প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনে হুমকির মুখে সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বই


টাইমস ডেস্ক
Published: 2020-02-17 03:35:09 BdST | Updated: 2020-03-31 13:31:14 BdST

বর্তমান সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জন্য দিনে দিনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে অনুশীলনমূলক গ্রন্থ। দেশের শতকরা প্রায় ৯৫ জন শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় ভূমিকা রাখছে অনুশীলনমূলক বই। শিক্ষা বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়- মূলত ক্লাসে যথাযথভাবে পাঠদান না করা, ক্লাসের বার্ষিক কর্মঘণ্টার অপ্রতুলতা ও সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষ করে গড়ে তোলা সম্ভব না হওয়ায় এ বই-ই হয়েছে শিক্ষার্থীদের অন্যতম অনুষঙ্গ।

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৯-এ নোট-গাইড আখ্যা দিয়ে অনুশীলনমূলক বই বন্ধের বিধি যুক্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিভিন্ন মহল। এর পাশাপাশি অন্তত ৮টি পেশার প্রায় ২৪ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। এতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া পরোক্ষভাবে বিঘ্নিত হবে সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা। কেননা কবিতা, গল্প ও উপন্যাসসহ সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবগুলোই অনুশীলনমূক গ্রন্থ ব্যবসায় সম্পৃক্ত। ফলে উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞার কারণে সার্বিকভাবে লেখাপড়া ও জ্ঞান চর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘নোট গাইড কেন চলে তা আমরা জানতে চাই। সেটা চিহ্নিত করার পরে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারি। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, নোট-গাইডের বিকল্প আমরা চাই। আমরা চাই, এর ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা কমাতে। কিন্তু সেই বিকল্পটা কী হতে পারে, সেটা এক্সপ্লোর (অন্বেষণ) করছি। তবে কী করব সেটা এখনো চূড়ান্ত নয়। আমাদের হাতে কয়েকটা বিকল্প আছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০১৯-এর খসড়া গত সপ্তাহে চূড়ান্ত হয়েছে। এটি অনুমোদনের জন্য শিগগিরই মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

আইনে স্কুল চলাকালীন শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন-কোচিং নিষিদ্ধ করা হলেও স্কুল ছুটির পরে সুযোগ রাখা হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে ব্যবসায়িক কোচিংকে বৈধতাদান করা হয়েছে। শিক্ষানীতিতে পাস করা তিন স্তরের শিক্ষানীতির পরিবর্তে চার স্তরের শিক্ষানীতিই রাখা হয়েছে। অবশ্য পরবর্তীতে তিন স্তরের শিক্ষানীতি প্রবর্তনের আভাস রয়েছে অন্য আইনে। এসব প্রস্তাবের ব্যাপারেও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

যুক্তরাজ্যে কর্মরত বিখ্যাত সমাজবিদ ড. সীনা আক্তার তাঁর ‘পাঠ্যবই ও মানসম্মত শিক্ষা’ নিবন্ধে লিখেছেন, “মানসম্পন্ন শিক্ষায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার সুযোগ, বইয়ের বিষয়বস্তু এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি (teaching methods) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। স্বভাবগতভাবেই শিশুরা কৌতূহলী, সেজন্য তাদের জ্ঞানার্জনকে গণ্ডির ভেতর নিয়ে আসা উচিত নয় বরং জ্ঞানের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার।” তিনি আরও লিখেছেন, “আমাদের দেশে অধিকাংশ অভিভাবকের বাড়তি বই কেনার সামর্থ্য নেই। তাছাড়া অধিকাংশ অভিভাবক পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়াকে মূল্যহীন হিসেবেই দেখেন। ফলে শিশুদের নিজ পাঠ্যবইয়ের বাইরে জানার-শেখার-কল্পনা করার সক্ষমতা তৈরি হয় না। নির্দিষ্ট কিছু পাঠ্যবই পড়ে, মুখস্থ করে এবং পরীক্ষার খাতায় লিখে হয়তো ভালো ফল করা যায় কিন্তু তা জ্ঞানের মহাসাগরে অতি ক্ষুদ্র ঢিলের সমতুল্য।”

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বর্তমানে গ্রাম-শহরে দুই ধরনের সংকট বিরাজমান। শহরের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কারণে এক একটি ক্লাসরুমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ৪০ঃ১-এর পরিবর্তে ৮০ বা ১০০ঃ১। যার ফলে শিক্ষকের পাঠদান শিক্ষার্থীর মনোজগতে পৌঁছে না। আর গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের না রয়েছে সৃজনশীল প্রশিক্ষণ, না রয়েছে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই সৃজনশীল ফরম্যাটে প্রণীত অনুশীলনমূলক বইকেই তাদের ভরসার স্থলে রাখছেন। এসব অনুশীলনমূলক বই নোট-গাইড হিসেবে প্রচলিত।

অভিভাবকরা বলছেন, প্রয়োজনেই তাঁরা অনুশীলনমূলক গ্রন্থ কিনছেন। দেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত প্রশ্ন পাঠ্যবইয়ে নেই, তাই আমরা অধিক অনুশীলনের জন্য বাজারে প্রচলিত অনুশীলনমূলক বইগুলো সংগ্রহ করি। এ বইগুলো থেকে আমরা সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাই।’

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠ্যবইয়ের বিষয়কে ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য অনেক অনুশীলনের দরকার। তাই অধিক সংখ্যক উদ্দীপক সংবলিত অনুশীলনমূলক বইয়ের সাহায্য নেওয়ার বিকল্প নেই। কারণ প্রতিনিয়ত অনুশীলনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর প্রশ্নব্যাংক যা একজন অভিভাবক বা শিক্ষকের পক্ষে প্রস্তুত করা সম্ভব হয় না।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের অন্যতম একটি বিদ্যাপীঠের অধ্যক্ষ বলেন, “দেশের সকল স্কুল-কলেজের সব শিক্ষক এখনো সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশিক্ষণ পাননি। পাঠ্যবই বা শিক্ষক ম্যানুয়াল দেখে পাঠদান করা সব শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয় না। এ কারণে অনেক শিক্ষক অনুশীলনমূলক বইয়ের সহায়তা নেন।” আরেক অধ্যক্ষ বলেছেন, “প্রচলিত ধারণার কারণে নোট-গাইডের পক্ষে নামপ্রকাশ করে কথা বলা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বছরের কর্মদিবসের সংখ্যা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বাস্তবতা ও দক্ষতা বিবেচনায় এসব বইয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন। তাছাড়া আমাদের শিক্ষাবিদরা বলেছেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে নোট-গাইড থেকে কোনো প্রশ্ন পরীক্ষায় আসবে না, এমনকি ৫০ বছরেও কোনো প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি হবে না। ফলে নোট-গাইডের সাহায্য নিয়ে অনুশীলন করার মধ্যে ক্ষতিকর কিছু নেই।”

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নোট-গাইড নিয়ে সরকারের আপত্তির বড় কারণ হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠানেই এসব গ্রন্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। একশ্রেণির অসাধু শিক্ষক ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থ কিনতে বাধ্য করেন। অপরদিকে শিক্ষা-গবেষকদের মত হচ্ছে, পরীক্ষার জন্য শিখনফলভিত্তিক সেরা মানের প্রশ্ন ও তার নমুনা উত্তর এবং নিজে নিজে উত্তর করার মতো এক ধরনের প্রশ্নব্যাংক সংবলিত বই শিক্ষার্থীদের জন্য বাজারজাত করা হচ্ছে। এগুলোকে গতানুগতিক নোট-গাইড বলা যাবে না। বস্তুত বিদ্যমান ব্যবস্থায় নোট-গাইড তৈরি করা সম্ভবও নয়।

বাপুস সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, অনুশীলনমূলক গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে অন্তত ৮টি পেশার প্রায় ২৪ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। এই খাতে সাড়ে ২১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। এসব গ্রন্থ প্রকাশনা বন্ধ করা হলে সরকার একদিকে শত কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হবে, আরেক দিকে কর্মহীন মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।