দুই বোনের চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড অর্জন


Comilla
Published: 2020-01-27 12:21:39 BdST | Updated: 2020-02-17 16:04:27 BdST

সবকিছু ঠিক থাকলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান হবে কাল। ২৭ জানুয়ারি সমাবর্তনে যাঁরা চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পাবেন, তাঁদের মধ্যে আছেন দুই বোন—কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের আমেনা বেগম ও গণিত বিভাগের খাদিজা বেগম। দুজনই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। টানাপোড়েনের সংসারে মাদ্রাসাশিক্ষক বাবার অনুপ্রেরণায় এতটা পথ হেঁটেছেন। আমেনা ও খাদিজার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের আরও ১১ জন ওই পুরস্কার পাচ্ছেন।

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার নলুয়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ। তাঁর সামান্য বেতনের টাকায় তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। খাদিজা বেগম সবার বড় ও আমেনা বেগম দ্বিতীয়। পিঠাপিঠি বোন। মাদ্রাসাশিক্ষক বাবার পক্ষে সব ভাইবোনের খরচ জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য ছিল। তখন খাদিজা পাঁচটি ও আমেনা দুইটি টিউশনি করতেন। সেই টাকায় নিজেদের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। ছোট ভাইবোনদের জন্যও টাকা পাঠাতেন। চার বছরের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর তাঁরা প্রত্যাশিত ফল পেয়েছেন।

খাদিজা বেগম ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে গণিত বিভাগ থেকে সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৪ পেয়েছেন। বলা বাহুল্য, স্নাতকোত্তরে তাঁর ব্যাচে তিনিই প্রথম। স্নাতকে তিনি সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৩ দশমিক ৮০ পেয়ে বিভাগে দ্বিতীয় হন। বর্তমানে ঢাকার প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি বুয়েটে এমফিলও করছেন। স্নাতকোত্তরে বিজ্ঞান অনুষদের সেরা ফল করায় তিনি চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। খাদিজা বলেন, ‘অনেক কষ্ট, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের পর এমন সাফল্য এসেছে। ছোটবেলা থেকে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল, সেটি পূরণ হয়েছে। তবে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার আনন্দ অন্য রকম। চেনা ক্যাম্পাসে থাকার মজা আলাদা।’ খাদিজার স্বামী মেহেদী উল হাসান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) গণিত ও পরিসংখ্যানের প্রভাষক। স্ত্রী ও সহপাঠীর এমন সাফল্যে দারুণ উদ্ভাসিত মেহেদী। বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের কাছ থেকে সম্মাননা পাওয়াটা অনেক গৌরবের।’

এদিকে ছোট বোন আমেনার সাফল্য আরও বড়। প্রকৌশল অনুষদ থেকে আমেনা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটিতেই চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন। এর আগে আমেনা ২০১৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক (২০১৬ সালের জন্য) পেয়েছেন। ২০০৯-১০ সালে স্নাতকে সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৬ পেয়ে প্রথম হন তিনি। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ–৪–এর মধ্যে ৪ পেয়েছেন। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আমেনা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তাঁরও স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় মহাখুশি তিনি। আমেনা অবশ্য বললেন, ‘আমার চেয়ে আপু (খাদিজা) বেশি মেধাবী।’ আমেনার স্বামী রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মো. সারোয়ার আহমাদ। স্ত্রীর সাফল্যে তিনিও খুব আনন্দিত।

খাদিজা ও আমেনার বাবা বরুড়ার এমরানিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, ‘সন্তানদের ভালো পড়াশোনার জন্য সব সময় আমি তৎপর ছিলাম। এখন ওদের দেশকে দেওয়ার পালা। আমি ওদের বিজ্ঞান বিভাগে পড়িয়েছি। ওরা সেরাটাই দিয়েছে। মেয়ে হয়ে পিছিয়ে থাকেনি।’

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর আগামীকাল ২৭ জানুয়ারি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো সমাবর্তন হচ্ছে। এতে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ১৩ জন শিক্ষার্থীকে চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড ও ৫২ জনকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তাঁদের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রথম সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার জন্য ২ হাজার ৮৮৮ জন নাম নিবন্ধন করেছেন।

আরও যাঁরা চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন

অর্থনীতি বিভাগের নয়ন তারা, মার্কেটিং বিভাগের নাসরিন আক্তার, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের রাবেয়া জামান, একই বিভাগের মোহাম্মদ কামরুল হাসান, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিসংখ্যান বিভাগের উম্মুল খায়ের, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের রিপা আক্তার। দুই বোন ছাড়াও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যাঁরা চ্যান্সেলর পদক পাচ্ছেন তাঁরা হলেন অর্থনীতি বিভাগের মো. মাসুদ রানা, গণিতের পারভীন আক্তার, মাহিনুর আক্তার ও পদার্থবিজ্ঞানের সানজিদা হক।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের cপর জানতে পারলাম প্রতিষ্ঠার পর এখানে সমাবর্তন হয়নি। পরে উদ্যোগ নিয়েছি। এখন মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা।’