প্রধান ৪ প্রার্থীই উচ্চশিক্ষিত ও সম্পদশালী


Dhaka
Published: 2020-01-02 15:43:01 BdST | Updated: 2020-02-17 16:06:11 BdST

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ-বিএনপির চার প্রার্থীই উচ্চশিক্ষিত ও সম্পদশালী। উত্তরে দুই দলের প্রার্থীই ব্যবসায়ী, দুজনেরই শতকোটি টাকার ব্যবসায়িক ঋণ আছে।

চার প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী দক্ষিণের আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। সবচেয়ে কম সম্পদের মালিক দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির ইশরাক হোসেন। সবচেয়ে বেশি ঋণ উত্তরের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামের। পাঁচ বছরের ব্যবধানে আতিকুলের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তাবিথ আউয়ালের আয় ও সম্পদ যেমন বেড়েছে, তেমনি ঋণও বেড়েছে। ফজলে নূর পেশায় আইনজীবী। বাকি তিনজনই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

৩০ জানুয়ারির এ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে আর্থিক অবস্থার এই চিত্র পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এই চার প্রার্থীর হলফনামা পাওয়া গেছে।


শতকোটি টাকার সম্পদ তাপসের
শেখ ফজলে নূর তাপস এলএলবিতে স্নাতক এবং ব্যারিস্টার-অ্যাট ল করেছেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে। হলফনামার তথ্য অনুসারে, তাঁর বছরে মোট আয় ৯ কোটি ৮১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৬ টাকা। এর মধ্যে আইন পেশা থেকে আয় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বাকি আয় এসেছে কৃষি, ঘর ভাড়া, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানতসহ অন্যান্য খাত থেকে। তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় ২ কোটি ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩৯২ টাকা।

এক বছর আগের তুলনায় ফজলে নূরের বার্ষিক আয় সামান্য কমেছে। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ১০ কোটি ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬২১ টাকা। তাঁর হাতে নগদ আছে ২৬ কোটি ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৫৭ টাকা। নিজের তিনটি ও স্ত্রীর একটি গাড়ি আছে। সব মিলিয়ে ১০৮ কোটি ৯৩ লাখ ৭৮ হাজার ৪৪৩ টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক তিনি। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে বন্ড, ঋণপত্র ও শেয়ার আছে ৪৩ কোটি ২৭ লাখ ৫৫ হাজার ৪০৪ টাকার। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত আছে ৩৫ কোটি ২২ লাখ টাকার। স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ আছে ৯ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৭২৭ টাকার।

এক বছরের ব্যবধানে ফজলে নূরের ৪ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে। ২০১৮ সালে তাঁর ১০৪ কোটি ৭১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ ছিল। এ ছাড়া নিজের নামে ১২ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ আছে। তাঁর স্ত্রীর নামে আছে প্রায় ১৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ। ফজলে নূরের দায়দেনার মধ্যে অগ্রিম বাড়ি ভাড়া বাবদ নেওয়া আছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৫০ টাকা। অতীতে তাঁর নামে দুটি মামলা থাকলেও খারিজ হয়ে গেছে।

ইশরাকের হাতে নগদ ৩৩ হাজার টাকা
দক্ষিণের বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন অবিভক্ত ঢাকার প্রয়াত মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। তিনি এমএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রিধারী এবং সাদেক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, বুড়িগঙ্গা ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট, বুড়িগঙ্গা ইন্ডাস্ট্রিজ ও দিগন্ত প্রকৌশলী লিমিটেডের পরিচালক। ডাইনামিক স্টিল কমপ্লেক্সের অংশীদার এবং ট্রান্স ও শিয়ানিক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী তিনি।

হলফনামা অনুসারে, বিভিন্ন উৎস থেকে ইশরাকের বার্ষিক আয় ৯১ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৯ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তাঁর বার্ষিক আয় ৪৫ লাখ ৮৫ হাজার ৪২২ টাকা বেড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামায় তাঁর বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ৪৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৭ টাকা।

এখন সব মিলিয়ে ইশরাকের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আছে ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭১ হাজার ৫৯৬ টাকার। তাঁর হাতে নগদ টাকা আছে মাত্র ৩৩ হাজার ১০৯ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ১৮ হাজার ৬৩ টাকা। আছে ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার শেয়ার। সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত আছে ৪২ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ টাকার। একটি অ্যাপার্টমেন্ট, জোয়ার সাহারায় নির্মাণাধীন ভবন এবং কৃষি ও অকৃষি জমি আছে।

ইশরাকের ৬৫ লাখ ৪৬ হাজার ৭৪৩ টাকার দায়দেনা আছে। এর মধ্যে তাঁর মায়ের কাছ থেকে ৬১ লাখ ৩৭ হাজার ২২২ টাকা ঋণ নিয়েছেন। আর ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া আছে ৫৯ হাজার ৫২১ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ আছে সাড়ে ৩ লাখ টাকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলা বিচারাধীন আছে।

১৬ প্রতিষ্ঠানের মালিক আতিকের গাড়ি নেই
ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম। তিনি বিকম পাস। তাঁর আছে ১৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এই ব্যবসায়ীর হাতে নগদ আছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৭৫৩ টাকা।
গত এক বছরে আতিকের বার্ষিক আয় বেড়েছে ২০ লাখ টাকা। কৃষি, বাড়ি বা দোকান ভাড়া, ব্যবসার পারিতোষিক, ব্যাংক সুদ ও মৎস্য খাত থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ১ কোটি ২৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৫ টাকা। স্ত্রীর বার্ষিক আয় ২২ লাখ ৫২ হাজার ৩৪১ টাকা।

আতিকুল ইসলাম সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৮৬ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯৮ টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক। আর ৬ কোটি ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার ২৪ টাকার স্থাবর সম্পদ আছে। তাঁর স্ত্রীর ২ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৭ টাকার অস্থাবর সম্পদ, ৩০ ভরি সোনা এবং ৮২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ আছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মেয়র পদে যখন উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তখন আতিকুলের অস্থাবর সম্পদ ছিল ৪ কোটি ৯৯ লাখ ৯১ হাজার ৩০২ টাকার। স্ত্রীর নামে ছিল ২ কোটি ৭৫ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ টাকা ও ৩০ ভরি সোনা। এক বছরে এই দম্পতির স্থাবর সম্পদ বাড়েনি বা কমেনি।

আতিকুল ইসলাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালক হওয়ার সুবাদে তিনটি বেসরকারি ব্যাংকে ৫৯১ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। তাঁর নামে কোনো মামলা নেই।

আয়, সম্পদ, ঋণ সবই বেড়েছে তাবিথের
বিএনপির উত্তরের প্রার্থী ব্যবসায়ী তাবিথ আউয়াল। তিনি ইনফরমেশন সিস্টেমস টেকনোলজির ওপর এমএসসি ডিগ্রি নিয়েছেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর জ্যেষ্ঠ ছেলে তিনি।

গত পাঁচ বছরে তাবিথের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আয় ও সম্পদ বেড়েছে। বেড়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণও। ২০১৫ সালে যখন তাবিথ মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন, তখন তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল ১৭ টি। এখন ৩৭ টি। বিভিন্ন খাত থেকে তাবিথের বার্ষিক আয় ৪ কোটি ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৯১ টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তাঁর বার্ষিক আয় বেড়েছে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তাবিথের ৪৫ কোটি ৬০ লাখ ৮ হাজার ৩১৭ টাকার অস্থাবর সম্পদ আছে। স্ত্রীর নামে আছে ৪ কোটি ৬০ লাখ ৯১ হাজার ৩৭৬ টাকার অস্থাবর সম্পদ। পাঁচ বছর আগের তুলনায় তাবিথের সাড়ে ১৪ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে।

তাবিথের হাতে নগদ আছে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৫১ হাজার ৫৮ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ৪১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৯৫ টাকা। বন্ড ও শেয়ার আছে ১৮ কোটি ৭৩ লাখ লাখ টাকার। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত আছে ৮ কোটি ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আছে একটি লেক্সাস জিপ।

তাবিথের স্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে ৪ একর কৃষিজমি, ১৬ একর অকৃষি জমি, দুটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং ১৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি খামার। আয় ও সম্পদের মতো তাবিথের ঋণও বেড়েছে। নিজের ঋণ আছে ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালক হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর ঋণ আছে ৩০২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পাঁচ বছর আগে তাঁর এ ধরনের ঋণ ছিল ১৭৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কোনো মামলা নেই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, এই নির্বাচনে একটি ভালো দিক হলো, দুই প্রধান দলের প্রার্থীরাই উচ্চশিক্ষিত। উচ্চশিক্ষিতরা রাজনীতিতে এলে একধরনের গুণগত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকে। এখন নির্বাচনী ব্যবস্থা এমন হয়ে গেছে যে ধন-সম্পদ না থাকলে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। দলের মনোনয়নও পাওয়া যায় না। নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রার্থীদের ব্যয় বিবরণী খতিয়ে দেখা এবং এ ক্ষেত্রে সংস্কার আনা।