আসুন একটু কম জাজমেন্টাল হই


শারমীন বানু আনাম, আটলান্টা, (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে
Published: 2020-03-21 22:19:21 BdST | Updated: 2020-03-29 21:01:28 BdST

মানুষদের জাজ করার আগে নিজেদের জিজ্ঞেস করুন, আপনি কাউকে অন্যায় করতে প্ররোচিত করেছেন কি না?

আমাদের মনে এত অস্থিরতা! কোনটা ছেড়ে কোনটা নিয়ে ভাবব?

একটি মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে—মেয়েটা খুন হয়েছে না শারীরিক সম্পর্ক করে বন্ধু অস্বীকার করায় আত্মহত্যা করেছে জানি না! হয়তো জানা যাবেও না!

আচ্ছা, আত্মহত্যার আগে মানুষের মনে কী কী ঝড় বয়ে যায়? কেউ জানেন?

আচ্ছা, যদি ধরি শারীরিক সম্পর্কের জেরে, অপমানে, অসম্মানে আত্মহত্যা করেছেন! কিন্তু কেন?

সমাজ! সমাজে ট্যাবু, শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না! সে করেছে! বয়ফ্রেন্ড তাকে অসম্মান করেছে, ...বলে গালি দিয়েছে, ভিডিও তুলে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে, প্রেগন্যান্ট করে অস্বীকার করেছে, বিয়ে করতে অস্বীকার করেছে, মেরেছে, জানের ভয় দেখিয়েছে, মেয়েটার বা তার মা–বাবাকে অসম্মান করার ভয় দেখিয়েছে! হয়তো বলেছে—‘মর’! আত্মহত্যা করার প্ররোচনা দিয়েছে! মেয়েটা না চাইতেও জোর করে সম্পর্ক করেছে। হ্যাঁ রেপ, হয়তো রেপই করেছে ভালোবাসার অভিনয় করে! অথবা সত্যিই সুন্দর সুন্দর কথা বলে, ভালোবাসার নিপুণ অভিনয়ে ছাদে নিয়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে! প্রতিটি কাজই জঘন্য অন্যায়! কিন্তু সে বুক ফুলিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে হেঁটে বেড়াবে!

মেয়েটা হয়তো বুঝতে পারেনি! যখন বুঝতে পেরেছে, ভেবেছে যাওয়ার জায়গা নেই! মুখ দেখানোর জো নেই! পরিবারের মুখে চুনকালি মেখেছে! মা–বাবা খুন করে ফেলবেন জানলে! বন্ধুবান্ধব মুখে আলকাতরা লেপে দেবে; সঙ্গে আত্মীয়স্বজন! আর যে ভালোবাসার আশ্রয়, সে তো বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল দিয়ে সব অস্বীকার করে বাজপাখির মতো উড়াল দিচ্ছে! কার কাছে একটু সাপোর্টের আশা করবে? নিজের মন তো মরেই গেছে! শরীর-মন-ভাবনা—সব ধূসর! নাহ্, কোনো আশা আর নেই!

মা–বাবা ভাবছেন, ‘এত আদর করে বড় করলাম, মুখে চুনকালি মাখানোর জন্য? এত বড় অন্যায় করল মেয়েটা! মুখ দেখানো যাবে কোথাও? সবাই থু থু ফেলবে মুখে! মরণ হলো না কেন আমাদের! এই দেখার জন্য বেঁচে আছি? মরলেও বাঁচতাম! বিষ খাওয়ায়ে তোরে আমরাই মারব! ওর সঙ্গে কেমনে গেলি?...আগে মনে ছিল না? যা তোর নাগরের সাথেই যা!’

বন্ধুবান্ধব দাঁড়াইয়া তামাশা নেবে! ‘ওই নষ্ট, ওই পোলারে পটাইছে! আর না পটাইলে গেলি কেন ওই পোলার লগে? মাইনষের অভাব! পোলাডা যে সুবিধার না, হেইডা আমরা জানি! তাতে কী? তুই খারাপ! আমরা হের ভিডিও দেখতাছি! আর ভিডিও না থাকলেই বা কী, কল্পনা করতে সমস্যা কী? বাপ–মার মুখ চুনকালি লাগাইছস! তোর মুখ দেখাও পাপ! মিশতাম না তোর সাথে! যদিও আমগো সবার বফ-গফ আছে, আমরাও দরজা বন্ধ করে আদিম নেশায় মেতে উঠি, তাতে কিছু না!’

আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, দেখলেই কানাকানি, হাসাহাসি! ‘কোনো শরম নেই! আমরা হইলে কুয়ায় ঝাঁপ দিতাম! বিষ খাইয়া মরতাম! পোলাপানডিরে সাবধানে রাইখো, যাতে ওর ধারে কাছে কেউ না যায়।’

মেয়েটা কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? সব তো শূন্য? আমরা সবাই সব শূন্য করে দিচ্ছি এর জন্য! সব দরজা বন্ধ করে মরতে প্ররোচিত করছি!

কী অসহায়, অপরিণত বয়সের একটা মেয়ে, আমরা তার বাঁচার অবলম্বন হওয়া তো দূর, মরতে প্ররোচিত করছি! ওর অবস্থানে যে কেউ সবচেয়ে সোজা আর সবচেয়ে অকরুণ এই পথই বেছে নিতাম! কেউ কি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘তুমি ভালো আছ?’

বুকে হাত রেখে বলুন, কেউ তাকে বলতাম, ‘যা হয়েছে, হয়ে গেছে! সেটা নিয়ে না ভেবে, কীভাবে ভালো থাকবে, সেটা ভাব। সম্পর্ক শেষ মানে, সবকিছু শেষ নয়! কেউ তোমার অসম্মান করল বলে, তোমার সম্মান শেষ নয়! তুমি কারও সঙ্গে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় চুমু খেয়েছ, তাতে তুমি খারাপ হয়ে যাও না! আমরা আছি তোমার পাশে!’

বলতে কি পারি না? মেয়েটাকে, মেয়েগুলোকে বাঁচাতে পারি না? এই মেয়েটিই হতে পারত অনেক কিছু! আমরা তার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছি! আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছি!

অথচ এই আমরাই, কিছু ছবি প্রকাশের কারণে এক অভিনেত্রীকে ‘বকা’ দিয়েছি! আমি তো ওর তারিফ করি! কতখানি ম্যাচুরিটি নিয়ে সে বলেছে, আমার সম্মান রাখতে না পারার দায় আমার! সম্পর্ককে অস্বীকার করেননি! একটা বিষবাষ্প মুখ থেকে বের করেননি! সেই ব্যক্তি সম্পর্কে, যে তাঁর ভালোবাসার অসম্মান করেছে, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবিগুলো সবার সামনে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে খেলো করেছে! কার দোষ, তাতে আমাদের কী যায় আসে! সম্পর্ক তাঁদের, সম্মান জানানো দুজনেরই কর্তব্য, দায়িত্বটা দুজনেরই! ওই অভিনেত্রী সম্মান রেখেছেন! সম্পর্ক ভাঙার কারণ খুঁজে আমাদের কী দরকার! আসুন আমরা পারসোনাল স্পেসের সম্মান করতে শিখি! উত্তম মানব হই!

যে দেশে কোনো মেয়ে কাউকে চিঠি লেখে, দেখা–সাক্ষাৎ নেই, তা শুনেই মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যায়! বিয়ে না করলে, অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ভাইরাল হয়, মেয়েদের জীবন বিষিয়ে তুলতে! কোন বাপের বেটাই সে অচ্ছুত মেয়ের হাত ধরতে, বিয়ে করতে রাজি নয়, অথবা ধরে রাখার মতো শক্ত কাঁধ নেই তাদের! তাদের জন্য এ যেন নতুন স্বপ্ন দেখার সূত্রপাত! সরি...তবু তুমি সাহসী মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকো! সরি...তোমাকে বউ করে ঘরে তোলেনি! বেশির ভাগই পারে না! অনেকে পেরেছে! সুন্দর মনের মানুষ বলে নিজেকে প্রমাণ করেছে!

বেঁচে থাকুক বাকি সবাই। আমরা ওদের বাঁচতে দিই! আসুন না আমরা একটু কম জাজ করি! কেউ আপনার মতো নয় বলে, সে খারাপ নয়! সে তার মতো। তাদের তাদের মতোই বাঁচতে দিই।

শারমীন বানু আনাম, আটলান্টা, (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে