01-08 00:28:03 BdST | Updated: 2019-07-16 18:45:17 BdST

তাসনীম রিনি: নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন উপজীব্য খুব সাদামাটা কাহিনী তবে যেন প্রতিদিনকার রুটিন মাফিক চিত্র চোখের সামনে ভাসমান। বাবার বাড়ি থেকে চলে আসার পর আর তেমন কোন যোগাযোগ হয় নি খোকার মায়ের ২৩ বছরে। চার পয়সার দূরত্বে হাতের নাগালে থেকেও যেন অনেকটা দূরের ছিল সে সম্পর্ক। একদিন যেমন কোন শিকড়ের টান ছাড়া বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল নিনুর জন্মের মধ্য দিয়ে সব টান আকারহীন করে সেখানেই নিশ্চিতে ঘুমিয়ে গেছে।

মেয়েদের গায়ের রং যতটা কালো হলে মায়েরা মেয়েদের শ্যামলা বলে তার থেকেও কালো ছিল রাবেয়া। তবে খুব লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে, বাবার সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের কোন সংসার গড়া হয়নি। নিনুকে মানুষ করতে করতে মাতৃত্বের স্বাদ নিয়েছে। রুনু, ঝুনু, বাবা আর খোকার সংসারে যেন চাঁদের হাট ছিল।
উত্তম পুরুষে বর্ণিত খোকার জীবনে হাজার সুখ অনেকটা অপ্রাপ্তি আবার এক চিলতে ভালবাসা ছিল খালাত বোন কিটকী। ছোট বেলার খুনসুটি থেকেই যেন মনের এককোনে ভালবাসার খুপরি ঘর বেঁধেছিল। মেয়েটাও হয়ত ভালবাসত খোকাকে তবে তা কেবল বড় ভাইয়ের স্থানেই তার অবস্থান।

রুনু, ঝুনু যেন এক বিন্তের দুটো ফুল। একজনের হাসি কান্না যেন অন্যজনের চোখে মুখে মিশে একাকার। রুনুর প্রেমিক পুরুষের সাথে দেখা যায় ঝুনুর একসময় বিয়ে হয়ে যায়। কি এক অচেনা রোগে রুনুটাও সকলের মায়া ত্যাগ করে মায়ের পথে পাড়ি জমায়।

দিতে পার একশ ফানুস এনে?
আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই।

মন্টুর লেখা এ দু'চরণেই যেন পুরো উপন্যাসের কাহিনীটাই প্রকাশ পায়। প্রথম প্রথম নিজের লেখা নিয়ে লজ্জা সংকোচ থাকলেও বেশ কয়টি কবিতার বই বের হয় পুরস্কারও অাসে।

এতকিছুর পরেও কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম শূন্যতা ছিল। মায়ের বিয়ের ঘোর লাগা কাহিনীটা বরাবরই অস্পষ্ট ছিল। যা সুদীর্ঘ এক চিঠিতে খোলসা করে বড় বোন রাবেয়া, রাবেয়ার জন্ম পরিচয়ও সেই গোপনীয়তার একটা অংশ।

প্রাঞ্জল কাহিনী অার অকপট বর্ণনাভঙ্গির মাত্র ৮৫ পৃষ্ঠার শঙ্খনীল কারাগার যেন সমাজের এক বাস্তব চিত্র।

====================
শঙ্খনীল কারাগার
হুমায়ূন আহমেদ
প্রকাশক: অন্য প্রকাশ
প্রকাশ কাল: বইমেলা ২০০৯
পৃষ্ঠা: ৮৫
প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী
মুদ্রিত মূল্য: ২০০৳

শঙ্খনীল কারাগার - আকাশে ফানুস উড়াবার সাধ

শঙ্খনীল কারাগার লেখকঃ হুরমায়ূন আহমেদ প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ নন্দিত কথাসাহিত্যিক সদ্যপ্রয়াত ড. হুমায়ূন আহমেদের প্রথম কর্মজীবন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। বাকৃবিতে শিক্ষকতা করার সময়ে তিনি শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসটি লিখেছিলেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ড. মো. রফিকুল হক বলেন, জননন্দিত কথাসাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ লেখাপড়া শেষে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ৭৪ সালের মে মাস পর্যন্ত ড. হুমায়ূন আহমেদ প্রথম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি জানান, হুমায়ূন আহমেদ বাকৃবিতে শিক্ষকতা করার সময়ই তার নামকরা উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার লিখেন। নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সুখ দুঃখের কাহিনী নিয়ে এতো সাবলীল ভাষায় একমাত্র যিনি লিখতে পারতেন, তিনি হচ্ছেন হুমায়ূন আহমেদ। অসাধারণ এই বইটির গল্প নিয়ে পরবর্তীতে একই নামে বাংলা চলচ্চিত্রও হয়। শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসে আছে রাবেয়া আপা বা রাবু আপা। যিনি মায়ের মৃত্যুর পর পরম মমতায় মায়ের মতো করে তার পাঁচ ভাই বোনকে আগলে রাখেন। রান্না, খাওয়া থেকে শুরু করে বাসার ছোট থেকে ছোট ব্যাপারগুলোতে তার খেয়াল থাকে। বড় বোন যে মায়েরই ছায়া তা রাবু আপাকে দেখলেই বোঝা যায়। আছে খোকা, বাড়ির বড় ছেলে। সবার অভাব অভিযোগ শোনা যার কাজ। কলেজে ছাত্র পড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে বাড়ি ফিরলে সবাই সবার যতরকম সমস্যা আছে তা নিয়ে বসে পরে খোকা ভাইকে শোনাবে বলে। খুব চুপচাপ আর লাজুক বলে কখনো নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেনা। মা মারা যাবার সময়ও বলতে পারেনি মাকে কত্ত ভালোবাসতো। খালাতো বোন কিটকিকেও কোনদিন মনের কথা সাহস করে বলতে পারেনি। আর পিঠাপিঠি দুই বোন রুনু-ঝুনু। রুনুকে দেখতে এসে পাত্রপক্ষ ঝুনুকে পছন্দ করে ফেলে। একসময় বিয়েও হয়ে যায় ঝুনুর। কাউকে কিছুই বলেনা রুনু কিন্তু খুব বড় রকম কষ্ট মনে পুষে রাখলে যা হয়, একসময় রুনু পাগলের মতো হয়ে যায়, সারাক্ষণ হাসে, হঠাৎ কাঁদে। রুনুর পরিণতিটাও হয় খুব করুণ। তারপর ছোট দুটা ভাই-বোন মন্টু আর নিনু। মন্টুও একসময় বড় হয়ে পত্রিকা অফিসের সহ-সম্পাদক হয়। বেশ ভালো বেতন, নামী ব্যাক্তি সে। অনেকেই তার কাছে আসে। নিনুকে জন্ম দিতে গিয়েই তাঁদের মা শিরিন সুলতানা মারা যান। খুব বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু কিভাবে যেন আজহার হোসেন নামের গরীব সিধেসাধা মানুষটির সাথে বিয়ে হয়ে যায় তার, তারপর তেইশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন স্বামীর সাথে , একটিবারের জন্যও নিজেদের প্রকান্ড বাড়িটায় আর যাননি বিয়ের পর। তেইশ বছর পর আবার নিজের বাড়ি গেলেন মৃত্যুর পর। কোনো কোনো রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলোয় ভাসতে থাকে। ভাবি, একা একা বেড়ালে বেশ হতো। আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথাল পাথাল চাঁদের আলোর সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই।মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ।আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জাম গাছের পাতার সর সর শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে উঠে। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষন্নতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি। শঙ্খনীল কারাগার বইটি পড়ার পর আপনিও হয়তো খোকার মতো বিষণ্ণ হয়ে যাবেন, তার কষ্ট আপনাদের কষ্ট হয়ে যাবে। এরকম করেই বইটি আপনাকে ছুঁয়ে দিবে আর ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যাবে আপনার অনুভূতিটাকে।
ট্যাগ:

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।