করোনা-উত্তর রাজনীতি


Dhaka
Published: 2020-07-11 13:46:26 BdST | Updated: 2020-08-09 05:58:33 BdST

করোনা মহামারি বিশ্বব্যাপী অনেক ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও অনেক কিছু পাল্টে যাবে। আমাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রভাব সুস্পষ্ট হচ্ছে এবং হবে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, রাজনীতিতে বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই করোনার প্রভাব কী হবে? প্রথমেই আমি বলি বিশ্বের যতগুলো বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন, যেগুলোকে আমরা মানব ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট বলতে পারি- সেগুলোর কোনোটাই করোনার মতো মহামারির বিপর্যয় দ্বারা সৃষ্টি হয়নি। বরং সেগুলো হয়েছে বিপ্লবের দ্বারা। যেমন ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯), রুশ বিপ্লব (১৯১৭-১৯২৩) প্রভৃতি। বিপ্লবের সাথে মহামারি-বিপর্যয়ের যেটা বড় পার্থক্য সেটা হচ্ছে- মহামারি প্রাকৃতিক বা মনুষ্যসৃষ্ট যা হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয়। আর বিপ্লব যখন আসে তখন বিপ্লবের একটা পটভূমি তৈরি হয় দীর্ঘদিন যাবৎ।

বিপ্লবের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয় সংশ্লিষ্ট থাকে সেটা হচ্ছে, একটি দার্শনিক চিন্তা। এই তাত্ত্বিক ভাবনা এবং তার সঙ্গে ভাবাদর্শগত কতগুলো লেখালেখি, অনুশীলন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে একটা সমাজ অথবা একটা জনগোষ্ঠী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয় এবং সেই বিপ্লবের দিকে মানুষ তখন ধাবিত হয় একটা পরিবর্তনের জন্য, যেটা আমরা ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্রে দেখি। ফরাসি বিপ্লব হঠাৎ করে একদিনে হয়নি। অন্তত কয়েক দশক যাবৎ এর পটভূমি তৈরি হয় শিল্পে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে এবং শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্র উৎখাতের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সাম্য, মৈত্রী- এই প্রত্যয়গুলোর অবস্থান পোক্ত হওয়ার জন্য একটা সামাজিক রূপান্তর সাধিত হয়। একইভাবে বিশ দশকের শুরুর দিকে যখন রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয় তখনও এর আগে কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩), ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের (১৮২০-১৮৯৫) ভাবনারাশি তার জন্য একটা পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিপরীতে গিয়ে সাম্যবাদী অথবা যেটাকে আমরা সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা বলি তার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। সেটির দার্শনিক একটা দৃষ্টিভঙ্গির রেজাল্টই হচ্ছে বলশেভিক বিপ্লব।

বিজ্ঞাপন


তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) অভিঘাতে রাজনীতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে। উপনিবেশগুলো ছেড়ে দেয়া থেকে আরম্ভ করে ঔপনিবেশিক চিন্তা-চেতনার মধ্যে একটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। কলোনিয়াল যে পাওয়ারগুলো ছিল তারা একপর্যায়ে আস্তে আস্তে পিছু হটে এবং কোথাও কোথাও রাজনৈতিক পরিবর্তনও সূচিত হয়। আর শিল্প-বিপ্লবের (১৭৬০-১৮৪০) প্রভাবে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে শুরু করে এশিয়ার জীবন পাল্টে যায়। শিল্প-বিপ্লব আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে যখন একটা বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এলো তখন স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন ও উৎপাদন সংশ্লিষ্ট মালিকানা এবং শ্রমের প্রসঙ্গ সামনে আসে। আর এই বিষয়গুলোর মধ্যে যে ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় তার প্রতিক্রিয়া কিন্তু আমরা দেখতে পাই রাজনীতিতে। কারণ শিল্প- বিপ্লবের পরে এক পর্যায়ে যখন শহরে দ্রুত শিল্পায়ন হতে লাগলো, নগরে নগরে যখন বেশি মানুষের সমাগম হলো এবং যখন তাদের আবাসন, স্যানিটেশন- এই সংকটগুলো দেখা দিল- তখন নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম- যেটাকে আমরা বলি ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া অথবা শ্রমিকদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পেল।

লেখাবাহুল্য, প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ যাকে আমরা বলছি করোনা মহামারি- এটা আসলে ওই ধরনের পটভূমি নিয়ে আসেনি। হ্যাঁ একটা পটভূমি হয়তো এখন আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছে, ধরা পড়ছে। সেটা হচ্ছে আমাদের শক্তি সামর্থ্য- যেগুলোকে আমরা বহির্বিশ্বে বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষমতার স্তম্ভ মনে করি।

বিজ্ঞাপন

 

২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আমরা দেখলাম সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি, এগুলো দিয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা করা যায় না। কারণ মারণব্যাধি মোকাবিলা করার জন্য একটা সামাজিক শক্তি অথবা সামাজিক কাঠামোর মধ্যে যদি একটা ভারসাম্য থাকে তাহলে সেটাই অনেক বেশি কার্যকর হয়। গত ছয় মাসে সাবমেরিন অথবা অ্যাটমিক রি-অ্যাক্টর কিংবা যাবতীয় ভয়ঙ্কর বোমাগুলোর চেয়ে বেশি প্রয়োজন বা কার্যকর দেখা গেছে আমাদের সামাজিক জীবনের যোগাযোগ, মানবিক হওয়ার প্রচেষ্টা। যেসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা স্ট্রাকচারটা গণমুখী অথবা মানুষের কল্যাণে যেখানে সরকার ও অর্থনীতি চালিত, সেসব দেশে বরং করোনা মোকাবিলায় বেশি সার্থক হতে দেখা গেছে। সে জন্য আমি বলবো, আমাদের অর্থনীতির যে ভঙ্গুরতা বা স্বাস্থ্যখাতের যে অদক্ষতা, অনিয়ম, দুর্নীতি এগুলো কিছু কিছু পরিবর্তন হয়তো আমরা দেখবো। কিন্তু করোনা-উত্তর মানুষ একেবারে বদলে যাবে, মানুষের যে রাজনৈতিক চরিত্র বা নতুন রাজনীতির জন্য মানুষ কিছু পেয়ে যাবে- এটা আশা না করাই ভালো। অর্থাৎ মহামারিতে পাল্টে যাওয়া বাস্তবতা থেকে কোনো ধরনের শিক্ষা মানুষ গ্রহণ করবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি না।

তবে আন্তর্জাতিক যে সম্পর্কগুলো রয়েছে সেগুলোর মধ্যে হয়তো কিছু পরিবর্তন আসবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অথবা ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্যরা দেখেছে বিপদের সময় এ রকম সামরিক জোট অথবা অর্থনৈতিক জোট তেমন কোনো কাজে আসে না। ইউরোপ যখন করোনায় নাস্তানাবুদ হচ্ছিল বিশেষ করে ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড তখন ইউনিয়নের এক সদস্য রাষ্ট্র অপর সদস্যের নাগরিকদের তাদের বর্ডার অতিক্রম করতেও দেয়নি। অর্থাৎ কেউ কাউকে সাহায্যও করেনি। সাহায্যে এগিয়ে এসেছে অনেক দূরবর্তী দেশ কিউবা। কিউবা ইতালিতে মেডিকেল টিম পাঠিয়ে, স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে, তাদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ছিল।

বিজ্ঞাপন


অন্যদিকে আমরা যদি দেখি, এখন যে জিনিসটা বেশি আলোচিত হচ্ছে- চীন ও ভারতের অবনতিশীল সম্পর্ক অথবা কেউ কেউ বলছেন আমেরিকা এবং চীনের মধ্যে যে একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থা- এগুলো থেকে কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় কিনা? যখনই আমরা এ রকম একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা দেখি, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তি অথবা যারা বৃহৎ শক্তি হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত- এতে দেখা যায়, সেখানেও আসলে কোনো পলিটিক্যাল ডিবেট নেই। সেখানে একটা রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয় যদি প্রাধান্য পেত তাহলে হয়তো আমরা বলতে পারতাম বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে এবং সাথে সাথে আমাদের বাংলাদেশে বা পৃথিবীর সব দেশেই রাজনীতি বদলে যাবে। কিন্তু লক্ষ করা দরকার, আমরা যেটা বলছি- এই যে রাজনৈতিক মতাদর্শবিহীন পরিবর্তন বা বিশ্ব রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ এগুলো কেবল তারা নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অথবা অর্থনৈতিক দাপটকে আরও বেশি মানুষের সামনে উদ্ভাসিত করার চেষ্টায় নিয়োজিত। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও করেছে আর চীনও করছে।

চীন এখন সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে সেটা খুব ভালো হতো, পঞ্চাশ কিংবা ষাট দশকের মতো একটা মতাদর্শভিত্তিক যে রাজনীতির আন্তর্জাতিকীকরণ বা Internationalization of politics এর চর্চা ছিল তা যদি থাকত। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভ্লাদিমির লেলিন (১৮৭০-১৯২৪), মাও সেতুং (১৮৯৩-১৯৭৬) প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ কায়েম করার জন্য তাদের মতাদর্শ বিভিন্ন দেশে প্রচার করেন। আমাদের দেশেও চৈনিকপন্থী, রুশপন্থী সমাজতন্ত্রীরা ছিল। কিন্তু এখন চীন যে বিশ্ব মোড়ল হতে চায় বা একটা বিরাট শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়- এটা আসলে একেবারেই চীনাপুঁজির একটা সম্প্রসারণ কৌশল। এটা চীনের কোনো মতাদর্শ অর্থাৎ রাজনৈতিক আদর্শের প্রসারণ নয়। এমনকি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তারা বিভিন্ন দেশে যে মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল তাও এখন চীনের রাজনীতিতে অনুপস্থিত। আমি মনে করি চীন নিজেই এখন একটি পুঁজিবাদী আগ্রাসনের শক্তি হিসেবে অনেক দেশেই প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে। এটার সাথে যদি রাজনৈতিক মতাদর্শকে সাথে রাখত, তাহলে বলতে পারতাম দেশে দেশে রাজনীতির কিছু পরিবর্তন আসবে।

আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যে রাজনীতি, এ রাজনীতিতে বলা হয় অনেক দুর্বল দিক রয়েছে। এ রাজনীতির সাথে সৃষ্ট যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তার যে দুর্বলতা এগুলো এখন করোনার কারণে অনেক বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্ত সমস্যা হলো-করোনার পরে যদি এটার একটা পরিবর্তন আমরা পেতাম তাহলে খুব ভালো হতো। কিন্তু সেটা আমি আশা করছি না। যারা বৈষম্যের ব্যবস্থাটি তৈরি করছে, অন্যকে শোষণ-নিপীড়নের কৌশল অথবা নিজের ভালো থাকা; অন্যকে না দেখে বা অন্যের কী হলো তাতে যায় আসে না ভেবে- এই যে দৃষ্টিভঙ্গিটা এর মধ্যে যদি পরিবর্তন আসত তাহলে খুব মঙ্গল হতো। এসবের কোনো পরিবর্তন আসবে না এ কারণে যে, যারা একালে একটা বৈষম্যমূলক অবস্থা তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে তারাই হয়তো রাজনীতিতে টিকে থাকবে এবং তারাই আরেকটা নতুন সংস্করণ। যেমনভাবে গাড়ির মডেল চেঞ্জ হয়- যখন তেলের দাম খুব বেড়ে গেল, তখন বলা হলো হাইব্রিড গাড়ি এখন বাজারে ছাড়া হবে।

আমার ধারণা বর্তমানে প্রচলিত যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা করোনা-উত্তরকালে এটার একটা হাইব্রিড সংস্করণ হয়তো আমরা পাবো। আমূল কোনো পরিবর্তন রাজনীতিতে হবে না। কারণ করোনার সময়ও মানুষের যে অর্থলিপ্সা, মানুষের প্রতি যে অবহেলা, বিশেষ করে এই সংকটকালেও মানুষ যখন দুর্নীতিতে অথবা লুটপাটে ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না অর্থাৎ যার যেখানে সুযোগ আছে সেটা তারা লুটে নিচ্ছে তখন আশাবাদী হতে পারছি না। অতএব করোনা চলাকালে যেহেতু তাদের কোনো ভয় অথবা ভীতি যেটাকে বলা হয় প্রকৃতির-প্রতিশোধ যা তাদের উপর আসতে পারে, সেই ভয়ও যখন মানুষের মধ্যে আসেনি- করোনা চলে গেলেও মনে করি এটা একেবারে সাবেক অবস্থায় ফিরে আসবে না, কেবল আচরণের মডেলটা চেঞ্জ হবে। এখন যেসব সেক্টরে দুর্নীতি আছে সেটা হয়তো আরেকটু ডিজিটাল ফর্মে শুরু হবে।

এখন বলা হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে হাইব্রিড, অন্য দল থেকে আসা অথবা সুযোগ-সন্ধানী বা সব দল করা লোক আছে। ইদানীং দেখতে পাচ্ছি তাদের ব্যাপারে সোশ্যাল মিডিয়াতে অথবা গণমাধ্যমে খুব বেশি আলোচনা হয়। এ বিষয়ে আমি একটি কথা বলি তা হলো, হ্যাঁ যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, একজন যখন ধরা পড়ে তখন অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে এতদিন সে তার পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন দল করে এসেছে। ক্ষমতায় যখন যে রাজনৈতিক দল আসে সেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে বহাল তবিয়তে থেকেছে। অথবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সেলফি উঠিয়ে যে ক্ষমতার দাপুটে হয়ে ওঠে, যে অবস্থায় তারা চলাফেরা করে- এটা রাজনীতির একটা দিক মাত্র।

কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, রাজনীতিতে তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। যেমন ধরুন, ছাত্রজীবন থেকে অথবা আরও শৈশবকাল থেকে একই রাজনীতি করে আসছেন এবং যিনি কোনো হাইব্রিড নেতা নন, হয়তো দলের যে মতাদর্শ ছিল সেটা আজীবন মানুষের কাছে উপস্থাপন করে গেছেন, বলে গেছেন কিন্তু ক্ষমতায় যখন তাঁকে বসানো হয়েছে বা ক্ষমতা পেয়ে গেছেন তখন তিনি ওই হাইব্রিডদের মতোই আচরণ করছেন- এ রকম উদাহরণ অনেক আছে। একেবারেই নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মীকে ক্ষমতা দেয়ার পরে তিনি আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ার ঘটনাও আছে। অতএব দল থেকে কেবল হাইব্রিডদের বিতাড়িত করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না।

রাজনীতি থেকে দুর্নীতি অথবা যেগুলোকে আমরা বলি অপশাসনের কলাকৌশল তা যদি আপনি দূর করতে চান তাহলে আমি ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, একটা বিপ্লব দরকার, সেটা জরুরি। সেই বিপ্লবটা হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক। অর্থাৎ আমাদের মনোজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত আমাদের সমাজ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ও প্রকৃতি। এগুলোর যে সম্পর্ক, সেখানে যদি মানুষের মনোজগতে একটা পরিবর্তন না আনতে পারি- তাহলে সমাজ রূপান্তরের ফলাফল শূন্য। উপরন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে, শিক্ষাব্যবস্থায়, প্রশাসনের সবজায়গায়- ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ, সাম্যের যে কথা আমাদের সংবিধানে আছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সামাজিক সাম্যের কথা বলে গেছেন সেই জিনিসটাই আমাদের ধারণ ও লালন করতে হবে। বিভিন্ন আইনি কাঠামোর ভেতর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি আমরা সুদৃঢ় করতে পারি, সে রাজনৈতিক কর্মী হোক অথবা হঠাৎ করে আসা হাইব্রিড কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই হোক, কেউ-ই একটা পদ্ধতিকে ভেঙে অথবা তার বাইরে গিয়ে কোনো অপকর্ম করতে পারবে না।

আমরা যদি একটি সিস্টেম ডেভেলপ করতে পারি, সেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি আমরা স্বাধীনতা দিতে পারি অথবা স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তাদের কাজ করার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান আমরা তৈরি করতে পারি তাহলে পরিবর্তন সম্ভব। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যেগুলো, সেগুলো যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি তাহলে এই করোনার কারণে আমাদের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন অথবা রাজনীতিতে সুবাতাস বইবে এটা যারা আশা করছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।

আমার মনে হয় রাজনীতিতে হয়তো একটু মডেল চেঞ্জ হবে এবং সেই মডেলটা আবার যারা এখন রাজনৈতিক সুবিধাভোগ করছে সেই সুবিধাভোগী লোকগুলোই নিজের করায়ত্তে রেখে দেবে; সমাজে দাপট ফলানোর জন্য নতুন একটি মডেল হাজির করবে। এর বেশি কোনো পরিবর্তন রাজনীতিতে হবে বলে আমি মনে করি না।

লেখক : অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়