অনলাইন ক্লাস: হিমশিম অবস্থা শিক্ষার্থীদের


Dhaka
Published: 2020-09-15 00:09:16 BdST | Updated: 2020-10-25 22:29:28 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহমেদের বাড়ি বরিশালের এক প্রত্যন্ত গ্রামে।অনলাইন ক্লাস করার জন্য উপযোগী নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য তাকে দুই কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে তিনতলা একটি কলেজের ছাদে বসে ক্লাস করতে হয়।রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করেই তাকে জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে হচ্ছে।নিলু ঢাকায় অবস্থান করছে। তার ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী বাবা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় পরিবারের ভরনপোষণ নিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে,তার পক্ষে অনলাইন ক্লাস করার জন্য অর্থব্যয় স্বপ্নের মতো। এমন আহমেদ-নিলুর খোঁজ মিলবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই।

দেশ এখন চরম সংকটকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের তান্ডবে স্থবির হয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবন।শিক্ষা ও জীবন দু’টোই মানুষের জন্য জরুরি। এ দু’য়ের মধ্যে তুলনা করলে জীবনই প্রাধান্য পাবে।আর জীবন রক্ষার্থে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব রোধে এদেশের শিক্ষা-কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ১৭ই মার্চ থেকে।প্রতিনিয়ত এই মেয়াদ বেড়েই চলছে।বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থেমে আছে।ফলে শিক্ষাব্যবস্থার বাৎসরিক রুটিন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা মুশকিল হয়ে পরেছে।

ইতিমধ্যে কিছু কিছু স্কুল-কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস চালু হওয়ার পরপরই শিক্ষা মন্ত্রনালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক সংগঠন ইউজিসির নির্দেশনা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম শুরু হয়।এর মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন করে বৈষম্য ও বিভাজনের দেয়াল গড়ে উঠেছে। ক্ষেত্র প্রস্তুত কিনা তা বিবেচনায় না এনেই অনলাইন ক্লাসের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক বটে।মূলত তীব্র সেশনজট এর সম্ভাবনা এবং স্নাতক হওয়ার অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের কর্মজীবন নিয়ে দোদুল্যমান সমস্যা দূরীকরণে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যাতে করে শিক্ষার্থীরা একটু হলেও এগিয়ে যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ব্যাচে ২০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত থাকে ৮০-৯০ জন।দেখে মনে হতে পারে স্বাভাবিক অবস্থার উপস্তিতির সংখ্যার কাছাকাছি।বাস্তবে স্বাভাবিক অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিজের ইচ্ছায় কিংবা ব্যক্তিগত কারনে উপস্থিত হতে পারে না কিন্তু অনলাইন ক্লাসে অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্বেও অংশগ্রহণ করতে পারছে না।

করোনা মহামারীর প্রকোপে অনেক পরিবার অর্থ উপার্জন ক্ষমতা হারিয়েছে, অনেক অভিভাবক হয়ে পরেছে বেকার।যেখানে পরিবারের সদস্যদের অন্নসংস্থান করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন কিংবা পর্যাপ্ত ইন্টারনেট ডেটা প্যাক কিনে সন্তানের অনলাইন ক্লাস করানোর খরচ মেটানোর সামর্থ্য বৃহৎ সংখ্যক অভিভাবকেরই নেই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই টিউশন করে পড়াশোনার খরচ বহন করে।লকডাউনের কারনে হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন গ্রামে।অর্থ উপার্জনের উৎস না থাকায় তাদের পক্ষে অনলাইন ক্লাস করা সম্ভব নয়।ইউজিসির পরিসংখ্যান মেতাবেক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাসের উপযোগী স্মার্টফোন রয়েছে। তবে,এই জরিপ যেহেতু অনলাইনে সম্পন্ন হয়েছে তাই এর মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। কেননা,যে ব্যক্তির অনলাইন জরিপে অংশগ্রহণের সামর্থ্য রয়েছে তার অবশ্যই কোনোভাবে নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রকৃত বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিতে জরিপ চালানো সম্ভব হলে কিছুটা হলেও বাস্তব চিত্র ফুটে উঠত।

সামর্থ্যবান শিক্ষার্থীদের একাংশ এমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে যেখানে নেটওয়ার্ক সংযোগ নেই বললেই চলে,থাকলেও তা খুবই ধীর গতির যা দিয়ে অনলাইন ক্লাস করার সুজোগ নেই ।অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অংশগ্রহণ করতেই পারছে না।আবার অনেকে ভালো নেটওয়ার্কের আশায় কয়েক কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে নদীর তীরে কিংবা খোলা আকাশের নিচে কোনে ধান ক্ষেতের মাঝে অথবা কোনো উঁচু জায়গায় গিয়ে দুপুর বেলার প্রখর রোদের উত্তাপে কিংবা বৃষ্টির মধ্যে ছাতা হাতে ক্লাস চালায়ি যাচ্ছে।এত কষ্ট করে ক্লাস করলেও শ্রেনীকক্ষের মতো মানসম্মত পাঠগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না।পড়া সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়ার সুজোগ নেই।এছাড়া,সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮ এর জন্য প্রানবন্ত পাঠদানে বাধা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ক্লাস রেকর্ড করায় নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় কারো পড়া সম্পর্কিত কোনো সমস্যা থাকলে বা নেটওয়ার্কের বাধায় কোনো অংশ পুনরায় দেখার প্রয়োজন পরলেও সে সুজোগ মিলছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ৬০ ভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিতি এবং কোনো পরীক্ষা কিংবা ব্যবহারিক না নেয়ার শর্তে অনলাইন ক্লাসের অনুমতি দেয়।অনেক শিক্ষকই হরহামেশা ক্লাসের মাঝে অ্যাসাইনমেন্টের প্রসঙ্গ তুলছে।ফলে,যারা ক্লাস করতে পারছে না তারা অবশ্যই পিছিয়ে পরছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লৎফার শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে বলেন, "আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিজেই নানাভাবে বৈষম্যের সৃষ্টিকারী। আমরা চাই না এই চলমান কোভিড-১৯ দুর্যোগের মাঝে বৈষম্যের মাত্রা যেন আরো বেড়ে যায়। এ কারণেই আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি অনলাইন ক্লাস শুরুর আগে সকল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের।"

অনলাইন ক্লাসে শুধু তাত্ত্বিক পাঠদান সম্ভব হচ্ছে কিন্তু ব্যবহারিক ক্লাস না করে পরীক্ষার বৈতরণি পারি দিয়ে শুধু সেশনজট মোকাবেলা করা সম্ভব, মানসম্মত শিক্ষার ঘাটতি থেকেই যাবে।স্থাপত্য কিংবা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা যদি হাতে কলমে শিক্ষা না নিয়ে শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করে তবে তাদের নামের সাথে স্থপতি,ডাক্তার যুক্ত হবে ঠিকই কিন্তু স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে অদক্ষ থেকে যাবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক সেমিস্টার বিদায় দিয়ে আরেক সেমিস্টার শুরু করছে।এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির মন্দবুদ্ধি। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্টিফিকেট বানিজ্য আগের থেকে রমরমা হয়ে উঠবে।

স্কুল-কলেজে বৈষম্যের মাত্রা আরো মারাত্মক। শহুরে ও গ্রামীন স্কুলের মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। যেখানে শহরের বেসরকারি স্কুল-কলেজে লকডাউনের শুরু থেকেই অনলাইনেই ক্লাস কার্যক্রম চলছে সেখানে গ্রামের শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা সংসদ টিভিতে প্রচার হওয়া বিনামূল্যে পাঠদান। বিনামূল্যে পাঠ গ্রহনের সুজোগ সবার মিলছে না।বিবিসির সূত্রমতে দেশে টিভি দেখার সুজোগ আছে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীর।এছাড়া গ্রামের স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস নেয়াও সম্ভব নয় কারন এসকল স্কুলের শিক্ষকরা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে অনেকেই অনভিজ্ঞ।

অনস্বীকার্য, অনলাইন ক্লাসের বদৌলতে দূরত্বের কারনে যে কোর্সগুলো করা সম্ভব হচ্ছিল না তা হয়েছে সহজলভ্য। অনেক শিক্ষার্থী এই সুজোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোর্স করে নিজেকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।

এই ক্রান্তিলগ্নে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক পথে চালনা করাই এখন সকলের চিন্তার বিষয়।শিক্ষার্থীরা ভাবছে এখন তারা যতটুকু সময় পিছিয়ে পরবে চাকরি যুদ্ধেও তারা ততটুকু পিছিয়ে পরবে।এছাড়া, দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকায় শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হবে।মহামারী উত্তরন কালীন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে অভিযোজন করতে ছাত্রছাত্রীদের বেগ পেতে হবে।

সমস্যাগুলো সমাধান না করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বাহিরে রেখে বৈষম্যমূলক শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা ন্যায়সংগত হতে পারে না।নিজেদের সক্ষমতার কথা না ভেবে প্রযুক্তিতে উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে একই পথে হাটা সম্ভব না।যতই আমরা ডিজিটাল হইনা কেন গ্রাম ভিত্তিক এই দেশে এখনো অনেক গ্রামে ইন্টারনেট সুবিধা নেই।ফাইভ জি ইন্টারনেট সেবা চালু করার পরিকল্পনা চলছে কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলে এখনো থ্রি জি সেবাই ঠিকভাবে পৌঁছচ্ছে না।দেশের শিক্ষাখাতের ভঙ্গুর দিকগুলো উন্মোচিত হলো এই সংকটের সময়ে।

অনলাইন ক্লাস চালনার জন্য শতভাগ শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস উপযোগী ডিভাইসের সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি সারাদেশে গুনগত নেটওয়ার্ক সংযোগের ব্যবস্থা করতে হবে।তা বাস্তবায়ন না হলে বৈষম্য সৃষ্টিকারী কোনো শিক্ষা-কার্যক্রম চালানো ন্যায়সঙ্গত হবে না।বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হলে মৌলিক চাহিদা শিক্ষা নিয়ে তৈরি হবে দীর্ঘমেয়াদি সংকট।এর প্রভাব পরবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে।

লেখকঃ মোঃ অলিউল ইসলাম , শিক্ষার্থী , আইন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়