ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেকারণে এশিয়ার সেরা তালিকায় নেই


ঢাকা
Published: 2019-05-08 14:03:14 BdST | Updated: 2019-06-20 16:58:51 BdST

এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং দেখছিলাম অনলাইনে। যুক্তরাজ্যের শিক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ প্রতি বছর এই ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং’ প্রকাশ করে থাকে। সেখানে এশিয়ার ৪১৭টি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মান বা মর্যাদানুক্রমিক তালিকা দেওয়া হয়েছে। এই মান নির্ধারণের জন্য রিসার্চ, সাইটেশনস, টিচিং, ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক ও ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম এই পাঁচটি ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করা হয় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে নম্বর প্রদান করা হয়; তারপর পাঁচটি ক্ষেত্রের সম্মিলিত সক্ষমতার ভিত্তিতে ‘ওভারঅল’ বা সামগ্রিক মান নির্ধারণ করা হয়।

সংস্থাটির অনলাইনে দেশের নাম লিখে সার্চ করলে সে দেশের কয়টি প্রতিষ্ঠান তালিকায় আছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কত নম্বরে ইত্যাদি দ্রুত জানার সুযোগ আছে। আমি প্রথমেই বাংলাদেশ লিখলাম, দেখি ফলাফল শূন্য। নেপাল লিখতে শুরু করে ‘ঘব’ লেখামাত্রই ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এসে গেল। শ্রীলঙ্কার নাম লিখতে গিয়েও দেখি ইউনিভার্সিটি অফ কলম্বোর নাম এসে যাচ্ছে। আর পাকিস্তান লিখতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছি, দেখি দেশটির ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে, ভারত লিখে তালিকা দেখে একটু আশাহতই হয়েছি। ভারতের মোট ৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে তালিকায়। যদিও ভারতের শিক্ষা ও গবেষণার মান বিবেচনায় আমার ধারণা ছিল তারা আরও ভালো করবে। অবশ্য আমার ভারতীয় বন্ধু-বান্ধব ও সংবাদ মাধ্যমের বরাতে জানতে পারছিলাম বর্তমান মোদি সরকার শিক্ষা, বিশেষ করে গবেষণায় বরাদ্দ কংগ্রেস আমলের তুলনায় অনেক কমিয়ে দিয়েছে।

এই তালিকায় ভারতের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান হলো ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’, যার অবস্থান এশিয়ার ৪১৭টি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯তম।
এশিয়ার সেরা ৪১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামও নেই! যেখানে শ্রীলঙ্কা ও নেপালেরও নাম আছে। আর পাকিস্তানের তো আছে ৯টি। অথচ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার দিক থেকে নেপাল, শ্রীলঙ্কা তো বটেই এমনকি পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে যাব আমরা। প্রথমেই প্রশ্ন আসতে পারে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই তালিকায় নেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তরও হবে প্রশ্ন দিয়ে, থাকবে কেন? যে যে কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠে তার কোনো চিহ্ন কি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত?

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি

আমাদের শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা কেমন? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ভর করে তার শিক্ষকদের মানের ওপর। শিক্ষকদের মান নির্ভর করে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির নিয়মের ওপর। ‘পদোন্নতির নীতি’ এমন হবে যাতে শিক্ষক সর্বদা নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করতে থাকেন। ভাবা যায়, কেবল ১২টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে যাওয়া যায়! তাও সেগুলো যেনতেন একটি জার্নালে প্রকাশিত হলেই চলে! আমার স্থির বিশ্বাস আমাদের অধ্যাপকদের অধিকাংশের যা যোগ্যতা, তা নিয়ে এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশের কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপকও হওয়া যাবে না। কিন্তু আমাদের এখানে শুধু অধ্যাপকই নন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, ডিন, ভিসি সবই হয়ে যাওয়া যাচ্ছে।

 

মাত্র কয়েকদিন আগে শুনলাম Emily A. Carter K, University of California Los Angeles সংক্ষেপে যাকে UCLA বলে, তার ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু একবার তার নামটি লিখে গুগল স্কলার সাইটেশনস ঘুরে আসুন। তার সাইটেশনস সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় এই নারী কারও দান-দক্ষিণায় বা কোনো দলীয় আনুগত্যে এই পদ পাননি। এটি তার অর্জন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপাচার্যই হলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিভাবক। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ৭৩-এর অধ্যাদেশের অধীনে যেগুলো আছে, তাদের ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নির্বাচন নির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কখনো নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও এই পদ্ধতি নেই।

নির্বাচন মানেই হলো মন জুগিয়ে চলা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন। ভিসি চান তার মনোভাবাপন্নরা নির্বাচনে জিতে আসুক। ফলে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে ‘পদোন্নতি নীতি’ শিথিল করার চাপ থাকে যাতে সাধারণ শিক্ষকদের ভোট পায়। আমাদের ভিসিরা তুষ্ট করতে গিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতি শিথিল করেন। এই শিথিল করতে গিয়ে আমরা পদোন্নতির এক আশ্চর্য নিয়ম বের করলাম, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পদ পুনর্বিন্যাস পদ্ধতি’ বা ‘‘restructuring system’! এটা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে কোনো শিক্ষকের যদি পদোন্নতির জন্য অনুকূল যোগ্যতা না থাকে বা পদ না থাকে, তাহলেও এই ‘পদ পুনর্বিন্যাস পদ্ধতি’তে তা করা যাবে। এর ফলে দেখা গেছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি এখন অধ্যাপক। তাহলে মানসম্পন্ন শিক্ষক হবে কীভাবে? এই বিশ্ববিদ্যালয়েও একসময় পদোন্নতি পাওয়া অনেক কঠিন ছিল। আমাদের সত্যেন বোসের পিএইচডি ছিল না বলে তখনকার প্রশাসন বিশেষ করে ভিসি পি যে হার্টগ চাননি পিএইচডি-বিহীন কেউ অধ্যাপক হোন। পরবর্তী সময়ে আলবার্ট আইনস্টাইনের রিকমেন্ডেশনের কারণে পিএইচডি-বিহীন কাউকে অধ্যাপক বানাতে রাজি হন। অর্থাৎ ব্যতিক্রমী মানুষের জন্য ব্যতিক্রম করাও ঠিক আছে। নাহলে ব্যতিক্রমী মানুষ তৈরি হবে না। আজকাল নিয়োগ পাওয়া যেমন সহজ পদোন্নতি পাওয়াও তেমনি সহজ। নিয়োগ পেতে হলে ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলে আর দলীয় আশীর্বাদ থাকলেই হলো। আমরা যদি নিয়োগ আর প্রমোশনের ক্ষেত্রে ‘মেধা’কে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় ধরতাম, আর অন্যসব সংশ্লিষ্টতাকে থোড়াই কেয়ার করতাম, তাহলে আমরা অবশ্যই অন্যরকম এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে পারতাম।

 

আগেই বলেছি, উপাচার্যই হলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিভাবক। কিচ্ছু লাগবে না, শুধু উপাচার্য আর উপ-উপাচার্য নিয়োগ করার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্কলারদের নিয়ে একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের গবেষক এবং প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন কোনো অধ্যাপককে খুঁজে বের করে যদি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলেই রাতারাতি দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে। ভাবুন তো একবার যে সরকার সত্যি সত্যি এমন কাউকে উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিল। এই সংবাদটি কি পজিটিভ একটি বার্তা দেবে? এমন হলে পরিবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতো, বোঝা যেত আমাদের সরকার চায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক। অনেকে বলবেন বাংলাদেশে ওরকম উপাচার্য দুইদিনও বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে পারবেন না। কেন পারবেন না? যদি না পারেন তার কারণ হবে তাকে পারতে দেওয়া হবে না। সরকার যদি আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় আজ থেকে কোনো ছাত্র সংগঠনকে অতিরিক্ত কোনো রাষ্ট্রীয় কিংবা দলীয় আনুকূল্য দেওয়া হবে না। উল্টো প্রশাসনের সকল ভালো উদ্যোগকে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করা হবে, তাহলে তো না পারার কোনো কারণ নেই। এখন সরকার যদি ছাত্র সংগঠনকে তাদের ক্ষমতায় থাকার প্রহরী স্বরূপ ব্যবহার করতে চায় তাহলে তার দলের শিক্ষক নেতাদের চেয়ে ছাত্রনেতারাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবেন আর এটিই সকল সমস্যার মূল।

শিক্ষকদের বেতন ও পার্টটাইম চাকরি

সমস্যা শুধু প্রশাসনে না, শিক্ষকদেরও। খোঁজ নিয়ে দেখুন তো ভারতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্য কোথাও টাকার বিনিময়ে পার্টটাইম পড়ান কি না! এমনকি পাকিস্তানেও কাউকে পাবেন না। প্রশ্ন হলো শিক্ষকরা কি সাধে আর আনন্দ ফুর্তি করতে একাধিক পার্টটাইম চাকরি করে থাকেন? ভারতের একজন পিএইচডি ছাত্র আমাদের প্রভাষক এমনকি সহকারী অধ্যাপকের চেয়েও বেশি বেতন পান। আর পাকিস্তানে শিক্ষকদের বেতন ভারতের চেয়েও বেশি। একজন শিক্ষক, যিনি কিনা সারা জীবন ভালো ছাত্রের তকমা নিয়ে বড় হয়েছেন, তিনি যদি বেতন দিয়ে মোটামুটি একটি জীবনযাপন করতে ব্যর্থ হন, তখনই পার্টটাইম আয়ের বিকল্প পথ বেছে নেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কারণ এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষককে যথেষ্ট সময় পায় না আর শিক্ষকও গবেষণার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। সারা দিন নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো আর পার্টটাইম পড়ানোর পর ওসব করার আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকার কথা না।

এর মধ্যে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করা হয়েছে ৭টি কলেজ, যাদের প্রত্যেকটির ছাত্রসংখ্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার থেকে হয় বেশি না হয় কাছাকাছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই একই সংখ্যক শিক্ষকদের কলেজগুলো সামলাতে দৌড়ের ওপর থাকতে হচ্ছে। আমাদের আগে বুঝতে হবে শিক্ষকদের খ্যাপমারা বা অন্য কাউকে উদ্ধারের কাজে লাগালে তারা গবেষণা না করার অজুহাত পেয়ে যাবেন। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজের ভারই বইতে পারছিল না, কোন কারণে তার ওপর আরও বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো? এর মাধ্যমে ৭টি কলেজের মান হয়তো সামান্য উন্নতি হবে, কিন্তু সেই সামান্য অর্জন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের মানের যে ধস নামছে এটা কি কেউ ভেবে দেখছে?

 

শিক্ষায় বিনিয়োগ ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়

এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এক থেকে দশের মধ্যে যারা আছে তাদের এক নম্বরে রয়েছে চীন। আগের বছর ছিল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর। সেটা এবার দুই নম্বরে চলে গেছে। চীনের মোট ৭২টি প্রতিষ্ঠান এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। চীনের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Tsinghua University) হলো এশিয়ার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় হলো পঞ্চম। এ তালিকায় হংকং-এর আছে ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, তার মধ্যে এশিয়ার তৃতীয় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটিও হংকং-এর। হংকংকে চীনের অংশ ধরলে তালিকায় চীনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৮টিতে। ছোট দেশ তাইওয়ানের মোট ৩২টি প্রতিষ্ঠান আছে এই তালিকায়। দেশটির শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটির অবস্থান তালিকার ২৫ নম্বরে। তালিকায় ইরানের আছে ২৯টি প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে ৪৩তম অবস্থানে আছে Babol Noshirvani University of Technology| । এ তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়ারও আছে ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে নবম অবস্থানে আছে Seoul National University এবং দশম অবস্থানে আছে Sungkyunkwan University (SKKU)। আজ থেকে ৩০ বছর আগেও এই দেশগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এত ভালো অবস্থানে ছিল না। এত দ্রুত এত ভালো করার রহস্যটা কী? রহস্য-টহস্য বলে কিছু নেই, এই উন্নতির চাবিকাঠি হলো শিক্ষায় বিনিয়োগ। চীন আর কোরিয়া শিক্ষায় যে ব্যাপক বিনিয়োগ করে যাচ্ছিল এবং করে যাচ্ছে তা এক অভাবনীয় ব্যাপার। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা আর অবশ্যই ভারত যে এগিয়ে যাচ্ছে তারও মূল কারণ শিক্ষায় বিনিয়োগ।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে নেপালের বরাদ্দ ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ যা বাংলাদেশের চেয়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। পাকিস্তানের বরাদ্দ বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। মালদ্বীপ শিক্ষা খাতে ব্যয় করে ৫ দশমিক ২ শতাংশ, ভারত ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ২ দশমিক ২ শতাংশ, ভিয়েতনাম ব্যয় করে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের বরাদ্দই সবচেয়ে কম। ২০১৬ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বাজেট কমানো হয়েছে। উল্লেখ্য, জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের বাজেট বরাদ্দ মাত্র ২ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কোর পরামর্শ দেশগুলো যেন শিক্ষা খাতে কমপক্ষে জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। কেউ কি উদাহরণ দিতে পারবেন যে আজ পর্যন্ত শিক্ষায় জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করেছে? ব্যতিক্রম হিসেবেও কোনো উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন না। তো আমরা এই সহজ সরল বিষয়টা কেন বুঝতে পারি না? বুঝতে পারি না বললে ভুল হবে, কারণ না বোঝার কোনো কারণ নেই। আসলে আমরা চাই না। শিক্ষায় উন্নতি করলে এমন লুটপাট চালানো দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এটা সহজ হিসাব।

সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় কোনো দেশের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকা না থাকার সঙ্গে একটি দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতির উন্নতি একটি ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার মতো। এই প্রতিযোগিতায় বর্তমানে চীন সারা বিশ্বেই অনেক এগিয়ে। দেশটিতে অর্থনীতির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানও একই সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে এই দুটো একটির সঙ্গে অন্যটি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কেউ একা এগোতে পারে না। আমরা কি এটা বুঝি? বুঝলে বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষার মানের অধঃপতন সত্ত্বেও এত উন্নয়ন উন্নয়ন করতাম না। আমরা সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন চাই, যার মূলে রয়েছে শিক্ষার উন্নয়ন। আর শিক্ষার উন্নয়ন কোনোদিন আকাশ থেকে নাজিল হবে না। সে জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ।

লেখকঃ কামরুল হাসান মামুন || শিক্ষক || ঢাবি

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।