কেমন ছিল হুমায়ূন আহমেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন?


Dhaka
Published: 2020-11-13 21:21:55 BdST | Updated: 2020-12-05 17:41:33 BdST

‘হলে সাঁড়া পড়ে গেল! নতুন একজন ছাত্র হলে উঠেছে। যে কিনা হাত দেখে যে কারো ভবিষ্যত বলে দিতে পারে। মুহসীন হলের ছাদে বসে সে প্রতিদিন কোনো না কোনো ছাত্রের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দেয় এবং সে যা বলছে তার প্রায় সবই মিলে যাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, এই ছেলে ম্যাজিক দেখাতে পটু! একজন ম্যাজিকম্যান হিসেবে অল্পদিনের মধ্যেই হলে নামডাক ছড়িয়ে পড়ল ছেলেটির!

যে ম্যাজিকম্যানের কথা বলছিলাম তিনি ছিলেন, বিংশ শতাব্দীর বাঙালি কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ লেখক, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আহমেদ। তাকে বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ। একজন বিখ্যাত নাটক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে বহুমুখী সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি সত্যিকার অর্থেই পাঠকূলের মাঝে একজন ম্যাজিকম্যানের ভূমিকায় অবতর্ণী হয়েছিলেন। সহজ এবং প্রাঞ্চল ভাষায় গল্পসৃষ্টির মাধ্যমে হুমায়ুন আহমেদ পাঠক হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্রের উত্তর যুগে হুমায়ুন আহমদের ন্যায় আর কোনো সাহিত্যিক এতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেন নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রিয় হাজী মুহসীন হল নিয়ে হুমায়ুন আহমদের এধরনের বহু মজাদার এবং বেদনাদায়ক স্মৃতি রয়েছে, যার কিছু বিষয় এখানে উল্লেখ করার প্রয়াস পেয়েছি।

হুমায়ুন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে। পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। পিতা ছিলেন একজন সৎ এবং নিষ্ঠবান পুলিশ কর্মকর্তা এবং তিনি ১৯৭১ সালের মহান যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বর্বর পাকবাহিনীর হাতে শহিদ হন। ছোটকালে পিতা নিজের নাম ফয়জুর রহমানের সাথে মিল রেখে হুমায়ুন আহমেদের নাম রেখেছিলেন শামসুর রহমান : ডাকনাম কাজল। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ুন আহমেদ রাখেন। হুমায়ুনের পিতা ছেলে-মেয়েদের নাম পরিবর্তন করতে পছন্দ করতেন।

তাঁর বাবা চাকুরীর সূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থান অবস্থান করতেন বিধায় হুমায়ুন আহমেদের দেশের বিভিন্ন স্কুলে পড়াশুনো করার সুযোগ হয়েছে। তিনি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হুমায়ুন আহমেদকে ফজলুর রহমান হলে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ম্যানেজ করে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থাকা শুরু করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল নবনির্মিত মুহসীন হলের লিপ্ট স্থাপন। তাঁকে নতুন হল এবং হলের লিপ্ট ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করেছিল। তিনি মুহসীন হলের ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন শুরু করেন এবং পুরো ছাত্রজীবন এখানেই অতিবাহিত করেন।

হল জীবনে আহমদ ছফা, আনিস সাবেত এবং হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ছাত্রজীবন থেকেই এঁরা একটি বুদ্ধিভিত্তিক সাহিত্যসমাজ প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করতেন। তারা চিন্তা করতেন, এদেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক নতুন জগৎ নির্মাণ করবেন। অত্যন্ত মজার ব্যাপার ছিল তিনজন বন্ধুর অন্য একটি বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া, তাঁরা একদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তাঁরা কখনোই বিয়ে করবেন না। অর্থাৎ চিরকুমার থাকবেন। কিন্তু পরবর্তীতে একমাত্র আহমদ ছফা ব্যতিত কেউই সে প্রতিজ্ঞায় স্থির থাকতে পারেন নি। এবিষয়ে হুমায়ুন আহমেদের পরবর্তী কাহিনী সম্পর্কে আপনারা ভালোই অবগত আছেন।

পূর্বেই বলেছি যে, হুমায়ুন আহমদ হাত দেখা এবং যাদু জানতেন। হলে থাকাকালীন প্রায় সময় কামরাঙ্গীর চরে টিউশন এবং একটি স্কুলে ক্লাস নেওয়ার জন্য যেতে হতো তাঁকে। সেখানকার চায়ের দোকানে কিংবা রাস্তার মোড়ে তিনি যাদু দেখানো শুরু করতেন। অসংখ্য লোক তার যাদু দেখার জন্য জমায়েত হত। মূলত তিনি মানুষকে মজা দিয়ে নিজে মজা পেতেন। এই ম্যাজিক বা যাদু পরবর্তীতে তিনি তাঁর অসংখ্য গল্প-উপন্যাস সৃষ্টির মাধ্যমে দেখিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আনন্দ দিয়েছিলেন সমগ্র বাঙালি পাঠককূলকে।

তখন মুক্তিযুদ্ধের দামামা তুমুলবেগে বেজে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো পাকবাহিনীর প্রধান টার্গেট। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরাই যেকোনো সময় আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ইতঃপূর্বে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭০-এর নির্বাচন কেন্দ্রিক আন্দোলন সর্বত্রই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবনবাজী রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। হুমায়ুন আহমেদর বাবা একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবিষয়টি অনেকের জানা ছিল। তাই বিষয়টি নিয়ে হুমায়ুন সবসময় বিচলিত থাকতেন। কখন জানি কি হয়ে যায়! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অনেকে তাকে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তাতে সাঁয় দেননি! গ্রামে কোথায় থাকবেন? সর্বত্রই বর্বর হানাদার বাহিনী লৌমহর্ষক কাণ্ড ঘটাচ্ছে! হুমায়ুন আহমেদ খুব ভালো রান্না জানতেন। তিনি হলের কক্ষে প্রায় সময় রান্না করে খেতেন। রমজান মাস চলছিল। তিনি এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু সেদিন রোজা না রাখায় দুপুরে খিঁচুড়ি রান্না করে খাবেন। হুমায়ুন যথারীতি রান্না আরম্ভ করলেন। আকস্মাৎ শোনা গেল, হল গেইটে পাকবাহিনীর একটি গাড়িবহর উপস্থিত হয়েছে। সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

হুমায়ুন আহমেদ ব্যক্তিগতভাবে অনেক ভীতু ছিলেন। তাঁর বুক থরথর করে কাঁপছে! কক্ষে প্রবেশ করে সন্দেহজনক অসংখ্য ছাত্রকে ধরে নিয়ে গেল। সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদকেও। সেইসময় পাকবাহিনীর নিজস্ব তৈরি করা সেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্দেহজনক ছাত্র-শিক্ষককে ধরে বন্দি করে অকাথ্য জুলুম নির্যাতন করত। নাৎসি স্টাইলে নির্বিচারে গুলি করে লাশ গায়েব করে ফেলত। হুমায়ুনকে একটি বদ্ধ কক্ষে বন্দি করে রাখা হল। কিন্তু অলৌকিকভাবে তিনি সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন। জীবন্ত হলে ফিরে আসতে পেরেছিলেন বলেই বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্র জগতে এক নতুন উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদয় হয়েছিল এবং বাঙালি জাতি হিমু, মিসির আলীর ন্যায় আনন্দদায়ক, কৌশলী এবং অদ্ভূত চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছে।

হুমায়ুন আহমেদ তখন মাস্টার্সের ছাত্র। এসময় একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজগতে প্রবেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ৫৬৪ নং কক্ষে বসেই তিনি তাঁর প্রথম উপনস্যাটি লিখেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। তৎকালিন সাঁড়া জাগানো প্রখ্যাত বাংলা ভাষাশাস্ত্র পণ্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদী মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। শঙ্খনীল কারাগার তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ। এ গ্রন্থটির সঙ্গেও মুহসীন হলের স্মৃতি বিজড়িত। এইতো শুরু হলো ছাত্রজীবন থেকে সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পর্ব। পুরো ক্যাম্পাসে তিনি তরুণ-উদীয়মান লেখক হিসেবে অল্পসময়ে পরিচিতি পেয়ে যান। সেই সাথে একজন হস্তবিশারদ এবং যাদুকর হিসেবেও।

মানিক বন্দোপাধ্যায় ছিলেন হুমায়ুন আহমেদের প্রিয় ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর গ্রন্থ প্রচুর পরিমাণে পড়তেন। সেইসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন পাণ্ডিত টাইপের শিক্ষক ছিলেন, যিনি কিনা যে কারো লেখার সমালোচনা করতেন। হুমায়ুন আহমেদ একদিন মজা করার উদ্দেশ্যে একটি লেখা নিয়ে সেই শিক্ষকের সাথে সাক্ষ্যৎ করতে গেলেন। লেখাটি তাঁকে দেখিয়ে হুমায়ুন জানতে চাইলেন, কেমন হয়েছে স্যার? তিনি একটু চোখ বুলিয়ে বললেন, চলে মোটামুটি, খুব বেশি ভালো হয়নি! হুমায়ুন আহমেদ বললেন, এই লেখাটি আমার নয়, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের। এমন একজন শ্রেষ্ঠ লেখকের লেখা যদি ভালো না হয়, তাহলে আমি হুমায়ুনের আর লেখার প্রয়োজন নেই। সেদিন হুমায়ুন বুঝাতে চেয়েছিলেন, একজন লেখক বা লেখার সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু অনুরূপ একটি লেখা সৃষ্টি করা সহজ নয়।

যাইহোক, হুমায়ুন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অতঃপর ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুহসীন হলের ছাত্র থেকে শহীদুল্লাহ হলের হাউস টিউটর হয়ে তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং নিজ বিভাগের একজন জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ছাত্রজীবনের যেরূপ মেধাবী ছাত্র, উদীয়মান লেখক, ম্যাজিকম্যান, হস্তবিশারদ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, শিক্ষক জীবনে এসেও একজন শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিক, গল্পকার একইসাথে জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেন।

পেশাজীবনের শুরুতে দেশের এই শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে নিদারুণ অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধে বাবা শহীদ হওয়ায় পুরো পরিবারের দায়িত্ব অর্পিত হলো তাঁর কাঁধে। কিন্তু তিনি হতাশ হননি। অত্যন্ত সূচারুরূপে পরিবারের দায়িত্ব, শিক্ষকতা এবং নিজ সৃষ্টিকর্ম চালিয়ে গেলেন। সেই সাথে চালিয়ে নিয়েছিলেন, বাঙালি জাতির মননে বই পাঠের প্রবণতা সৃষ্টির দুষ্কর কর্মটি।

সাহিত্যজগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে হুমায়ুন আহমেদের ছিল অবাধ বিচরণ। নন্দিত, নরকে, শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাসের মাধ্যমে হুমায়ুনের পরিচিতি অর্জন। মিসির আলী, হিমু প্রভৃতি চরিত্রগুলো হুমায়ুনকে এনে দিয়েছে অমরত্বের হাতছানি। জোসনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, মাতাল হাওয়া, বাদশাহ নামদার, দেয়াল প্রভৃতি ইতিহাসাশ্রয়ী উপন্যাসে তিনি ইতিহাসের সত্যের একনিষ্ঠ পরিব্রাজক হিসেবেও সফল। তিনি এসব গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আসলে গল্প বলতে চেয়েছেন, উপলক্ষ করেছেন বিভিন্ন কালের। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মানুষের গল্প বলার জন্য তিনি লিখলেন, ‘‌জোসনা ও জননীর গল্প’, মানুষের জটিল মনস্তত্ত্বের গল্প বলার জন্য বেছে নিয়েছেন ‘কে কথা কয়’, বঙ্গভঙ্গ, দেশভাগ, দেশভাগের ক্ষত, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, বিশ্বযুদ্ধ, গান্ধী, জিন্নাহ, রবিঠাকুর, নজরুল, সুভাষ বসু, জয়নুল, হাওর অঞ্চলের মানুষের দুঃখ গাঁথা সর্বোপরি ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষের সুখ-দুঃখের আর স্বাথীনতাম্মুখতার গল্পগুলো বলার জন্য তিনি লিখেন ‘মধ্যাহ্ন’। মোদ্দকথা মধ্যাহ্ন উপন্যাসটি যেন স্বাধীনতার ইতিহাস।

হুমায়ুন এভাবেই লিখে গেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি পাদটীকায় তিনি পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। আপন মহিমায় প্রোজ্জ্বোলিত করেছেন বাঙালি জাতির ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই দূরারোগ্য ক্যান্সারের সাথে ব্যর্থ যুদ্ধ করে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন বাঙালির বুক থেকে। বাঙালি জাতি হারিয়েছে একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকার, ঔপন্যাসিক, শ্রেষ্ঠ ম্যাজিশিয়ান। আর মুহসীন হল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হারিয়েছে একজন শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণাদায়ক বড় ভাই এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক একইসাথে শ্রেষ্ঠ একজন লেখক এবং সাহিত্যিককে। আজ এই মহান এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং হাজী মুহসীন হলের সকল শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানাই অকৃত্রিম ভালোবাসার সঙ্গে হৃদয়ের সকল শ্রদ্ধা। প্রিয় হুমায়ুন আহমেদ যেখানে, যেভাবেই থাকুন শান্তি এবং সুখে থাকুন। তাঁর পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা!

’৬৭-’৬৮ সালের উত্তাল সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের ৫৬৪ নাম্বর রুমে আবাসিক শিক্ষার্থী হয়ে উঠলেন এক তরুণ।

চোখে তার মোটা ফ্রেমের চশমা, স্বভাবে লাজুক লাজুক। আশেপাশের অন্য ছেলেদের কাছে তিনি খুবই রহস্যময়।

মাঝে মাঝে ম্যাজিক শো’ করে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। একদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক বন্ধুর কাছ থেকে নর-কঙ্কালের খুলি এনে টাঙ্গিয়ে দেয় রুমের সিলিংয়ে।

এই তরুণের নাম হুমায়ূন আহমেদ, কাল পরিক্রমায় যিনি বাংলা সাহিত্যের তুমুল জনপ্রিয় লেখক। মহসিন হলের সেই কক্ষ থেকেই তিনি লেখেন তার প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’।

এর পরের ইতিহাস সবার জানা। হুমায়ূন যে দিকে তাকিয়েছেন, জয় করে নিয়েছেন সেদিকেই। আবাসিক ছাত্র হিসেবে মুহসিন হলে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে রসায়ন বিভাগে, আবাসিক শিক্ষক হিসেবে শহিদুল্লাহ হলে আর সর্বোপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেটেছে তার জীবনের দীর্ঘ একটি সময়।

ঔপন্যাসিক, গল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতাসহ বিভিন্ন পরিচয়ে ঢাকা পড়ে গেছে হুমায়ূন আহমেদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকতার জীবন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষকরা অকপটে স্বীকার করছেন যে, যদি হুমায়ূন আহমেদ রসায়ন নিয়েই থাকতেন, তাহলে বড় বিজ্ঞানী হতেন।

ছাত্রদের তিনি পড়াতেন কৌতুকের মতো। রসায়নের জটিল জটিল বিষয়গুলোই তিনি কেবল পড়াতেন এবং সেগুলো ব্যাখ্যা করতেন অত্যন্ত সহজ-সাবলীল ভাষায়। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়।
’৬৭ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত হুমায়ূন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ সুদীর্ঘ সময়ে হুমায়ূন আহমেদের জীবনে ঘটে যায় নানা উত্থান-পতনের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘিরে তার কতো স্মৃতিময়তা। হুমায়ূনের লেখা বিভিন্ন বই এবং বন্ধু-সহপাঠী-সহকর্মীর নিকট থেকে জানা যায় নানা কাহিনী।

মহসিন হলের দিনগুলো
হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন ১৯৬৭ সালে। তখন স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল ছিল সারা দেশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ছাত্ররাজনীতির অবস্থা তুঙ্গে। ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে আইয়ুবের গুণ্ডাবাহিনী এনএসএফ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ইসলামী ছাত্রসংঘ (বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ইসলামী ছাত্রসংঘই এখন ইসলামী ছাত্রশিবির নামে পরিচিত) ।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা এনএসএফের ভয়ে তটস্থ থাকতেন। হুমায়ূন তার ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাসে এ সম্পর্কে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেন।

‘মহসিন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমে রসায়ন বিভাগের অতি নিরীহ একজন ছাত্র বাস করত। এসএসসি ও এইচএসসিতে তার রেজাল্ট ভালো ছিল বলে তাকে একটি সিঙ্গেল রুম দেওয়া হয়েছিল। এই বেচারা এনএসএফ নেতাদের ভয়ে অস্থির থাকতো। একদিন কোনো কারণ ছাড়াই এনএসএফের নেতারা তার ঘরে ঢুকে রুম তছনছ করে দিল। তোষক জ্বালিয়ে দিল এবং বেচারার নিজের টাকায় কেনা organic chemistry’র Morrison and boyed- এর লেখা বিশাল বইটাও চিড়ে কুটিকুটি করে ফেলল। বই কুটিকুটি করার বিষয়টি উল্লেখ করার বিষয়টি গুরুত্বর্পর্ণ একটি কারণে যে, বইটা সে অনেক দাম দিয়ে স্কলারশিপের টাকায় কিনেছে। তার একটাই বই। কেমিস্ট্রির অন্য বইগুলি সে লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ত। নতুন করে আরেকটা তোষক কেনার টাকা তার ছিল না। খাটে পত্রিকার কাগজ বিছিয়ে ঘুমানো ছাড়া তার কোন পথ রইল না। ’

হুমায়ূনের ভাষ্যমতে, তখন এসব সন্ত্রাসীর কাছে শিক্ষকরাও ছিলেন অসহায়। তাদের নাকের ডগায় সন্ত্রাসীরা নানা অপরাধ করে বেড়াত বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলিতে। এ বিষয়ে হুমায়ূন লিখেন-‘সন্ত্রাসের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগে মাথা নিচু করে থাকতেন। এখনো থাকেন। ’

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব হয়তো ছিল না, সাহসের অভাব ছিল’।