'শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতিও র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ'


ঢাবি টাইমস
Published: 2019-05-09 16:09:09 BdST | Updated: 2019-09-20 00:57:14 BdST

  • আমাদের শিক্ষকদের যে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সেখানে রাজনীতি থাকে তাহলে র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। নতুন শিক্ষক যে নেওয়া হচ্ছে তার মান কী? আমরা পিএইচডি ছাড়াই অনেককে অধ্যাপক করে ফেলি- সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “এশিয়ার মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে। এক নম্বর কারণ হচ্ছে, উচ্চশিক্ষায় আমাদের বাজেট দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে কম। আর শিক্ষা বাজেট যে ২.১ শতাংশ রয়েছে সেটিও দক্ষিণ এশিয়ার মান থেকে অনেক পিছিয়ে। আমরা যদি গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি না করি, সেখানে শুধু ক্লাসের পাঠদানই র‌্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে না। এটি অনেককিছুর সমষ্টি। পাঠদানের মানের পাশাপাশি শিক্ষকদের যোগ্যতাও দেখতে হয়। শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রকাশনাও থাকতে হয়। পিএইচডি কোথা থেকে করা হলো, থিসিসের বিষয়টা কী- সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তারপর পাঠদানের মানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। র‌্যাঙ্কিংয়ের সময় সেগুলোও বিবেচনায় আসে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে সেখানে গবেষণা খাতে কতো টাকা থাকে সেটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ-সুবিধা কেমন রয়েছে? অর্থাৎ, গ্রন্থাগারে কী কী বই রয়েছে। আমরা প্রতি বছর কী কী বই কিনছি তারও একটি তালিকা অনলাইনে চলে যায়। দেখা যায় যে আমরা পাঁচ-ছয় বছর পর পর বই কিনি। খুব কম বিভাগ রয়েছে যারা তাদের বইয়ের তালিকা হালনাগাদ করতে পারে। কারণ, টাকা বরাদ্দ অনেক কম থাকে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কথা বলতে পারি- বই একবার কিনলে দুই/তিন বছরের মধ্যে আবার বই কেনার টাকা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর যদি ২০টি বইয়ের তালিকা দেই তাহলে পাঁচটি বই পাই। আমাদের গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা কেমন রয়েছে? প্রত্যেক বিভাগের কি পর্যাপ্ত গ্রন্থাগার রয়েছে? আমাদের শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগারে যায় কিন্তু, তারা সেখানে যায় বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া জন্যে।– যারা র‌্যাঙ্কিংয়ের কাজ করেন এসব তথ্য তাদের কাছে থাকে।”

“এরপর, আমাদের শিক্ষকদের যে নিয়োগ দেওয়া হয় যদি সেখানে রাজনীতি থাকে তাহলে র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। নতুন শিক্ষক যে নেওয়া হচ্ছে তার মান কী? আমরা পিএইচডি ছাড়াই অনেককে অধ্যাপক করে ফেলি- সেটিও একটি বড় ফ্যাক্টর। পৃথিবীতে এমন ঘটনা খুব কম হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। প্রভাষকের সংখ্যা কম। অধ্যাপকদের যোগ্যতা যাচাই করলে দেখা যাবে যে তিনভাগের একভাগ অধ্যাপকের কোনো পিএইচডি নেই। পিএইচডি গবেষণা কেমন হচ্ছে সেটিও দেখতে হবে। বিজ্ঞান অনুষদের গবেষণাগার হালনাগাদ করা হয়েছে- তাতো না। চার-পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্যগুলোর কোনো স্যান্ডার্ড নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ নেই। সেটিও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কো-কারিকুলাম অ্যক্টিভিটিস কীভাবে হয়, শিক্ষার্থীদের যেসব কাউন্সিল থাকে সেগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে কী না, যেমন অক্সফোর্ড ডিবেট ইউনিয়ন রয়েছে এবং সেটির মতো স্ট্রং বডি মনে হয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টও না। আমাদের সেগুলো রয়েছে কী না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শেখাচ্ছে কী না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কী রকম। ক্লাস আওয়ার কতোটুকু।– এরকম অনেককিছু রয়েছে যা বিবেচনায় আনতে হয়।”

“এই যে ডাকসু নির্বাচন হলো- এরও প্রভাব পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মূল্যায়ন করতে গিয়ে। এখানে গণতন্ত্রের কোনো চর্চা হয় না, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শেখাচ্ছে কী? এর উদ্দেশ্য কী? আমরা যে শুধু চাকরিজীবী তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় করছি সেটি কিন্তু আমাদের পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মস্তবড় ফ্যাক্টর। আমরা গ্র্যাজুয়েটদের তৈরি করছি সরকারি চাকরি পাওয়ার জন্যে, সমাজকে আলোকিত করার জন্যে নয়। বিজ্ঞান অনুষদের অনেক শিক্ষার্থী বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে পাগল হয়ে থাকে। তারা তো বিসিএস দেওয়ার জন্য নয়। তারা গবেষক হবে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল থেকে পাশ করে বিসিএস দিয়ে অন্য কাজে যাচ্ছে।”

“আমাদের বড় বড় অফিসারদের ভাষা-জ্ঞান দুর্বল। তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষমতা মানসম্পন্ন নয়। র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণকারীরা এগুলোর খবরও রাখে। তারা তো অনেক রকমের জরিপ চালায়। যারা গ্র্যাজুয়েট তাদেরও সাক্ষাৎকার নেয়।”

আপনি এতো এতো সমস্যার কথা বললেন কিন্তু, এগুলো সমাধানের জন্যে কী করা হচ্ছে?- “আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নতি না হলে মাধ্যমিকের উন্নতি হবে না। এইট-নাইনের ইংরেজি-জ্ঞান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে। তাদের মানসিক বিকাশও সেরকম থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও তারা হৈহৈ-চিৎকার করছে, দৌড়াদৌড়ি করছে যা সিক্স-সেভেনে, এইট-নাইনের ছেলেমেয়েরা করে থাকে। এরকম দৃশ্য নেপালের বিশ্ববিদ্যালয়েও দেখা যায় না। সেই জন্যে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত করতে হবে। আমাদের ২০১০ সালে শিক্ষানীতিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনটি ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে যতোটা সম্ভব একটি ধারায় নিয়ে আসতে হবে। মাদরাসা থাকবে কিন্তু তাদেরকে বিজ্ঞান, কম্পিউটার শেখাতে হবে। এটি সম্ভব হলে আমাদের ফিডার সিস্টেমটা অনেক শক্ত হয়ে যাবে।”

“তারপর আসতে হবে কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায়। এটিকে বিলুপ্ত করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় রাখতে হবে। সেখানে কারিগরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিলেক্টেড এডুকেশন দেওয়া হবে। সবার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এটি শুনলে হয়তো খারাপ লাগে। কিন্তু, পৃথিবীর কোথাও এমন ব্যবস্থা নেই।”

“এছাড়াও, শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে বিমুখ হতে হবে। কঠোর ব্যবস্থার মাধ্যমে বলতে হবে যে রাজনীতি করলে চাকরি থাকবে না। রাজনীতি করলে করবেন আদর্শের রাজনীতি। মানুষের জন্যে আমরা সংগ্রাম করবো, আমি শক্তভাষায় লিখবো, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেউ কাড়বে না। কিন্তু, আমি দলীয় রাজনীতি করলে দল থেকে দায়িত্ব নিতে হবে- আপনি তাকে ওয়ার্ড কমিশনার বানান, কাউন্সিলর বানান, কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখবেন না। এই বিরাজনীতিকরণকে আমাদের খুব গুরুত্ব দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি থাকবে না। বরং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রটি আরও বড় করে প্রস্তুত করতে হবে।”

“এরপর যা করতে হবে তা হলো- বাজেট বাড়াতে হবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন আমাদের শিক্ষাবাজেট জিডিপির ৪ শতাংশ হতে হবে। আমরা এখনো তা করতে পারিনি। আমাদেরকে তো জিডিপির ৪ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করতে হবেই। ক্রমান্বয়ে তা ৮ শতাংশে আনতে হবে। এসব সরকার বোঝে কিন্তু, সরকারকে এতো মানুষকে খুশি করতে হয়- আর এটি কেউ দাবিও করে না। আমাদের সরকার-অনুগত উপাচার্যরা, শিক্ষক বা শিক্ষক সমিতি জীবনেও এমন দাবি করবে না। সরকার মাঝে-মধ্যে আনন্দের সঙ্গে বড়-বড় কথা বলে কিন্তু, বাজেটে কোনো পয়সা দেয় না। বাজেট যদি না বাড়ানো যায় তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাটি নষ্ট হয়ে যাবে।”

“এছাড়াও রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া, তাদের প্রশিক্ষিত করার ব্যবস্থা, অ্যাক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি, ক্লাব সিস্টেম, মেনটর সিস্টেম তৈরি করা। পৃথিবীর সব দেশে এগুলো প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নোটবই, গাইডবই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। এগুলো করতে একটি মহাযুদ্ধের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে বিভিন্ন পদে মেধার সঙ্কট দেখা দিবে। শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করতে পারলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ায় মানসম্পন্ন ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চলে আসবে।”

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।