বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন


টাইমস অনলাইনঃ
Published: 2018-08-16 00:19:33 BdST | Updated: 2018-11-13 10:18:05 BdST

যেসব বরেণ্য ব্যক্তির সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের স্থপতি রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম। বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আত্মপ্রকাশ ঘটে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে। তিনি ছাত্রাবস্থায় তৎকালীন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্র-ভাষা আন্দোলনের গোড়াতে তার অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কতগুলো আন্দোলন হয়েছেÑ প্রত্যেক আন্দোলনের পেছনে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিটি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। অথচ বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবন শেষ করতে পারেন নি। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সমর্থন করার অভিযোগে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা। ফলে তার উচ্চ শিক্ষার পথ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট যেদিন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের কথা ছিল সেদিন তিনি সপরিবারে নিহত এক সামরিক বিদ্রোহে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৪৭ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। বিএ-তে তার বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস। সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের পর তিনি ঢাকা চলে আসেন। তিনি সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। তার পিতা লুৎফর রহমানের ইচ্ছা ছিল পুত্র শেখ মুজিব আইনজীবী হোক। পিতার ইচ্ছা পূরণের জন্য শেখ মুজিব আইন বিভাগে ভর্তি হন। শেখ মুজিব ছিলেন এসএম হলের অনাবাসিক ছাত্র। তবে তিনি আড্ডা দিতেন ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে। সেখানেই তিনি সমকালীন রাজনীতি নিয়ে সহপাঠীদের সাথে আলোচনা করতেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের দুর্দশা দেখে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। ক্রমে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময়ে তার মধ্যে অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শুধু তাই নয়Ñ অন্যায়ের প্রতি তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন সংগ্রামী।

কলকাতা থেকে ফিরে ঢাকা শহরে পা দিয়েই বঙ্গবন্ধু এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখতে পান। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ায় মুসলিম লীগ সরকার তখন মধুচন্দ্রিমায় ব্যস্ত। অবাঙালিরা হিন্দুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলে লিপ্ত। ক্ষমতাসীন সরকার তা নীরবে সমর্থন করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের লাইসেন্স-পারমিট অবাঙালিরা একচেটিয়ে পাচ্ছে, ঢাকা শহরের অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড উর্দুতে লেখা হচ্ছে। মুসলিম লীগ সরকার তখন পূর্ব পাকিস্তানকে উর্দুভাষী প্রদেশে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা মোহাজের বাঙালিদের সাথে তাদের গলায় গলায় ভাব, পূর্ববঙ্গ থেকে যারা শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার জন্য কলকাতায় ছিল তাদের সাথে সরকার বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করেছে। সরকারি চাকরির পদ ফাঁকা থাকলেও সেখানে প্রদেশের বাঙালিদের নেওয়া হচ্ছিল না। ওদিকে সারাদেশে ভয়াবহ খাদ্যাভাব বিরাজ করছিল। বাংলার হতদরিদ্র মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছিল।

কলকাতায় অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধু যে রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জন করেন, তা দিয়ে তিনি ঢাকার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক গুরু হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। আর তার মানসজগতে ছিল প্রিয় নেতাজী সুভাষ বোস, শরৎ বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম। তাই পূর্ববঙ্গের হতাশাজনক পরিস্থিতি দেখে তার রাজনৈতিকসত্তা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ইতোপূর্বে সাংগঠনিক কাজ করে তিনি হাত পাকিয়েছিলেন। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি এসব কারণে প্রতিবাদী সংগঠন গড়ে তোলেন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী প্রত্যেক সরকারি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ফজলুল হক হল মিলনায়তনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হয়। এ সংগঠনের অন্যতম নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ সংগঠনটি গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেন। তার কালজয়ী সাংগঠনিক ছোঁয়ায় অচিরেই এ সংগঠনটি পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলের এক ছাত্রসভায় বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ওই সভায় বাংলা ভাষাকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণ দিবস হরতাল পালনের কর্মসূচি নেওয়া হয়।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল পালনের দিন ছাত্র-যুবকদের নিয়ে সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করার সময় বঙ্গবন্ধুসহ শতাধিক ছাত্র-যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার প্রতিবাদে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকা হয়। সে বছর ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান। তিনি আবার তার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ফিরে আসেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান এবং ছাত্র-যুবকদের গ্রেফতার ও তাদের নির্যাতন করার প্রতিবাদে পরদিন কলাভবনের আমতলায় একটি ছাত্র জমায়েতের আয়োজন করা হয়। সেদিন বঙ্গবন্ধু ওই ছাত্র-জমায়েতে সভাপতিত্ব করেন। সভাশেষে বঙ্গবন্ধু একটি মিছিল নিয়ে গণপরিষদের দিকে এগিয়ে গেলে মিছিলে পুলিশ হামলা করে। এতে বহু ছাত্র আহত হয়।

এ হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ দেশব্যাপী সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এক ছাত্রসভার আয়োজন করেন। ওই সভা থেকে ছাত্র-শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের আহ্বান জানানো হয়। এভাবে তিনি জাতীয় সমস্যার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।

ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু একজন সাহসী ও বিচক্ষণ ছাত্রনেতা হিসেবে সবার স্বীকৃতি লাভ করেন। আবার একই কারণে মুসলিম লীগ সরকারের তিনি বিরাগভাজন হন। সরকারপন্থি ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তাগণ তার প্রতি রুষ্ট হন। তারা তাকে প্রতিহত করার সুযোগ খুঁজতে থাকে। ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট করে। তখন চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হতো না। মুখের কথায় চাকরি হতো। আবার মুখের কথায় চাকরি চলে যেত। সে সময় চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের দৈনন্দিন কাজের কোনো সময়সূচি ছিল না। তাদের কোনো বাসস্থান ছিল না। যখন-তখন কাজের জন্য ডাকা হতো। যে কোনো কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হতো। তাদের সাথে কৃতদাসের মতো ব্যবহার করা হতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের এসব দাবির প্রতি বঙ্গবন্ধুসহ বহু ছাত্রনেতা সর্মথন জানান। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অচল হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমর্থনকারী ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিম সরকারের ইঙ্গিতে বঙ্গবন্ধুসহ ২৭ ছাত্রকে এজন্য বহিষ্কার ও জরিমানা করা হয়। প্রথম ছয়জনকে চার বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। পরের ১৫ জনকে তাদের আবাসিক হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরের চারজনকে ১৫ টাকা জরিমানা করা হয় এবং শেষের একজনকে ১০ টাকা জরিমানা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ১৫ টাকা জরিমানা করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে ছাত্ররা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য কর্তৃপক্ষ প্রথম ছয়জনকে বহিষ্কার ছাড়া সবার শাস্তি মওকুফ করে দেয়। তবে শাস্তি মওকুফকৃত ছাত্রদের লিখিত ক্ষমা চাইতে এবং ভবিষ্যতে ভালো হয়ে চলার জন্য লিখিত মুচলেকা দিতে বলা হয়। সবাই মুচলেকা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব গ্রহণ করলেও বঙ্গবন্ধু তা করেন নি। তিনি বহিষ্কৃত ছাত্রদের নিয়ে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করেন। তখন উপাচার্য ছিলেন ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, ছাত্রদের বহিষ্কারের পূর্বে কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল তাদের বক্তব্য শোনা। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া।

বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার দাবিতে ২৭ এপ্রিল দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হয়। পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। জেলে যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বলেন, আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসব। তবে ছাত্রনেতা হিসেবে নয়, একজন দেশকর্মী হিসেবে। মাত্র আড়াই বছর পর বঙ্গবন্ধু আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক কর্মী সমাবেশে আসেন। তবে এবার আসেন একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার ও গ্রেফতার হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন, তখন ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বঙ্গবন্ধুকে ওই দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। জেলে আটক থাকার সময় একটি বড় দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া ছিল তার প্রতি বিশাল আস্থা। এরপর তিনি ধীরে ধীরে নিজ যোগ্যতায় জাতীয় নেতায় পরিণত হন।

জাতীয় নেতা হয়েও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সব ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তার নির্দেশে মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। সত্তর দশকের শুরুতে ছাত্রলীগ যুগান্তকারী আন্দোলনের সূচনা করে। ইকবাল হল (জহুরুল হক হল) ছাত্রলীগের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২নং বাসভবন থেকে তার প্রতিটি নির্দেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হতো। ১৯৬৪ সালে সারাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হলে বহু নারী-পুরুষ এসে জগন্নাথ হলে আশ্রয় নেয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগের কর্মীরা জগন্নাথ হলের চারদিকে সর্বক্ষণ পাহারা দেয়। শরণার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করে তারা।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী) ময়দানে এক সংবর্ধনা সভায় বিপুল ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে শেখ মুজিবকে ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এদেশের মানুষ হাতে অস্ত্র তুলে নেয় এবং ৯ মাস মরণপণ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় তার ছাত্রত্ব কেড়ে দিয়েছিল, তাকে বহিষ্কার করেছিল, সে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে বরণ করার প্রস্তুতি নেয়। বঙ্গবন্ধু তখন শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন, তার মুকুটে তখন ‘জাতির পিতা’ শব্দটি শোভা পাচ্ছে। ১৯৭২ সালের ৬ মে তিনি তার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসেন। কলাভবনের সামনে বটতলায় বঙ্গবন্ধুকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সে সমাবেশে তার সামনে তার বহিষ্কারাদেশপত্রের কপিটি ছিঁড়ে ফেলা হয়। তাকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়। সেদিন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের ভালোবাসায় অভিভূত হন। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।

বঙ্গবন্ধু এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও দুবার আসেন। ১৯৭২ সালের শেষের দিকে ছাত্ররা অটোপ্রমোশনের জন্য শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখলে শিক্ষকদের উদ্ধারের জন্য তিনি আসেন। পরে আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান করা হয়। সে বছর আরেকবার ডাইনিংয়ে রুটির পরিবর্তে ভাতের দাবিতে ছাত্ররা উপাচার্যকে তার বাংলো বাড়িতে ঘেরাও করলে উপাচার্যকে উদ্ধারের জন্য বঙ্গবন্ধু প্রটোকল ছাড়া শুধু গেঞ্জি গায়ে চলে আসেন এবং ছাত্রদের রুটির পরিবর্তে ভাত দেওয়ার আশ্বাস দেন। ফলে ছাত্ররা ঘেরাও তুলে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি হল (স্যার এএফ রহমান হল) নির্মাণের জন্য তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মতিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর কাছে অনুরোধ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য তখন বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এত টানাটানির মধ্যেও বঙ্গবন্ধু নতুন এই হল নির্মাণে বরাদ্দ দেন। ফলে স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন একটি ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। মূলত বঙ্গবন্ধুর কারণেই তা সম্ভব হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি এবং পদাধিকার বলে চ্যান্সেলর। বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের খবরে সর্বত্র সাজ সাজ রব পড়ে যায়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। শিক্ষকগণ সেদিন বঙ্গবন্ধুর হাতে ফুল দিয়ে বাকশালে যোগ দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। ছাত্র-শিক্ষকগণ বঙ্গবন্ধুকে সামনে থেকে দেখা এবং তার বক্তৃতা শোনার জন্য দিনক্ষণ গুনছিল। কিন্তু ওই দিন খুব সকালে একদল বিপথগামী সৈন্য বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। এ সংবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার সব আয়োজন পড়ে থাকে। যারা সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল তারা আত্মগোপন করে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশূন্য এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এভাবেই বিয়োগান্তক অবসান ঘটে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের দিনটি।
লেখক :স্বপন কুমার দাস , সাংবাদিক

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।