প্রায়শ্চিত্ত করতে ঢাবি ক্যাম্পাসে ২০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন বাবুল


ঢাবি টাইমস
Published: 2020-06-29 14:32:16 BdST | Updated: 2020-08-09 06:17:42 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী এসএম হলের প্রভোস্ট, তাঁর দপ্তরে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। সামনে সকল হাউজ টিউটররা আষাঢ়ের কালো মেঘের মত মুখ কালো করে আছেন। হলের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দন্ডায়মান। প্রভোস্ট ভেবে পাচ্ছেন না, তার এতো বড় সর্বনাশ কে করল ? তিনি অসহায়ের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার আ.জ. শিকদারকে ফোন করলেন। অত্যন্ত সৎ ও হিসাবী রেজিস্টার প্রভোস্টের সব কথা শুনে বললেন, আমার করার কিছু নেই। আপনার ৫৫১২৬ টাকার টেলিফোন বিলের দায়িত্ব কতৃপক্ষ বহন করবেনা।

আজ দুপুরেই টিএন্ডটির লোকজন বিল দিয়ে গেছে। বিল দেখে হলের একাউন্টস সেকশনের চক্ষু চড়কগাছ। সঙ্গে সঙ্গে প্রভোস্টকে ফোন করে জানানো হয়েছে। প্রভোস্ট ক্লাস বাতিল করে দ্রুত হলে এসেছেন। সকল হাউজ টিউটরকে ডেকেছেন। এখন কি করা যায়?

বিল প্রভোস্টকেই পে করতে হবে। এছাড়া কোন উপায় নেই। কিন্তু সকলে মিলে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হল, খুব গোপনে, সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কে চুরি করে ফোন করে? বিশেষ করে পোল থেকে ফোনের তার যে পথে প্রভেস্টের রুমে গেছে, তা ২৪ ঘন্টার নজরদারিতে রাখতে হবে।

প্রভোস্টের মন ভীষণ খারাপ। ফোন বিলের এই ৫৫১২৬ টাকা তিনি কিভাবে ম্যানেজ করবেন?

একই দিনের ঘটনা। রাত প্রায় ১০টা বাজে। এস এম হলের পশ্চিম কোনায় ১৫৭ নাম্বার রুম থেকে বগলে শীতল পাটি, একটা বালিশ নিয়ে বের হচ্ছে দর্শন বিভাগের ২য় বর্ষের আবাসিক ছাত্র বাবুল। ব্রাম্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান বাবুল ডিপার্টমেন্টে পড়ুয়া ছাত্র হিসাবে পরিচিত। সারাদিন দার্শনিক চিন্তা চেতনা তার মাথায় গিজ গিজ করে। ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা তার নাম দিয়েছে ''দেকার্ত''। ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত, রুমের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে, ন্যাংটা হয়ে বসে ধ্যান করতেন, আর যুগান্তকারী দার্শনিক মতবাদ দিয়ে গেছেন বিশ্ববাসীকে।

বাবুল সিঁড়ি ভেঙে হলের ছাদে গিয়ে উঠলো। শীতল পাটি বিছিয়ে, বালিশে আরাম করে শুয়ে পড়ল। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে তারা গুনছেন না , পূর্ণিমার চাদ দেখছেনা। তার চোখে শুধু ডলার আর পাউন্ড ভেসে বেড়ায়। দীর্ঘদিন যাবৎ আয়ারল্যান্ডে সে যোগাযোগ রেখে আসছে। একটা বড় ধরণের বিজনেস ডিল করতে যাচ্ছে সে। বাঞ্ছারামপুরের সরাইল উপজেলায় এক বিশেষ ধরণের কুকুরের জন্ম হয়। দুনিয়া জোড়া এর খ্যাতি। বিশেষ করে ইন্টারপোলে ট্রেনিং প্রাপ্ত শিকারী কুকুর হিসাবে এই প্রজাতির কুকুর খুবই দামি। সব চেয়ে দুর্ধর্ষ এই কুকুর আয়ারল্যান্ডে পাঠাবে বাবুল। এই নিয়েই তার মিশন চলছে গত এক মাস যাবৎ।

এদিক ওদিক তাকিয়ে বাবুল টাওয়েলে মোড়া ছোট ফোন সেটটি খুললো। প্রভোস্টের রুমে যাওয়া টেলিফোন তারে দ্রুত কানেকশন করে ফেলল। স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে ২০০ টাকায় কেনা এই টেলিফোন সেটটিই তার ব্যবসার একমাত্র পুঁজি। বাকিটা তার মেধা। তার চোখে ভাসে শুধু সরাইলের কুকুর আর ডলার পাউন্ড।

চোখ বুজে আপন মনে কথা বলে যাচ্ছে বাবুল। সুদূর আয়ারল্যান্ডে। প্রতিদিন দেড় দুঘন্টা সে ফোনে কথা বলে।

হল কর্মচারীদের চোখ আজ সে ফাঁকি দিতে পারেনি। টেলিফোনে সংযোগ লাগার সঙ্গে সঙ্গে এক কর্মচারী দ্রুত প্রভোস্টের কোয়ার্টারে গিয়ে প্রভোস্টকে খবর দিল। প্রভোস্ট দ্রুত রমনা থানায় ফোন করলেন, ভিসিকে ফোন করলেন। ক্যাম্পাসে পুলিশ প্রবেশে ভিসির পারমিশন লাগে।

চোখবুজে আমুদে কথা বলে যাচ্ছে বাবুল ফোনে। এই দুনিয়ায় যেন আর সে নেই। সে আছে আয়ারল্যান্ডে। কিন্তু তার বাস্তব দুনিয়ার চারিদিকে কিছু অবাক দৃশ্য তাকিয়ে আছে তার দিকে। হলের প্রভোস্ট, হাউজ টিউটরগণ, পুলিশ ঘিরে রেখেছে বাবুলকে। বাবুল জানেনা সে খবর।

বাবুল কে গ্রেফতার করা হল। পুরো হলের ছাত্ররা হলগেটে জমায়েত হয়ে এ দৃশ্য দেখছে। পুলিশ রিস্ক নিতে চাচ্ছেনা। দ্রুত তারা হল ত্যাগ করতেছে। একজন কনস্টেবল বাবুলের হাফসার্টের কলার ধরে বাবুলকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশের ভ্যানের দিকে। হলগেট থেকে পুলিশের ভ্যান প্রায় ১০০ গজ দূরে। কিন্তু এই দুরত্বের মাঝেই দেকার্ত বাবুল অঘটন ঘটিয়ে ফেলল। পুলিশ কনস্টেবল বাবুলের শার্টের কলার ধরে এগুচ্ছিল, আর বাবুল সতর্কতার সাথে গোপনে পটাপট শার্টের বোতাম খুলে দে দৌড়। হটাৎ পুলিশ কনস্টেবল আবিষ্কার করল, তার হাতে একটা হাফ শার্ট বাতাসে পত পত করে উড়ছে, কিন্তু শার্টের মানুষটি নেই।

সাড়া পুলিশ ডিপার্টমেন্টে হুলুস্থল পরে গেল। সন্ত্রাসী নয়, রাজনীতি করেনা এমন একটা ছেলে এতগুলো পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। পুরো পুলিশ টিমের চাকুরী যায় যায় অবস্থা।

পরেরদিন খুব সকালে আমার হলরুমে এক ভদ্রলোক দেখা করতে আসলেন। পরিচয় দিলেন, আমি বাবুলের বড় ভাই, তেজগাঁও থানার এ এস আই। আমি বাবুলের মুখে এই ভাইয়ের কথা অনেক শুনেছি। খুবই ভাল মানুষ একজন। ১০০ ভাগ সৎ একজন পুলিশ। উনি শুধু বললেন, ''ছোট ভাই, বাবুল কোথায় থাকতে পারে তা তোমার জানা। ওকে দ্রুত ধরা দিতে বল। নাহলে নিরীহ কিছু পুলিশের চাকুরী চলে যাবে। বাবুলের ভাই আরো বললেন, আমি মুহসিন হলে গিয়ে সাঈদের সঙ্গেও দেখা করেছি। সে বলল, তুমি নাকি জানতে পার, সে কোথায় যেতে পারে ?''

আমি ভেবে পাইনা, শার্ট ছাড়া বাবুল কোথায় যেতে পারে? হটাৎ করে মনে হল, সে বেশি দূরে যেতে পারেনা। এস এম হলের উল্টা পাশেই বুয়েটের যে কোন হলেই সে গিয়েছে। ঘন্টা খানেক খোঁজাখুঁজির পরে বাবুলকে অবশেষে পাওয়া গেল। আমার ধারণাই সঠিক, সে বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলে ছিল। বাবুলের বড়ভাই নিজেই বাবুলকে নিয়ে শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে গেলেন। পুলিশের উর্ধতন কতৃপক্ষ সবাই বাবুলের বড়ভাইকে জানতেন। সৎ ও অসম্ভব একজন ভাল মানুষ। তার জিম্মায় বাবুলকে ছেড়ে দেয়া হল, কিন্তু শর্ত দেয়া হল, প্রভোস্টের সাথে যেন বিষয়টি মিনিমাইজ করা হয়।

বাবুলের বড় ভাই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে হলের ফোন বিল পরিশোধ করেছিল। কিন্তু বাবুলের মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য না করলেও সে একটা বিরাট কান্ড করে ফেলেছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বের হয়ে যাওয়ার ৩ বছর পর বাবুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ২০ হাজার গাছ লাগিয়েছিল। ন্যাচার নামে এক এনজিওর সাথে যোগাযোগ করে সে ২০ হাজার গাছ ক্যাম্পাসে লাগায়। বিশেষ করে রেজিস্টার বিল্ডিঙের সামনে ''মল'' এলাকায় যে গাছগুলো এখন দেখা যায়, এর বেশির ভাগই বাবুলের লাগানো গাছ।

বাবুল পড়াশোনা শেষে অনেক সংগ্রাম করে সেই আয়ারল্যান্ডে প্রথম যায় । উচ্চতর শিক্ষার জন্যে। এর পরে লন্ডন। এখন সে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে। একটা ''ল'' ফার্ম ও আছে। রিয়েল স্টেটের ব্যাবসাও করে। মাঝে মাঝে তার ফোন পাই। প্রায় আমি পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কাহিনী প্রসঙ্গ তুলি। সে হাসে আর বলে ''প্রায়শ্চিত্ত'' করেছি দোস্ত। ২০ হাজার গাছ লাগিয়ে দিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

  • ২০ হাজার গাছ লাগানো শেষে ভিসি এমাজউদ্দীন স্যার গর্ব করে বলেছিলেন , হে বাপু, হে তরুণ, তোমার মত যদি আমার সব ছাত্র হত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হত সোনায় সোহাগা। আমিও ছিলাম ওই সময় ভিসি স্যারের সামনে। আমি বিড়বিড় করে শুধু বলেছি, বাবুলের মত যদি হলের সব ছাত্র হত, তাহলে হলের প্রভোস্টরা দপাদপ হার্ট এটাক করে মরতো।

লেখক: লুৎফর রহমান, প্রাক্তন ছাত্র, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, বাবুলের সহপাঠি