আরবী ভাষার সার্বজনীনতা


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-03-20 18:18:14 BdST | Updated: 2018-07-23 00:03:03 BdST

ভাষা অনেকটা মানুষের মতোই। এর উদ্ভব হয়, বিবর্তন হয়, উন্নতি হয়, এমনকি দূর্বলতাও দেখা দেয়। আবার কখনো কখনো ভাষার মৃত্যুও ঘটে । অন্য সকল ভাষার মতো আরবীও পৃথিবীর একটি প্রচলিত ভাষা। এটি একটি সেমিটিক ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মানুষের প্রধান ভাষা। প্রায় ২২টি দেশের রাষ্ট্রভাষা আরবী।

ধারণা করা হয়ে থাকে, প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে এ ভাষা অস্তিত্বে আসে। বর্তমান বিশ্বের আলজেরিয়া, বাহরাইন, চাঁদ, কমোরোস, জিবুতি, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইরাক, ইসরাইল, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, তিউনিশিয়া, সংয়ুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় ভাষা। এসব আরব দেশ ছাড়াও তুরস্ক, মালয়েশিয়া, সেনেগালসহ ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ ভাষার ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। বিশ্বের ৪২২ মিলিয়ন আরব জনগোষ্ঠী এবং দেড়শ' কোটিরও বেশি মুসলিম তাদের দৈনন্দিন জীবনে এ ভাষা ব্যবহার করে থাকেন।

জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসিয়াল ভাষা হলো আরবি। শুধু তা-ই নয়; ‘ট্রেড ল্যাংগুয়েজ' হিসেবে এ ভাষা অনারব দেশেও প্রায় প্রতিটি পণ্যের মোড়কে স্থান পায়। ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ভালোভাবে জানতে হলে আরবী ভাষার জ্ঞান অত্যাবশ্যকীয়। সকল যুগেই মুসলিম পন্ডিতগণ ইজতিহাদের জন্য আবশ্যক আরবীভাষা, এর নাহু-সরফের জ্ঞান, শব্দভান্ডার, ব্যকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমানে জ্ঞান রাখতেন। ইসলামী শরী'য়াহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় এবং যেহেতু কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামী সভ্যতার ভিত্তি সেহেতু ইসলাম নিয়ে যেকোনো গভীর অধ্যয়নের সাথে আরবী ভাষার অধ্যয়ন থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। আরবী ভাষার ২৯ টি হরফ। এ হরফ দ্বারা গঠিত শব্দ দিয়েই পবিত্র কুরআন নাযিল হয়। কুরআনের ১১টি আয়াত হতে এ নির্দেশনা পাওয়া যায় যে কুরআন সম্পূর্ন আরবী ভাষায় নাযিলকৃত।

শাইখ তাকী (রহ) বলেন, "ঈমান ও আহকাম বোঝার ক্মেষেত্রে ইসলামে দুটি ভিন্ন বিষয়। ইসলামে ঈমান প্রতিষ্ঠিত হয় বুদ্ধিবৃত্তি বা আকলী দলীল দ্বারা। যাতে করে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কিন্তু আহকাম বোঝার বিষয়টি শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির উপর নির্ভর করে না, বরং আরবী ভাষা জানার উপর, হুকুম বের করে আনার যোগ্যতা, দূর্বল হাদীস হতে সহীহ হাদীস পৃথক করার উপরও নির্ভর করে।"

উমর (রাঃ) আবু মূসা আশ'আরী (রা)-কে চিঠিতে লিখেছিলেন, "সুন্নাহর জ্ঞান ও আরবীর জ্ঞান অর্জন কর এবং কুরআন আরবীতে অধ্যয়ন কর। কারণ এটা আরবী।"

মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আলিয়া, কওমী মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরবী ভাষার ব্যাপক চর্চা আছে। এ চর্চার সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় আবেগ ব্যাপকভাবে জড়িত। বাংলাদেশের সাথে আরবি ভাষার পরিচয় ঘটে সুদূর অতীতে বাণিজ্য সূত্রে। আরব বণিকেরা বাণিজ্যসম্ভার নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় বন্দর চট্টগ্রাম বা সন্দ্বীপে পৌঁছতেন এবং সেখান থেকে মিয়ানমার (বার্মা), মালয় উপদ্বীপ ইত্যাদি অতিক্রম করে চীনের ক্যানটন পর্যন্ত যেতেন। আরবে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পরও বাণিজ্য সূত্রে তারা এ দেশে আসতেন এবং তাদের সাথে আসতেন ধর্মপ্রচারকেরা। এভাবে প্রাচীনকালে আরবদের এবং পরবর্তীকালে আরব মুসলিমদের বাংলায় যাতায়াতের ফলে বাংলার অধিবাসীরা আরবি ভাষার সাথে পরিচিত হয়। কালক্রমে এ দেশীয় কিছু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের মধ্যে আরবি ভাষা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ইসলাম প্রচারকেরা নামাজ আদায়ের জন্য যেসব মসজিদ ও খানকাহ নির্মাণ করেন, সেখানে আরবি কুরআন পাঠ ও শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই এ দেশে আরবি ভাষা চর্চার সূত্রপাত হয়। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আরব বণিক এবং ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় আরবি ভাষার মিশ্রণ শুরু হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপভাষার মোট শব্দের প্রায় অর্ধেক আরবি বা আরবি শব্দজাত।

তবে বাস্তবতা হলো- ব্যবসায়িক প্রয়োজনে আরব বণিক আর ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বহুকাল আগে থেকেই এ দেশে আরবি ভাষা চর্চা শুরু হলেও আজো তা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী আরব দেশগুলোতে কর্মের সন্ধানে, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আরবি ভাষা চর্চার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে-
রেমিট্যান্স অর্জনে : এ দেশের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স আসে সৌদি আরবসহ আরবি ভাষাভাষী দেশ থেকে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ আরবদেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু তারা পেশাগতভাবে আরবি ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় যথার্থ বেতনভাতা ও নানাবিধ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারত-পাকিস্তানের মতো আমাদের দেশেও যদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশগামী জনশক্তিকে ভাষাগত দক্ষতাসম্পন্ন করে রফতানি করা যেত, তাহলে তারা আরো অধিক বেতন ও নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারত; দেশে আরো অধিক পরিমাণে রেমিট্যান্স আসত।

ব্যবসায়িক সফলতা লাভে : সৌদি আরবে যত টেকনিক্যাল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আছে তার মধ্যে বেশির ভাগ লোকই ভারতীয় নাগরিক। কারণ ভারতীয়রা তাদের দেশ থেকেই আরবী ভাষা বিশুদ্ধরূপে শিখে যায়। অথচ বাংলাদেশ থেকে যারা যায় তারা আরবী ভাষায় দক্ষ না হওয়ার কারণে ওদের গোলামী খাটতে হয়। ইসলাম আগমনের বহু বছর আগ থেকেই এ দেশের সাথে আরবদেশের বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক ছিল এবং অদ্যাবধি আছে। এ সম্পর্ককে আরো জোরদার করার জন্য আধুনিক আরবি ভাষা চর্চার বিকল্প নেই। কারণ আরবেরা ব্যবসায়িক কার্যক্রমসহ সব ক্ষেত্রে আরবি ভাষা ব্যবহারকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

ধর্মীয় প্রয়োজনে : নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া পাঠ করা এবং কুরআন, হাদিস, তাফসির (কুরআনের ব্যাখ্যা) ও ফিকাহর (ইসলামি আইন) বিধিবিধান সঠিকভাবে জানার জন্য আরবি ভাষা শিক্ষার বিকল্প নেই। কারণ ইসলামের বিশুদ্ধ ও মৌলিক জ্ঞান সবই আরবি ভাষায় লিখিত ও রচিত। এ ছাড়া সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশ, অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির আবির্ভাব এবং পৃথিবীতে মানুষের জীবনাচরণ পরিবর্তনের ফলে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে গবেষণালব্ধ ইসলামের বিধিবিধান জানার মুখাপেক্ষী হতে হয়। আধুনিক যুগ সমস্যার সমাধানকল্পে প্রতিষ্ঠিত বেশির ভাগ ফিকাহ অ্যাকাডেমি ও ইসলামি আইন গবেষণা কেন্দ্র আরব দেশগুলোতে অবস্থিত। এখান থেকেই সাধারণত নতুন নতুন বিষয়ে ইসলামীকরণের যথার্থ ব্যাখ্যা এসে থাকে। তাই ইসলামের সব বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান অর্জনের তাগিদে তথা ধর্মীয় প্রয়োজনে আরবি ভাষা চর্চা একান্তই জরুরি।

কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ়করণে : আরব দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে আধুনিক আরবি ভাষা চর্চার ব্যাপক ও সুদূর পরিকল্পনা থাকা দরকার। কারণ আরবদেশগুলো আমাদের দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন খাতে প্রচুর আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকে। বন্যা, সিডর, আইলা ও বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে আমরা আরবদেশগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি অনুদান পেয়ে থাকি। অপর দিকে অনেক আরব দেশ আমাদের চেয়ে রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বহু ধাপ এগিয়ে গেছে।

দুঃখের বিষয় হলো, মুসলিম অধ্যুষিত বিশাল জনসংখ্যার এ দেশে সরাসরি আরবি ভাষা শিক্ষা ও চর্চার জন্য সরকারের তেমন কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। যদিও এদেশে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত আলীয়া মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি পড়ানো হয়, তথাপি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আরবি বিশেষজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাদের নজর না থাকায় এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় পেশাগত আরবির বিষয়াবলী সিলেবাসভূক্ত না করায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আধুনিক আরবি ভাষায় যোগ্য জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না।

লেখকঃ উম্মেহানী

শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ,
মাস্টার্স
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিদিবিএস 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।