প্রশ্নপত্র ফাঁস: কোন পথে বাংলাদেশ


রাশেদুজ্জামান কানন
Published: 2018-02-12 03:27:43 BdST | Updated: 2018-10-18 14:10:22 BdST

১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। পরাজয় নিশ্চিত জেনে রাও ফরমান আলী বিশ্ব ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে ঘৃণিত দাবার চালটি চাললেন। বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একে একে গায়েব করে দিলেন। মুনির চৌধুরী, শহিদুল্লাহ কায়সার, আনোয়ার পাশা, জহির রায়হানদের হারানোয় সৃষ্ট ক্ষতটা বাংলাদেশ গত ৪৬ বছরেও সারিয় তুলতে পেরেছে কী না সন্দেহ। রাও ফরমানেরা জানতেন, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষিত সমাজকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দির দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করতে বসেছি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, আমাদের আগামী প্রজন্মকে।

খুব বেশি দিনে আগের কথা নয়। আজ থেকে ১৫ বছর আগেও কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা কল্পনাও করতে পারত না। হ্যাঁ, তার কিছু আগে এক সময় পরীক্ষা কেন্দ্রে নকলের একটা প্রবণতা ছিল। ছাত্র, শিক্ষক, প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নকল নামক সেই পেতাত্মাকে আমরা খাঁচাবন্দি করতে সফল হয়েছিলাম। গত চার, পাঁচ বছরে যাদুর ‘পেনডোরা বক্স’ থেকে আর একটি অশুভ আত্মা বের হয়ে এসে ভর করেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ‘প্রশ্নপত্র ফাস’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, সরকারি চাকুরির পরীক্ষা থেকে শুরু করে প্রাথমিকস্তর পর্যন্ত অধিকাংশ পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন এখন পরীক্ষার আগেই চলে যাচ্ছে পরীক্ষার্থীদের হাতে। গত ডিসেম্বরে নাটোরে প্রথম শ্রেণীর প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল করেন জেলা প্রশাসক, বরগুনাতেও দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশ্ন ফাঁসের খবর পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখেছে সবাই। একজন প্রথম শিশু শ্রেণীর শিক্ষার্থীা, কতই বা বয়স ওর? সদ্য পৃথিবীর ভূমিতে পদাচারণ করতে শেখা আগামী দিনের এই নাগরিককে জীবনের প্রথম অধ্যায়েই আমাদের নোংরা চেহারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে না দিলেই কি নয়?

প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণীর ধারাবাহিতকায় প্রতিবারের মতো এবারও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। ঘটনায় বিব্রত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে খোদ সংসদ থেকেই। গোয়েন্দা পুলিশ চালাচ্ছেন চিরুনি অভিযান। ইন্টারনেটের গতিও কমানো হলো। কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হলো। ঘোঝণা করা হলো পুরস্কার। ফলাফল শুন্য। পরীক্ষার আগে যথারীতি প্রশ্ন চলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীর কাছে। যদিও সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে কিন্তু মূলহোতারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

প্রশ্ন হলো, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ওই অগাদ জলের মাছটাকে পাকড়াও করা কী খুবই কঠিন? আমাদের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কী এতটাই দূর্বল যে ভার্চুয়াল জগতে ঘুরে বেড়ানো ওই সব কালপিটদের টিটিটাও খুঁজে পাচ্ছেন না তাারা। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে চলুন আর একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি?

কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে?

একটা সময় ছিলো, যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিযোগিতাটা হতো শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শিক্ষার্থীরা সারা বছর পড়ে বাৎসরিক পরীক্ষায় সামান্য ভুল করে পিছিয়ে পড়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে নতুন বছর শুরু করত। আজকাল যেন সেই প্রতিযোগিতা মাঠ পরিবর্তন করে চলে এসেছে অভিভাবকদের কোর্টে। সন্তান জিপিএ ফাইভ না পেলে প্রতিবেশীর কাছে মুখ দেখাতে পারেন না বাবা-মা। সন্তানকে যে করেই হোক প্রথম হতেই হবে। এ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এখন কোনো অভিভাবক তার সন্তানটিকে শিক্ষাগুরুর হাতে তুলে দিয়ে বলেন না, স্যার, আমার সন্তানটি যেন ‘মানুষ’ হয়। বরং শিক্ষালয়ে ভর্তি করে দিয়েই তিনি দৌঁড়ান কোচিং আর গৃহ শিক্ষকের পিছনে। সামনের পরীক্ষায় সন্তানকে প্রথম বানাতে হবে তো!

অবশ্য এক তরফাভাবে অভিভাবকদের সমালোচনা করাটাও অন্যায্য হবে। আমারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সমস্ত দৌড় প্রতিযোগিতার পসরা সাজিয়ে বসেছি তাতে শ্রেষ্ঠ দৌঁড়বিদ বাঁছাই করা হয় ওই সিজিপিএ কিংবা পরীক্ষার রেজাল্টের নম্বরপত্র দিয়েই। সেখানে ‘মানুষ’র চেয়ে উচ্চ সিজিপিএধারী ‘যন্ত্রটাকেই’ বেশি মূল্যায়ন করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের সেই দৌঁড় প্রতিযোগিতাটা বন্ধ করাটা এখন সময়ের দাবি।
চলুন এবার প্রথম প্রশ্নের উত্তরের কাছে ফিরে যাই। এখন পর্যন্ত জাতীয় দৈনিকগুলোর খবরের ভিত্তিতে বলা যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যাদের আটক করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্কুল-কলেজের কর্মচারী। এমন কী সরকারি কর্মকর্তাও বাদ পড়েনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকেই এমন বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব হয়নি যাতে সেটা অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। এমনকি অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিন নিয়ে দিব্যি মুক্ত পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন বলেও খবর পাওয়া যায়।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এবং দুদক এ সংক্রান্ত আলোচনাও করেছে। যেখানে মাননীয় মন্ত্রী দোষারোপ করেছেন শিক্ষকদের আর দুদক বলেছে এর সঙ্গে সরকারি কর্মচারী, কর্মকর্তাও জড়িত। তার মানে দুদক এবং মাননীয় মন্ত্রী দুই পক্ষই জানেন ভুতটা আসলে কে, কোথায় লুকিয়ে আছে। তবে পাকড়াও করছেন না কেন? তাছাড়া বলা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ছে ফাঁসকৃত প্রশ্ন। তবে পরীক্ষা চলাকলীন সময় সাময়িক সময়ের জন্য ফেসবুক, হোয়াটসএপের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে না কেন?

বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। দেশের সব পরীক্ষাকেন্দ্রেই ইন্টারনেট সুবিধা আছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট আগে মেইলের মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রশ্ন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ততক্ষণে সব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মেইল থেকেই প্রশ্ন ডাউনলোড করে ফটোকপি করতে ১০/১৫ মিনিটের বেশি সময় লাগারও সম্ভাবনা নেই। আর এই সময়ের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। আর হলেও যেহেতু শিক্ষার্থীরা হলেই থাকবে সেহেতু তা কোনো কাজেও দেবে না।
গত ৯ বছরে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর অধিভুক্ত শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থা প্রণীত হয়েছে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। আপনি যতই উন্নয়ন করেন যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে না পারেন তবে আপনার সেই ‘উন্নয়ন’ ‘পরিশ্রম’ বৃথা যেতে বাধ্য।

শেষ করব একটা কাল্পনিক অনু গল্প দিয়ে-
২০৪০ সাল। বাংলাদেশ সরকারের এক সাবেক মন্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। ব্যাথায় কাতর সাবেক মন্ত্রীকে ভর্তি করানো হলো দেশের সবচেয়ে নামকরা হাসপাতালে। হাসপাতাল বেডে মন্ত্রী ডাক্তারের অপেক্ষা করছেন। হেলেদুলে ডাক্তার এলেন। সাবেক মন্ত্রীর সমস্যাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপই পাশের ডেস্কে ইয়া মোটা এক বই নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করলেন।

স্বভাবতই রাগী রোগী মানে সাবেক মন্ত্রী হুংকার দিয়ে বললেন, এই ডাক্তার, এগুলো কী হচ্ছে? আমি ব্যথায় মরে যাই আর তুমি?
তরুণ ডাক্তার হেসে উত্তর দিলেন, স্যার আপনি যখন মন্ত্রী ছিলেন তখন ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাই। সেখানেও ইয়ার ফাইনালে প্রশ্ন ফাঁস হত। তাই বেগার পড়াশোনা করে কোন গাঁধা? কিন্তু এখন তো আপনার চিকিৎসা করতেই হবে। আর আপনি গুণীজন, আপনার ভুল চিকিৎসা তো করতে পারি না। তাই পড়ে নিচ্ছি। আপনি দুইটা ঘণ্টা কষ্ট করে দাতে দাত চেপে শুয়ে থাকুন।

লেখক: সহ-সম্পাদক- দৈনিক আমার দিন।

এসএইচ/ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।