পৃথিবীর সেরা এনাটমি গ্রন্থের পেছনে রয়েছে করুণ ইতিহাস


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2019-08-24 09:10:25 BdST | Updated: 2019-09-17 14:31:11 BdST

অ্যানাটমি বইয়ে সাধারণত মানবদেহের চামড়া, পেশি, শিরা-উপশিরা, স্নায়ু, দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড় চিত্রের সাহায্যে বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। অপারেশনের সময় অনেক সার্জনের কাছেই জরুরি হয়ে ওঠে এ ধরনের একটি অ্যানাটমি গ্রন্থ। আর অ্যানাটমি বইয়ের মধ্যে দুনিয়ার সেরা বই হিসেবে স্বীকৃত ‘পার্নকপ্ফ টোপোগ্রাফিক অ্যানাটমি অব ম্যান’ বা পার্নকপ্ফ প্রণীত অ্যানাটমি বইটি।

এই বইয়ের পেছনে রয়েছে এক রক্তাক্ত করুণ ইতিহাস। নািসদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে গবেষণালব্ধ ফল সন্নিবেশিত হয়েছে ঐ গ্রন্থের সমস্ত পৃষ্ঠা জুড়ে। হাতে আঁকা জটিল সব চিত্রসংবলিত এই গ্রন্থে রয়েছে মানবদেহের বিস্তারিত খুঁটিনাটি। কিন্তু পার্নকপে্ফর বইটি এখন আর বাজারে নেই। তাই কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থের পুরোনো একটি সেটও যে কোনো সার্জনের কাছে মহামূল্যবান। হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করেও এটি সংগ্রহে রাখতে দ্বিধা করেন না আগ্রহীরা। চড়া মূল্যের এই গ্রন্থ কেউ কেউ সাজিয়ে রাখেন ক্লিনিকে কিংবা বাড়ির গ্রন্থাগারে।

সমালোচকেরা মনে করেন, গ্রন্থটির যেহেতু কালো ও মর্মান্তিক এক ইতিহাস রয়েছে, তাই এটি ব্যবহারের প্রসঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। নািসবাদী খ্যাতিমান ডাক্তার এডুয়ার্ড পার্নকপেফর ২০ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প ছিল এই অ্যানাটমি গ্রন্থ। সহকর্মীদের ভাষ্যানুযায়ী, পার্নকপ্ফ ছিলেন নািসবাদের উগ্র সমর্থক। এমনকি কর্মস্থলেও তিনি রোজ নািস ইউনিফর্ম বা উর্দি পরে যেতেন। তাকে যখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলের ডিন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তিনি সব ইহুদি সহকর্মীকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের মধ্যে ছিলেন তিন জন নোবেল বিজয়ীও।

১৯৩৯ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে বলা হয়, বন্দিদের হত্যা করার পরপরই গবেষণা ও শিক্ষার কাজের জন্য তাদের দেহগুলোকে নিকটস্থ অ্যানাটমি বিভাগে জমা দিতে হবে। সেই সময়ে ড. পার্নকপ্ফ দিনে ১৮ ঘণ্টা করে কাজ করতেন। মৃতদেহগুলো একের পর এক ব্যবচ্ছেদ করতেন। সেই সময়ে তার সঙ্গে থাকতেন একদল আঁকিয়ে, যারা সেগুলো আঁকতেন। মৃতদেহ দিয়ে অ্যানাটমি বিভাগগুলো কখনো কখনো উপচে উঠত। বিভাগগুলোতে আর মৃতদেহের স্থান সংকুলান না হলে তখন কখনো কখনো বন্দিশিবিরগুলোতে হত্যাকাণ্ড সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতো।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সেবিন হিল্ডাব্র্যান্ডট বলছিলেন, পার্নকপে্ফর গ্রন্থে যে ৮০০ চিত্র রয়েছে, তার অন্তত অর্ধেকই এসেছে রাজনৈতিক বন্দিদের থেকে। এসব বন্দির তালিকায় সমকামী নারী-পুরুষ, জিপসি, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি ও ইহুদিরা ছিল।

এই এটলাসের প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। বইটিতে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে এরিখ লেপিয়ের ও কার্ল এন্ডট্রেসের স্বাক্ষর ও স্বস্তিকা চিহ্ন রয়েছে। এমনকি ১৯৬৪ সালে ইংরেজি ভাষায় দুই খণ্ডে গ্রন্থটির যে সংস্করণ বের হয়, সেখানেও আদি স্বাক্ষর ও নািস চিহ্ন ছিল। পরবর্তীতে নািস চিহ্ন ঢেকে দেওয়া হয়। এই অ্যানাটমি এটলাসের হাজার হাজার কপি দুনিয়া জুড়ে বিক্রি হয়েছিল এবং অনূদিত হয়েছিল পাঁচটি ভাষায়। বইটির মুখবন্ধে এটিকে ‘দুর্দান্ত অঙ্কন সংবলিত সচিত্র একটি অসাধারণ শিল্প’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু একটিবারের জন্যও এর পেছনের রক্তাক্ত করুণ অতীত উল্লেখ করা হয়নি।

১৯৯০-এর দশকের দিকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা প্রথম প্রশ্ন করতে শুরু করেন—এই গ্রন্থে যাদের ছবি অঙ্কন করা হয়েছে, তারা কারা? অতঃপর গ্রন্থটির কালো ইতিহাস প্রকাশ পাওয়ার পর ১৯৯৪ সালের দিক থেকে বইটি আর বাজারে পাওয়া যায় না।—বিবিসি

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।