ডাকসু কি তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরে রাখতে পারবে?


ঢাবি টাইমস
Published: 2019-03-25 23:04:56 BdST | Updated: 2019-05-27 03:56:05 BdST

||শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন||

দীর্ঘ ২৮ বছর পরে গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের অন্যান্য পর্ষদ, যেমন সিনেটের শিক্ষক প্রতিনিধি, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের নির্বাচনগুলো নিয়মিতভাবে হলেও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র (ও ছাত্রী) সংসদের নির্বাচনের উদ্যোগ প্রায় তিন দশক সময়ে কেউ নেননি।

এই নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া ও নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য আমি সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ দিতে চাই । কেননা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও, সরকারের সদিচ্ছা ও ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। আবার সরকার চাইল, সবুজ সংকেতও দিল, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তৎপর হলো না, সেক্ষেত্রেও কিন্তু ডাকসু নির্বাচন সম্ভব নয়। সেজন্যে ডাকসু নির্বাচনের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সদিচ্ছা, উদ্যোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রায় তিন দশকে যেহেতু কোনও নির্বাচিত সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেননি, সুতরাং বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ না নিলেও তাতে কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না বলেই আমি মনে করি। যদিও গত বছর একজন শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে অনশনে বসেছিলেন এবং সেটি গণমাধ্যম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, কিন্তু সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা না থাকলে যত প্রতিবাদই হোক না কেন ডাকসু নির্বাচন হতো না, যেমনটি ২৮ বছরে হয়নি।

অনেকেই বলবেন, হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা ছিল এ বছরের এপ্রিল/মে এর মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য। কিন্তু আইনের ছাত্র হিসেবে আমি যা বুঝি সেটি হচ্ছে, ‘গাইডলাইন’ বা ‘ডাইরেকটিভে’র মতো ওটি একটি নির্দেশনা ছিল, ওই নির্দেশনা মানার কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাছাড়া বাধ্যবাধকতা থাক বা না থাক, হাইকোর্টের নির্দেশনা আপিল বিভাগে গিয়ে স্থগিত করা যেত বা ‘ভ্যাকেট’ করা যেত। এজন্যই ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ ও সেটি সম্পন্ন করার জন্য আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে সাধুবাদ দিচ্ছি। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নয়, সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন যে, ডাকসু নির্বাচন কতটা ঝুঁকি ও ঝঞ্জাটের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকারের ব্যাপারে শুধু সচেতনই নন, অধিকারের চর্চা ও সুরক্ষার জন্য ঐতিহাসিকভাবে তারা বেপরোয়া ও প্রতিবাদী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডান, বাম, মধ্যপন্থীসহ সকল ধারাই কম বেশি তৎপর। এমন কি চরম ডান বা মৌলবাদী সংগঠনও এখানে গোপনে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত কোনও আন্দোলন বা ডাকসু নির্বাচনের মতো কোনও ঘটনা গণমাধ্যমেরও ব্যাপক মনোযোগ পায়।

বাংলাদেশের ৪১ টি ‘পাবলিক’ বা গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি, তবে প্রাচীনতম এবং অনন্য। কেননা ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এতদঅঞ্চলে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তীতে ভাষা অন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান, মুক্তযুদ্ধ ও বাঙালি জাতি গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে একটি বিশেষ ভূমিকা। পাশাপাশি বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডাকসুর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। ফলে ডাকসু নির্বাচনটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদসহ গোটা দেশবাসীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আগেও ছিল, এখনও আছে।

তবে ডাকসু নির্বাচন কেন আগের মতো সমগ্র দেশবাসীর মনোযোগ পাচ্ছে, সেটি একটি প্রশ্ন বটে? পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে এবং সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ডাকসু ইতিবাচক অবদান রেখেছে; সেজন্যে ডাকসু নেতৃবৃন্দ জাতীয়ভাবে গুরুত্ব পেয়েছেন। বলে রাখা ভাল যে, ডাকসুর গুরুত্বকে পুঁজি করে কোনও কোনও ভিপি-জিএস পরবর্তীতে সরকারের মন্ত্রী হয়ে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছেন। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর ও আশির দশকে ডাকসুর যে গুরুত্ব ছিল, সেই গুরুত্ব ভবিষ্যতে থাকবে কি না, সেই প্রশ্নটি আমার মনের মধ্যে অনেক দিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেননা গত ১১ মার্চের নির্বাচনটি ব্যাপক গুরুত্ব ও প্রচার পেয়েছে, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পরে নির্বাচনটি হয়েছে, এই কারণে। তাছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রাটি কোন্ দিকে বাঁক নেবে, সে ব্যাপারে একটি ধারণা পেতে, নিদেন পক্ষে একটি ইঙ্গিত পেতেও অনেকে তাকিয়ে ছিলেন ডাকসু নির্বাচনের দিকে।
কিন্তু প্রতি বছর যদি নিয়মিতভাবে ডাকসু নির্বাচন হতে থাকে, তাহলে ডাকসুর আগের গুরুত্ব কি থাকবে? কেননা, ডাকসু গুরুত্ব পেয়েছে সরকার বিরোধী আন্দোলন করে। পাকিস্তান আমলে ও বাংলাদেশে ডাকসু নেতৃবৃন্দ সামরিক স্বৈরাচার ও অগণতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। সাধারণ মানুষের আশা-আকাংখাকে ধারণ করা ও প্রধান রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমর্থনের কারণে ডাকসু ও তার নেতৃবৃন্দ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিলেন এবং উঠেছিলেন ভিন্ন এক উচ্চতায়। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে, বিশেষ করে ১৯৯১ সাল থেকে, জনগণের প্রতিনিত্বকারী দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। সরকারি ছাত্র সংগঠনগুলোকেই গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি এবং হলগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেখা গেছে। ষাট, সত্তর ও আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দাপুটে বাম প্রগতিশীল রাজনীতির ধারাটি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। উল্টো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শক্তিশালী হয়েছে হিযবুত তাহরীরের মতো সংগঠন এবং জঙ্গিবাদী ধারা।

লেখকঃ শেখ হাফিজুর রহমান  এক সময় ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর যে নির্ভরশীলতা ছিল, সেটি কমে এসেছে। পেশাদার অনেক সংগঠন, যেমন আইনজীবীদের সংগঠন, ব্যবসায়ীদের সংগঠন, শিক্ষক, সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের সংগঠন আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। পেশা সংশ্লিষ্ট দাবি দাওয়া আদায়ে এ সংগঠনগুলো যেমন তাদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে সফল হচ্ছে; তেমনি জাতীয় নানা বিষয়ে সরকার তাদের পরামর্শ নিচ্ছে; কোনও কোনও ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার ও পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে এক ধরণের ‘পার্টনারশিপ’ তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে এক সময়ে কৃষক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর যে প্রভাব ছিল সেটি দুর্বল হয়েছে, যদিও বেতন ভাতাসহ ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায় করার জন্য প্রায়শই পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন করতে দেখা যায়।

গত বছর কোটা সংস্কারের দাবিতে গণ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করেন এবং শেষমেশ সরকার তাদের দাবিদাওয়া মেনেও নেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে এক অভিনব ও অনন্য আন্দোলন গড়ে তোলেন স্কুল কলেজের কিশোর ও কিশোরীরা, যেটি দেশের গণ্ড পেরিয়ে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসাও পায়। তবে ছাত্রছাত্রী ও শিশু কিশোরদের এ ধরনের অভিনব ও বিরল দৃষ্টান্তের আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল স্বতস্ফূর্ত; এবং আন্দোলনগুলো সংগঠিত করার পেছনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন বা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মতো জাতীয় ও ঐতিহ্যবাহী কোনও ছাত্র সংগঠনের সক্রিয়তা বা তৎপরতা ছিল না, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সমর্থন থাকতে পারে।

এই অর্থে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন ও শিশু কিশোরদের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের আন্দোলন ছিল ভেতর থেকে গড়ে ওঠা, তবে কাঠামোবিহীন। কেননা, প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠনের মতো এদের কোন ‘স্ট্রাকচারড কমিটি’, ‘প্ল্যাটফর্ম’ বা জাতীয় পর্যায়ে কোনও মাতৃ বা পিতৃ সংগঠন ছিল না, এখনও নেই। একবিংশ শতাব্দীর নগরায়িত, শিল্পায়িত ও উন্নয়নশীল বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ মন্তব্য করা যায় যে, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের কিশোর-কিশোরীরা আন্দোলন ও প্রতিবাদের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রথাগত ছাত্র রাজনীতির প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৈরী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশের নতুন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের সংগঠনবিহীন স্বতস্ফূর্ত আন্দোলন বৃদ্ধি পেতে পারে।

শিশু কিশোর ও ছাত্রছাত্রীদের এ ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত, জনপ্রিয় ও ন্যায্য দাবি দাওয়াভিত্তিক আন্দোলন ছাত্র রাজনীতির প্রচলিত ধারাকে নিঃসন্দেহে ম্লান করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্দোলন হতে থাকলে ছাত্র রাজনীতির ধারা ম্লান থেকে ম্লানতর হবে বলে ধারণা করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে ডাকসুর পূর্বেকার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লুপ্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে এটি শর্ত সাপেক্ষ। ডাকসু তার আগের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে, না কি প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির মতো গুরুত্ব হারিয়ে স্রোতহীন জলাশয়ের মতো হয়ে যাবে, সেটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র কোন দিকে বাঁক নেয় তার ওপরে।

বাংলাদেশে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিকতা পেতে থাকে; সরকার ও কার্যকর বিরোধী দলের সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাটি যদি শক্তি সঞ্চয় করা শুরু করে; শিক্ষক; সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার পেশাজীবী সংগঠনগুলো যদি শক্তিশালী হয়ে ওঠে; ইতিমধ্যে গঠিত ও বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী যদি নিজেদের ও নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার নজরদারিতে থাকে; এবং সর্বোপরি সরকার যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে; তাহলে একদা যে ছাত্র রাজনীতি জাতীয় রাজনীতি ও ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করত, সেটি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে। ১৯৯১ সাল থেকেই ছাত্র রাজনীতির ধারাটি দুর্বল হতে শুরু করেছে। ছাত্র রাজনীতির প্রচলিত ধারটি দুর্বল হয়ে গেলে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি শক্তিশালী হয়ে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত হলে, ডাকসুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কি থাকবে?

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।