আহা করোনা…


Dhaka
Published: 2020-09-20 14:32:56 BdST | Updated: 2020-10-20 06:52:07 BdST

সাবরিনা মনসুর
ঢাকা মেডিকেল কলেজ

শ্যামার প্রতিরাতেই দুঃস্বপ্ন হচ্ছিল কিছুদিন। আব্বার ফোনে টুংটাং এসএমএসের শব্দ হলেই বুকটা ধ্বক করে উঠে। পরে দেখা যায় সেটা সিম কোম্পানীর ম্যাসেজ, একটু হাফ ছেড়ে বাঁচে সে।

মেডিকেলে পড়ে সে, সব ঠিক থাকলে মে তে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, সিলেবাসও শেষ করা ছিল তার। পরীক্ষাকে কখনোই ভয় পেতনা সে। অথচ এখন পরীক্ষার নামেই ভয়। কলেজে নাকি জুম অ্যাপে রিভিশন ক্লাসও শুরু হয়ে গেছে। ক্লাস মিস হচ্ছে সেটার জন্য অত খারাপ লাগেনা, ভয় হচ্ছে পরীক্ষাটা যদি অনলাইনে হয়ে যায়, তাহলে হয়তো তার বসা হবেনা। শ্যামা টিউশনির টাকা জমায়ে একটা স্মার্টফোন কিনেছিল। হলের ওয়াইফাই দিয়ে চালাতে ভালোই লাগতো। বাবাকে একটা নোকিয়া ফোন কিনে দিছিল হল থেকে কথা বলার জন্য। লকডাউনে যখন মেডিকেল বন্ধ হয়ে শ্যামা বাসায় চলে আসলো, সংসারের টানাটানিতে স্মার্টফোনটা বিক্রি করে আসে বাবা। দুজন তো একসাথেই আছে, ফোনের দরকার কি? কিন্তু কে জানতো ফোনটার এমন দরকার পড়বে!

করোনাকে ওদের বস্তির আর কেউ ভয় না পেলেও মেডিকেলের ছাত্রী শ্যামা বেশ ভয় পায়।ঐ যে বলেনা, যে বিপদ বোঝেনা সেই সাহসী? আব্বাকে নিষেধও করছিল এই সময়ে বাইরে না যেতে। কিন্তু কয়দিন আর না যেয়ে থাকবে? সব মানলেও পেট তো মানেনা। শ্যামা দুইটা টিউশনি করাতো, ওদের বেশ কয়েকবার ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে পড়াতে যাবে নাকি। ওরাও বলে দিছে করোনার সময় বের হইওনা, জীবন আগে না পড়ালেখা? অথচ শ্যামা কেমনে বলবে জীবনের জন্যই তার পড়ালেখা।

কয়েকদিন শুনছিল সরকার থেকে নাকি ৫০ লক্ষ মানুষকে এককালীন আড়াই হাজার টাকা করে দিবে, শ্যামা হিসেব কষে দেখলো ওরাও এই ৫০ লক্ষ পরিবারের মধ্যে পড়ে, আবেদনও করছিল, কিন্তু এখনো টাকার কোন নামগন্ধ নাই।

এই টাকাটা না পাওয়াতে শ্যামা খুব অবাক হয়েছিল, তখন বাবা তাকে এই বলে বুঝ দিয়েছিল, তাদের চেয়েও আরো খারাপ অবস্থা মানুষের। শ্যামাও বুঝতে পেরেছিল তা যখন আইসিইউতে জায়গা না পেয়ে রহিম চাচা মারা গেল। শ্যামা অনেক দৌঁড়াদৌঁড়ি করেছিল চাচাকে নিয়ে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে অক্সিজেনের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল । কিন্তু শেষদিকে অবস্থা খারাপ হওয়াতে যখন উনার আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর এর দরকার হলো, ঐ সময় আর শ্যামার সামর্থে কুলালোনা। চাচার বউ, নয় বছরের মেয়ে পারলে শ্যামার পায়েও ধরে, কিন্তু তারা কিভাবে বুঝবে আইসিউতে যাওয়ার মত সামর্থ এখন আর এই গরীব মানুষগুলোর নেই।

শ্যামার সবচেয়ে খারাপ লাগছিল যেদিন বাবার শরীরে ব্রুইসের দাগ পায়।বাবাকে জিজ্ঞেস করাতে বলে বয়স হয়েছে তো, ডিভাইডারের সাথে এক্সিডেন্ট করেছে ছোটখাটো। কিন্তু ফরেনসিক মেডিসিন পড়ায় সে ঠিকই বুঝছে এটা ব্লান্ট ফোর্স মানে লাঠির আঘাত। সব ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যায় যখন শ্যামার বান্ধবী মিথিলা বলে কোন জায়গায় নাকি লকডাউন ভেঙে রাস্তায় বেরোনেতে দুইজন বয়স্ক লোককে কান ধরায়ে ছবি তুলে ভাইরাল করে দিছে। শুনে আর কান্না থামায়ে রাখতে পারেনি শ্যামা। বারবার ঐ জায়গায় নিজের বাবার ছবি ভাসতেছিল…

বাবা দুইদিন বিছানায় পড়ে ছিল, চাচার বাসায় গেছিল কিছুটা সাহায্যের আশায়। শ্যামার প্রবাসী চাচা করোনা টেস্ট করায়েই বিদেশ গেছিল, কিন্তু ওদের দেশে গিয়ে নাকি ধরা পড়ছে রিপোর্ট ভুয়া। সবাইকে একসাথে ফেরত পাঠাইছে। বহু ধার কর্য করে বিদেশ যেতে হয়, এখন এই সময় দেশে কি করে খাবে? টাকাটা হাতে থাকলে হয়তো ছোটখাট ব্যবসাও করা যেত। কিন্তু এখন? একটু সাহায্যের আশায় গিয়ে উল্টা সান্তনা দিয়ে আসলো। ঐসময় শ্যামার ইচ্ছা হচ্ছিল বিষ খেয়ে মরে গেলে কেমন হয়? এত ঝামেলাই হতোনা আর

তবে এখন আর সেই দুঃস্বপ্ন দেখতে পাচ্ছেনা শ্যামা। ওর বন্ধুরা টাকা তুলে তাকে একটা স্মার্টফোন কিনে দিছে। ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ডাক্তারদের একটা সংগঠন। বস্তির এক গর্ভবতী মহিলার জন্য রক্ত দরকার ছিল, করোনার মধ্যেও মেডিকেলের ক্লাব থেকে জোগাড় করে দিছে। অনেকদিন পর ফ্রি জিবি অফার পেয়ে ফেসবুকে ঢুকে দেখলো বৃদ্ধ লোকটাকে কান ধরানো মহিলার শাস্তি হয়েছে, জাল করোনা সার্টিফিকেট দেওয়া মানুষগুলোও গ্রেফতার হয়েছে। টুং করে ফেসবুকের নোটিফিকেশন এর আওয়াজে দেখলো কে যেন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনে ডোনেশনের একটা চ্যালেঞ্জে ট্যাগ করেছে, শ্যামাও সাধ্যমত ডোনেট করে দিছে। এত ঝামেলার মধ্যেও এই মানুষগুলার জন্যই যে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা হয়…

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ইয়েস গ্রুপ আয়োজিত করোনাকালে দুর্নীতি ও প্রতিরোধের গল্প শিরোনামে 'দুর্নীতিবিরোধী গল্প লেখা' প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান