নির্যাতনের অর্থনীতি বনাম সামাজিক আন্দোলন


Dhaka
Published: 2020-10-17 22:04:21 BdST | Updated: 2020-10-22 02:33:57 BdST

মাহামারীর কারনে পৃথিবী থেমে থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতা থেমে নেই। সম্প্রতি দেখা গিয়েছে লকডাউনের মতো আপদকালীন সময়ে নরীর প্রতি নির্যাতন বহুগুণ বেড়েছে। ইতিহাস ঘাটলে আমাদের অনেক কিছুই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমরা নারীদের কাছে কতটুকু ঋণী সেটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে অতীতে।

রাহুল সাংকৃত্যায়নের বিখ্যাত বই 'ভোল্গা সে গঙ্গা' এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয় 'ভোলগা থেকে গঙ্গা' নামে। প্রায় কয়েক হাজার বছরের মানবজাতির ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। এছাড়াও 'সেপিয়েন্স - মানুষের ইতিহাস' নামে লেখক ইউভাল নোয়া হারারির বইটিতেও মানবসভ্যতা অনন্য এর পরিক্রমা তুলে ধরেছেন । মূলত বই দুটির মূল উপপাদ্য মানুষের ইতিহাস হলেও সেখানে সভ্যতা সৃষ্টিতে নারীর ভূমিকা যেভাবে উঠে এসেছে সেটি পর্যালোচন করলে দেখা যায় আসলে নারীকে বাদ দিয়ে পৃথিবী অবাস্তব। আদিম শিকারীযুগ, কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে আধুনিক শিল্প-সমৃদ্ধ সমাজে নারীর ভূমিকা অনন্য। এক সময় গোত্র প্রধানের দায়িত্বও নারীদের হাতে ছিলো।

পৃথিবীতে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে অনেক বহুজাতিক কোম্পানির নেতৃত্ব রয়েছে নারীদের হাতে। দেশের স্বনামধন্য একজন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরকে বলতে শুনেছি, মেয়েদের হাতে যদি পৃথিবীর শাসন কোনদিন আসে পৃথিবী খুবই নিরাপদ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। আমরা মুখে এক আর মনে অন্য জিনিস ধারণ করে থাকি। অতীত ভিন্ন কথা বললেও বর্তমানে আমরা নারী স্বাধীনতাকে অনেকটা থমাস মুরের 'ইউটোপিয়ান' বা স্বপ্নলোক, স্বপ্নপুরী, কল্পস্বর্গ বা কল্পলোক হিসেবে ভেবে নিয়েছি।

এবার আসি মূল আলোচনায়। অর্থনীতিতে নারীর অবদান অনন্য। অন্য কোথাও না গিয়ে যদি বাংলাদেশের দিকেই আলোকপাত করি তাহলে একটি ধারণা আসবে। অর্থনীতিতে জিডিপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নারীর অবদান সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং- সানেম গতবছর একটি গবেষণায় দেখিয়েছে মূল অর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অবদান ২০ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও যদি গৃহস্থালি কাজকে জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতিতে যোগ করা হয় এর অবদান দাঁড়াবে প্রায় ৪৮ শতাংশ যেটি মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক।

নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনার ফলে এক ধরণের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় নারীরা সেটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতার জন্ম দিয়েছে। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা কেয়ার নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা যেটি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ শতাংশের বেশি। নারীরা নির্যাতিত হবার পর সামাজিক-রাজনৈতিক কারনে পূর্বের কর্মস্থানে ফিরে যেতে না পারায় (যেমন- টিজিং এর স্বীকার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করা বা একেবারেই ঝরে পড়া, চাকরি হারানোসহ অন্যান্য বিষয়) দেশ এই বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

নারী নির্যাতনের কারন কি? এর মূল কারন হচ্ছে অসমতা, প্রকৃত শিক্ষার অভাব। আর এর ফলেই তৈরি হচ্ছে আইনের শাসনের অভাব। যেটি তৈরি করছে পুরুষতান্ত্রিক মানুষিকতা। দেশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অ্যাকশন এইডের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতায় বিচার পায় না ৯৭ ভাগ ভুক্তভোগী। সংখ্যাটি বিশাল। বাস্তবে এর ভয়াবহতা অনুমেয়।

এর সমাধান কোথায়? বাংলাদেশেসহ পৃথিবীর সব জায়গায় নির্যাতনের সিংহভাগই ঘটে পরিবারের ভেতরে। পরিবারের পুরুষ সদস্য কর্তৃক নারী সদস্যদের নির্যাতনের হার অধিক। অর্থাৎ আমাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আয়তায় আনতে হবে। সর্বোপরি কার্যকর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নারী শিক্ষায় বিনিয়োগের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের ব্যাপকহারে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে নারীরা সংখ্যায় অর্ধেক স্থান দখল করে রয়েছে। বেগম রোকেয়া তার অর্ধাঙ্গী রচনায় নারী-পুরুষের শিক্ষার পার্থক্য তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন, 'স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ (সেলাই করিবার জন্য) মাপেন।’ নজরুলের অমর বাণী, "বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর" এর ভাবগত গুরুত্ব অনেক। নিরাপদ ও নারীবান্ধব সমাজ গঠনের দ্বারাই সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সুদিন সমাগত। কিন্তু কবে? এর উত্তরও আমাদেরকেই খুঁজতে হবে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা একদিন বাস্তবে রূপ নেবে সেই প্রত্যাশা রইল।

লেখক,
তবিবুর রহমান
শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল।