অমেরুদণ্ডী থাকার চেয়ে শূন্য বিশ্ববিদ্যালয় ভালো


Dhaka
Published: 2019-10-11 08:23:06 BdST | Updated: 2019-11-18 19:23:13 BdST

|| শরীফ শহীদুল্লাহ্ |

‘...প্রার্থীকে অবশ্যই অমেরুদণ্ডী হতে হবে এবং অন্যান্য শর্তে ছাড় দেয়া গেলেও মেরুদণ্ডী প্রার্থীদের আবেদন কোনো কারণ-দর্শানো ব্যতিরেকে বাতিল করা হবে।’

মঙ্গলগ্রহে মানুষ জাতির বসবাস শুরু হওয়ার সাড়ে ৩ হাজার বছর পরের ঘটনা। ওই গ্রহের মগের মুল্লুক নামের রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদটি শূন্য হয়েছে। ভিসি নিয়োগের জন্য দেশের সকল জাতীয় দৈনিকে যে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়েছে, সেই বিজ্ঞপ্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত এটি।

বিজ্ঞপ্তিটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। এতদিনে রাষ্ট্র একটা উত্তম সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মগের মুল্লুক রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষিত মেরুদণ্ডহীনরা খুশিতে নাচতে থাকে। যদিও মগের মুল্লুকের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অমেরুদণ্ডী দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ওই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি-প্রোভিসি ট্রেজারার প্রক্টর প্রভোষ্ট সবাই অমেরুদণ্ডী। বলা যায়, অলিখিতভাবে অমেরুদণ্ডীদের জন্যই বরাদ্দ থাকে লাভজনক পদগুলি।

জাতীয় অমেরুদণ্ডী শিক্ষক সমিতি দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য বিবৃতি প্রদান করে, ‘এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জাতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই শর্ত দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এন্ট্রি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অমেরুদণ্ডী নিয়োগের শর্ত শক্তভাবে মানতে হবে। আর মেরুদণ্ড যুক্ত গুটিকয়েক শিক্ষক যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে আছেন তাদের দ্রুত পদচ্যুত করতে হবে। কারণ, মেরুদন্ডীরা নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে কথা বলে বলে দেশের বারোটা বাজিয়েছে। দেশকে রক্ষার জন্য মেরুদণ্ডীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়ন করা এখন সময়ের দাবি।’

মোট সাড়ে সাত হাজার আবেদন পড়েছে। মঙ্গলগ্রহের কোনো দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদে এত আবেদন পড়ার ঘটনা এই প্রথম। নিয়োগ কমিটি রীতিমতো ভড়কে গেছেন আবেদনের সংখ্যা দেখে। ছোট্ট একটা দেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে এত মানুষ মেরুদণ্ডহীন!

আবেদন দাখিলের দিন শেষ হওয়ার পরপরই প্রার্থীদের দৌড়ঝাপ শুরু হয়। মেরুদণ্ডহীনদের সংখ্যা বেশি হলে যা হয়, তাই আরকি। নিজেকে প্রকৃত মেরুদণ্ডহীন প্রমাণের জন্য আবেদনকারীরা বিভিন্নভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে। কেউ কেউ হাসপাতালে গিয়ে সার্জারির মাধ্যমে মেরুদণ্ড অপসারণ করে সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্ততি নেয়। কেউ কেউ কেঁচো ও এ্যামিবা কীভাবে চলে, সে প্রশিক্ষণও নেয়। ভিসির লোভনীয় পদটা তাদের চাই-ই-চাই।

সাক্ষাৎকারের দিন উচ্চশিক্ষিত অমেরুদণ্ডী প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা শুরু হয়- কে কতটা মেরুদণ্ডহীন তা বোঝানোর জন্য। ভিসি নিয়োগ কমিটি সকল অমেরুদণ্ডীদের সাক্ষাৎকার নেয়। বিশেষ সার্জারি এক্সপার্টের মাধ্যমে মেরুদণ্ড চেক করানো হয়। কারো মেরুদণ্ড নেই। কমিটি ভীষণ খুশি!

যাচাই বাছাই শেষে কমিটি লক্ষ করে যে, মগের মুল্লুকের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র একজন প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. দস্তগীর ভিসি পদের জন্য আবেদন করেননি। সবাই আবেদন করলেন অথচ ড. দস্তগীর কেন এতবড় লোভনীয় পদের জন্য আবেদন করলেন না, নিয়োগ কমিটি তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বিশেষ দূত মারফত ড. দস্তগীরকে খবর দেয়া হলো। ড. দস্তগীর দূতকে জানিয়ে দিলেন যে, আবেদনের যোগ্যতা না থাকায় তিনি আবেদন করেননি। আর সঙ্গত কারণে কমিটির সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ তার নেই।
নিয়োগ কমিটি সদস্যবৃন্দ গেলেন ড. দস্তগীরের বাড়িতে।
কেন আবেদন করলেন না স্যার?
-দেখুন, নীতি বিসর্জন দিয়ে বড় পদ আমার দরকার নেই। শিক্ষক আমার বড় পরিচয়। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে বাঁচতে চাই সে জন্য আবেদন করিনি।

কমিটির সদস্যবৃন্দ গোপন বৈঠক করলেন। পরদিনই মগের মুল্লুক রাজ্যের রাজা তথা মাননীয় চ্যান্সেলরের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করলেন। প্রতিবেদন এরকম:
‘মূলত মেরুদণ্ডী শিক্ষক চিহ্নিত করার জন্যই একটু কৌশল খাটিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলাম। আবেদনকারীগণ কেউ লোভনীয় ভিসি পদটি দখল করার জন্য নিজেদের অমেরুদণ্ডী ঘোষণা দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। তার অর্থ এই যে ওই আবেদনকারীরা সবাই অমেরুদণ্ডী। কারও কারও দুর্বল মেরুদণ্ড ছিল কিন্তু লোভ আর ক্ষমতার মোহে তারা সেই মেরুদণ্ড ত্যাগ করেছেন। তবে একজন মাত্র শিক্ষক আবেদন করেননি, তিনি অধ্যাপক ড. দস্তগীর। এত এত লোভের মধ্যেও যিনি স্থির আছেন, আমাদের বিবেচনায় তিনিই ভিসি পদের জন্য একমাত্র যোগ্য প্রার্থী। সুতরাং ড. দস্তগীরকে পরবর্তী ভিসি পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলো।’

চ্যান্সেলর মহোদয় সুপারিশ প্রাপ্তির পরদিনই ড. দস্তগীরকে ভিসি পদে নিয়োগ দিলেন। এবং রাজা মহাশয় তথা চ্যান্সেলর নতুন ভিসিকে নির্দেশ দিলেন যে, ‘আপনার প্রথম কাজ হলো স্বঘোষিত অমেরুদণ্ডীদের চাকুরিচ্যুত করা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাতির বিবেক। এই বিবেক অমেরুদণ্ডীদের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। আর ভবিষ্যতের মঙ্গলগ্রহে মাথা উচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদেরকে মেরুদণ্ডী হতে হবে। কেবল মেরুদণ্ড যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই পারে সেই মেরুদণ্ডী জাতি গড়তে।’

চ্যান্সেলরের নির্দেশমতো নয়া ভিসি ড. দস্তগীর তার প্রথম দায়িত্বটি পালন করলেন। তিনি এক আদেশে সব অমেরুদণ্ডীদের চাকুরিচ্যুত করলেন। আর আদেশের শেষ লাইনে লিখে দিলেন, ‘অমেরুদণ্ডীদের চেয়ে শূন্য বিশ্বদ্যালয় ভালো।’