'গণতান্ত্রিক একনায়কে'র যুগে বিশ্ব!


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-03-19 21:16:48 BdST | Updated: 2018-10-15 18:22:04 BdST

ইতিহাসে 'আদিম সাম্যবাদ' বলে একটা বস্তুর হদিস পাওয়া যায়। বলতে গেলে সেটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের কথা। তার পর নীলের পানি ভারত মহাসাগর পর্যন্ত গড়াল। কত ইতিহাস হলো! বিশ্বে গণতন্ত্র এলো। সেও তো অনেক আগের কথা। গ্রিসে নগর রাষ্ট্র উদ্ভবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল। এরই মধ্যে দুনিয়া রাজা-বাদশাহদের যুগও দেখেছে একসঙ্গে। দেখেছে সুলতানি আমল। আর এ সময়ে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ছিল ধর্ম। দুনিয়া সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পুঁজিবাদ পর্বে ঢুকল। নতুন ভাবনা নিয়ে সমাজতন্ত্র এলো। সফল হলো, ব্যর্থ হলো। পরবর্তীকালে বিশ্ববাসী ফ্যাসিবাদ নামে একটি ধারণার সঙ্গেও পরিচিত হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানে দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হলো দুনিয়া। এর পর শুরু হলো স্নায়ুযুদ্ধের আমল।

ইতিহাসের এমন ধারাবাহিকতায়, নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অবসান হলো দুই মেরুর বিশ্বের। একক নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো আমেরিকা। দুনিয়াজুড়ে রফতানি হতে থাকল আমেরিকান বা পশ্চিমা মডেলের গণতন্ত্র। এই একই সময়ে স্বৈরতন্ত্রের খোলস বদলে বাংলাদেশও ঢুকল গণতন্ত্রের যুগে। এর মধ্যে হঠাৎ বিশ্ব-রাজনীতির একক আধিপত্য কমতে শুরু করল। বিশ্বশক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মাথা ঢুকাল চীন ও রাশিয়া। অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তির উন্নয়নে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল ভারত, ব্রাজিল, জাপানের মতো রাষ্ট্র।

শুধু বাংলাদেশেই না; নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকল। এদিক দিয়ে অবশ্য অনেক আগে থেকেই এগিয়ে ছিল ইউরোপ। তারা এক রকম গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে পেরেছিল। এর সঙ্গে এই মহাদেশের রাষ্ট্রগুলো একটা ইউনিয়ন করে সেখানেও গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করল। বর্ণবাদী যুগের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও শুরু হলো গণতন্ত্রের নবযাত্রা। ভারতে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান হতে থাকল। বিজেপিসহ আঞ্চলিক দলগুলোর গুরুত্ব বাড়তে থাকল। যদিও এর মধ্যে বহাল তবিয়তে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে টিকে থাকল বাদশাহ-আমিরদের শাসন। আরব বসন্ত একটা গণতান্ত্রিক ধাক্কা দিলেও শেষ পর্যন্ত খুব একটা বদলাল না আরব দুনিয়া। বাদশাহি শাসন নিয়ে টিকে আছে সৌদি আরবসহ অনেক রাষ্ট্র।

আর এর বাইরে হাতেগোনা কমিউনিস্টশাসিত একদলীয় রাষ্ট্রগুলো। কিউবার সমাজতন্ত্র নিয়ে আলাপ করার মতো কিছু উপাদান থাকলেও চীনকে বলা যায় 'সমাজতন্ত্রের কাপড়ে মোড়ানো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র'। আর উত্তর কোরিয়া হলো এমন এক রহস্যময় দেশ, যেখান থেকে ধেয়ে আসা মিসাইল ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না, জানা যায় না।

মোটামুটি দীর্ঘ অবতরণিকা বাদ দিয়ে এবার আসল গল্পে আসা যাক। অনেক তন্ত্রমন্ত্রের মধ্যে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা দুনিয়াজুড়ে যে সবচেয়ে বেশি, তা নিয়ে খুব কম জনেরই সন্দেহ আছে। কিন্তু হালের বিপদ হলো, দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের নামেই শুরু হয়েছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। দলের ভেতরে বাড়ছে একক ব্যক্তির প্রভাব; খর্ব হচ্ছে সবার সমান ক্ষমতা ও অংশগ্রহণ।

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি ও একচ্ছত্র করতে শাসনতন্ত্র বদলেছেন। দুই দফার বেশি প্রেসিডেন্ট না থাকার বিধান বাতিল করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল। ফলে চীনে একদলীয় শাসনে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রটুকুও শেষ হয়ে গেল। দলের থেকে বড় হয়ে গেল ব্যক্তি।

আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে প্রায় একই ঘটনা ঘটছে। তথাকথিত জাতীয়তাবাদ, বিশ্বব্যাপী মোড়লগিরি, উন্নয়ন ইত্যাকার উছিলায় ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে উৎসাহী নেতাদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা শুধু দলেই একক আধিপত্য ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই, রাষ্ট্রক্ষমতাও তার অধীনে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে দেশে দেশে সংকুচিত হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চা। নানাভাবে দমন হচ্ছে ছোট-বড় বিরোধী দল ও মত। আর এসব দেশে সিভিল সোসাইটিকেও কার্যত কোণঠাসা ও নানাভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখা হচ্ছে।

এই 'নয়া গণতান্ত্রিক মডেল'-এর জুতসই উদাহরণ বোধ হয় রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন। ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসার পর, চেয়ার ওলটপালট করে তিনিই একবার প্রেসিডেন্ট, পরেরবার প্রধানমন্ত্রী। তবে যে পদেই থাকুন না কেন, ক্ষমতার নাটাই তার হাতেই ছিল। স্টালিনের পর তিনিই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন। ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও পুতিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কার্যত তা হতেই দেননি তিনি। এবার পুতিন তার প্রধান বিরোধী আলেক্সেই নাভালনিকে নির্বাচনে প্রার্থী হতেই দেননি। ইকোনমিস্ট লিখেছে, পুতিন নিজেকে রাশিয়ার রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি কিনা বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করছেন এবং 'বৃহৎ শক্তি' হিসেবে বিশ্বের সামনে নতুন রাশিয়াকে হাজির করেছেন। পুতিনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফের অমর বাণী 'নো পুতিন, নো রাশিয়া'র মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে এই নির্বাচনেও ষষ্ঠবারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার মন্ত্র। কিন্তু এর ফলে, দেশের গণতন্ত্রের যে মৃত্যু ঘটল, তার কি কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হবে না, আজ কিংবা কাল?

পুতিন মডেলের এমন অনেক উদাহরণও মিলবে বিশ্বজুড়ে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ঘোষণা করলেন, যেসব দল মেয়র ইলেকশনে অংশ নেয়নি, তারা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তিনি বললেন, রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে বিরোধী দলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল! ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে কি অকাট্য যুক্তি!

এর আগে ওই বছরের নভেম্বরে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে, কলম্বিয়ার সর্বোচ্চ আদালত সে দেশের প্রধান বিরোধী দলকে ভেঙে দিয়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দল সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আবেদন করেছে- বিরোধী দল আমেরিকার সঙ্গে যোগসাজশ করে ক্ষমতায় আসার চক্রান্ত করেছে। আদালত শুধু দলকেই ভেঙে দেননি; সংসদে থাকা ১১৮ জন বিরোধী সদস্যকেও পাঁচ বছরের জন্য বহিস্কার করেছে। এর ফলে ক্ষমতায় আসার পথে আর কোনো বাধাই থাকল না তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হু সেনের। মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনাকে আখ্যা দিয়েছেন 'কলম্বিয়ায় গণতন্ত্রের মৃত্যু' হিসেবে।

নিজের ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করারই নজির দেখিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। গণভোটের মাধ্যমে তিনি তার নির্বাহী ক্ষমতাকে অগাধ করে নিয়েছেন। আর তিনিও যে দীর্ঘমেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকতে চান, তার রাস্তা পরিস্কার করতে তার বিরুদ্ধে থাকা বিরোধী শিবিরকে, তথাকথিত অভ্যুত্থানের অভিযোগে 'সাইজ' করে দিয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ৪০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন একটি আদালত। প্রায় আট হাজার পুলিশ সদস্যকে তাদের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। ৩০ জন গভর্নর ও অন্তত ৫০ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে এ ঘটনার বলি হয়েছেন। বিশ্নেষকরা বলছেন, অভ্যুত্থান সামনে রেখে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী, সরকারি অফিস- সবখানে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে নিজের মতের বাইরের লোকদের সরিয়ে নিজের ক্ষমতাকে নিস্কণ্টক ও একচ্ছত্র করেছেন এরদোগান।

আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত 'বৃহত্তম গণতান্ত্রিক' দেশ হিসেবে স্বীকৃত হলেও হালে সেখানে মোদি হাওয়া বইছে। দলের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ আসলে নরেন্দ্র মোদি। পরিবারতন্ত্র ও একক নেতৃত্বের যে অভিযোগ এতকাল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে করে আসছিল বিজেপি, সে দলেও এখন দিন দিন ব্যক্তির প্রভাব বেশি দৃশ্যমান। আর নরেন্দ্র মোদি তার ক্ষমতাকে যেভাবে উপভোগ করছেন, বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের আসন আরও শক্ত করার যে স্বপ্ন দেখছেন, তা মেটাতে তিনিও যে ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চাইবেন না, সেটা খুব সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশেও টানা দু'মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্ত দলগুলো। এ সময়ে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনীতিতে 'প্রকৃত বিরোধী দল' বলে কিছু নেই। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের 'যোগ্য বিকল্প' হিসেবে যে দাঁড়াতে পারবে, সেটা বলা মুশকিল। ফলে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে পারে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট। এমতাবস্থায়, আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা কোন পথে হাঁটেন, সেটাই দেখার বিষয়।

ফলত, দেশে দেশে গণতন্ত্রের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একটি রাষ্ট্রের সঠিক বিকাশ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের একটা অপরিহার্যতা আছে। আর গণতন্ত্র নিশ্চিত হতে পারে, দলের অভ্যন্তরে 'সবার সমান অংশগ্রহণমূলক চর্চা' ও রাষ্ট্রের সব দলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে এমন গণতন্ত্রেরও নজির আছে, যেখানে অংশগ্রহণমূলক ও দলীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। একক দল ও ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদে থাকার প্রয়োজন হয়নি।

সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

বিদিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।