ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম সংস্কৃতি কি আদৌ বন্ধ হবে?


ঢাবি টাইমস
Published: 2019-07-01 21:50:05 BdST | Updated: 2019-07-16 18:16:09 BdST

রহমত আলী দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। পেশায় তিনি কৃষক। তার ছেলে এখানে নতুন ভর্তি হয়েছে কিছুদিন আগে। ছেলেটা কি অবস্থায় আছে দেখতে হুট করেই চলে এসেছেন।
.
এখানে এসে তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। একটা মিছিল আসছে কোত্থেকে যেন। মিছিলে ছেলেরা হাত মুড়িয়ে মুড়িয়ে স্লোগান দিয়ে আনন্দ মিছিল করছে। কিসের আনন্দ মিছিল তা অবশ্য বুঝতে পারেননি রহমত আলী। মিছিলের মাঝখানে তার মনে হলো, নিজের ছেলেকে দেখতে পেলেন। চোখের ভুল হবে হয়ত। তার ছেলে রাজনৈতিক মিছিলে যাবে কেন, তাছাড়া এই সময়ে ছেলের ক্লাস থাকে। হয়ত ভুলই দেখেছেন।
.
তিনি হলে গেলেন। একটা রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বাজান কইতে পারো হৃদয় কই থাকে? উত্তর আসলো, চাচা হৃদয় কোন হৃদয়? দুইটা হৃদয় আছে। হৃদয় ভাই চারতলায় চারশো বিশ নাম্বার রুমে থাকে একলা। আপনি কি তার কাছে আইসেন? রহমত আলী দ্রুত জানালেন, না না, এই বছর নতুন ভর্তি হইসে।
.
ও আচ্ছা নতুন? তাইলে গণরুমে দেখেন চাচা। বলেই রহমত আলীকে গণরুমের ঠিকানা দেখিয়ে দিলো যুবক।
.
রহমত আলী গণরুমে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার মনে হলো, তিনি কোনো শরণার্থী শিবিরে চলে এসেছেন। একাত্তরে যুদ্ধের সময়ে ভারতে গিয়েছিলেন। রহমত আলী ভাবলেন, এখানে কি কোনো যুদ্ধ চলছে নাকি? এরকম জায়গায় মানুষ কিভাবে থাকছে? রুমের ভেতরে দেখতে পেলেন, তিনচারজন ছেলে একজন আরেকজনের গায়ের উপর শুয়ে আছে। আরো অনেকগুলো বালিশ, ট্রাংক দেখে বুঝতে পারলেন এখানে অনেকে মিলে একসাথে থাকে।
.
গণরুমের সামনে দাঁড়িয়ে রহমত আলী নিজের পরিচয় দিলেন। ছেলেগুলো তাকে বসতে দিলো এক কোনে। কিছুক্ষণ পরেই রহমত আলী টের পেলেন, পাছায় কিসের যেন কামড়। রহমত আলী জিজ্ঞেস করলেন, বাজান কামড়ায় কিসে? একটা ছেলে বললো, চাচা ছারপোহা কামড়ায়। সমস্যা নাই, রক্ত খাওন শেষ হইলে ছাইড়া দিবো৷ রহমত আলী করুণ মুখে জিজ্ঞেস করলেন, বাজান তোমাগোরে কামড়ায় না? থাকো ক্যামনে?
.
শুভ্র দেহী একটা ছেলে লুঙি ঠিক করতে করতে বললো, শুধু ছারপোহায় রক্ত চুষে না চাচা, এখানে রক্তের ভাগিদার অনেক।
.
দুপুরের পর হৃদয় ক্লান্ত জীর্ণ শীর্ণ হয়ে ফিরলো হলে। রহমত আলীকে দেখেই সে চমকে উঠলো, বাবা আপনে কখন আইলেন?
রহমত আলীর ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেকেই তিনি এত স্বপ্ন দেখে ভার্সিটিতে পাঠিয়েছিলেন? শরীর কি শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি৷
বাজান তুমি ভাল আছোনি? তোমারে দেখতে আইলাম। কই আসিলা? কেলাসে?
.
না আব্বা। একটু বড় ভাইয়ের সাথে গেছিলাম। যেই ভাই হলে উঠাইসে উনার লগে।
.
তুমি কি ইয়ানোই ঘুমাও?
না আব্বা, আমি তো বারিন্দায় ঘুমাই। রুমে জায়গা হয় না।
.
রহমত আলী পারলে প্রায় কেঁদেই ফেলতেন। তার গোয়ালঘরের কথা মনে পড়লো তখন। হৃদয় সহসাই বললো, আব্বা চলেন খাইতে যাই৷
.
ক্যান্টিনে এসেই রহমত আলী সেই ভুলটা করলেন, যেই ভুল আরো অনেকেই করে নতুন এলে। ডালের বাটিতে হাত ধুয়ে পানি ফেলতে নিলেন। হৃদয় কোনোরকম আটকালো, বাবা এইটা ডাইল, আমরা খাই।
.
রহমত আলীর বিস্ময় যেন কাটে না৷ তরকারির মধ্যে মাংসের যে পিসটা পেলেন, সেটা হাত দিয়ে ধরাও যায় না ঠিকমতো। তিনি ছেলেকে বললেন, বাজান তুমি এই খাওন প্রত্যেকদিন খাও?
.
হৃদয় বললো, হ্যা আব্বা। রান্না খারাপ না। আমার সমস্যা হয় না। রহমত আলীর সেদিন গ্যাস্ট্রিকের ব্যাথা উঠলো। ভেবেছিলেন বিকালের দিকে গ্রানে ফিরবেন। কিন্তু যেতে পারলেন না।
.
হৃদয় খুব অস্থির হয়ে গেল। এই রাতে বাবাকে কোথায় রাখবে সে? বাবার সামনে যতটা স্বাভাবিক থাকা যায়, তার চেয়ে একশ গুণ বেশি সে শান্ত থেকেছে। ভেতরের উথাল পাথাল অনুভূতিগুলো লুকিয়েছে প্রাণপণে। খেতে বসে মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে তার কান্না চলে আসে। আজ বাবাকে দেখে আরো বেশি গ্রামের কথা মনে পড়েছে। কিন্তু, নিজেকে খুব আগলে রেখেছে সে, ঢেউ ভেঙ্গে কান্না আসুক, চায়নি ছেলেটা।
.
সে গণরুমের একটা কোনে বাবাকে রেখেছে কোনোভাবে। নিজের বালিশটা এনে দিয়েছে বাবাকে। বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে বলে শুয়ে আছেন তিনি। নিজের কষ্ট লুকানো যায়, কিন্তু ছেলে হয়ে বাবা এভাবে কষ্ট করবে এই দুঃখ মানতে খারাপ লাগছিলো তার৷ বাবা আজন্মই কষ্ট করে গেলেন। কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে এই পর্যন্ত এসেছে, তা ওই বাবার একটু সাপোর্টের কারণে। সে স্বপ্ন দেখে বাবার সব দুঃখ লাঘব করবে একদিন। অথচ, আজ সে বড়ই অক্ষম। কিছুই করার নেই তার।
.
রহমত আলীর আবছা তন্দ্রা এসেছিল। ঘুম ভেঙ্গেই খুঁজলেন ছেলেকে। একজন বললো, চাচা আপনি রেস্ট করেন। হৃদয় গেস্টরুমে গেছে। রহমত আলী জিজ্ঞেস করলেন, গেস্টরুম কোনদিকে?
.
গেস্টরুমের সামনে এসেই গালিগুলো কানে আসলো তার। মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে খেয়াল করলেন, আর কাউকে নয় তার ছেলেকেই গালিগুলো শুনতে হচ্ছে। কেউ একজন বলছে, আজকে দেখলাম ঢেং ডেং কইরা দুপুরে ক্যান্টিন থেকে হলে ঢুকলি। বড় ভাইদের নজরে পড়ে না? আদব কায়দা বাপ মায় শিখায় নাই? কুত্তার বাচ্চা...
.
রহমত আলী দাঁড়ালেন না সেখানে। তার বড় ভয় করে। অজানা ভয়। তার মেরুদণ্ড নেই। প্রতিবাদ করতে পারেন না তিনি। সেখানে কিছু বলতে যাননি, যদি ছেলের সমস্যা হয় এই ভেবে। অক্ষম পিতার ক্রোধ বুকে নিয়ে গণরুমের কোনে ঝিম মেরে শুয়ে থাকলেন। ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লেন।
.
মাঝরাতে শোঁ শোঁ শব্দে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গলো। বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। পৃথিবী ডুবিয়ে দেবে এমন বৃষ্টি। তিনি ছটফটিয়ে রুম থেকে বাইরে গেলেন। বারান্দায় তার ছেলে ঘুমায়৷ এই বৃষ্টিতে সে যাবে কোথায়?
.
বাইরে এসে বারান্দা লাগোয়া দেয়ালের এখানে দেখতে পেলেন হৃদয়কে৷ বৃষ্টিতে ভিজে জবুথবু হয়ে আছে সে। রহমত আলীকে দেখেই হৃদয় বললো, আব্বা আপনি রুমে যান, বৃষ্টিতে ভিইজেন না। রহমত আলী ছেলের সামনে গিয়ে টের পেলেন, হৃদয় আসলে ঠান্ডায় কাঁপছে। প্রচন্ড কাঁপছে। তিনি ছেলেকে টেনে নিয়ে সিড়ির উপর গিয়ে বসলেন। হৃদয় সারারাত কোনো কথা বললো না। রহমত আলীও যেন নির্বাক হয়ে গেছেন। বৃষ্টির শব্দ একটানা শুনতে শুনতে তার নিজেকেই অভিশপ্ত মনে হলো৷
.
শেষরাতে হৃদয়ের জ্বর আসলো উথাল পাথাল। জ্বরের ঘোরে সে বলছে, ভাই আসসালামুয়ালাইকুম, ভাই আসসালামুয়ালাইকুম...রহমত আলী হৃদয়কে ধরে রাখতে পারছেন না। ছেলে যেন তার নিজের শরীরে নেই। তার থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। রহমত আলী চোখ বেয়ে জলের স্রোত নামছে। তিনি একঘেয়ে সুরে বারবার বলে যাচ্ছেন, বাজান রে, কিচ্ছু হয় নাই৷ তুই একটু চোখটা মেল বাজান, ও বাজান, চোখটা একটু মেল....

লেখকঃ দি সাইফ, ঢাবি ছাত্র

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।