ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: পপুলিস্ট আইডিয়া নয়, প্রয়োজন রূপকল্প


ঢাবি টাইমস
Published: 2020-07-01 11:22:39 BdST | Updated: 2020-08-15 13:54:57 BdST

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যতিক্রম। যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচণ্ড গর্বের, অহংকারের আর স্পর্ধার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের সাথে জড়িত। বৃটিশ উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়িত। শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন নয়, আন্দোলনের নিয়ন্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটিয়েছে। যুগে যুগে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধ্যান-ধারণা গড়ে উঠেছিল তার কবর রচনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আমরা লাল-সবুজের যে পতাকাকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই সেই পতাকার উত্থান ইতিহাসের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। আমরা যে গাই 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'- এই গানটি জাতীয় সঙ্গীত হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান। যুগে যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসব ভূমিকা পালন করেছে। এই বিশেষত্ব, এই নতুনত্ব, এই অভিনবত্ব পৃথিবীর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। সে জায়গা থেকে এটি ব্যতিক্রমী। তাই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যদি একপাল্লায় তুলনা করা হয় তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক মূল্যায়ন হবে না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিশেষত্ব, সে আঙ্গিকেই আমাদের দেখতে হবে।

র‍্যাংকিং এ বর্তমানে যে অবস্থা সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্মানজনক নয়। এটি স্বীকার করতে হবে। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হবে না। বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে মানে উন্নীত হয়েছে, গবেষণা, পঠন-পাঠন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বা বিশ্বে জ্ঞান উৎপাদন-পূণরুৎপাদনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে ভূমিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে পর্যায়ে নেই।

রাজনৈতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমাদের যে অর্জন সেটি নিশ্চিতভাবেই যুগ যুগ থাকবে। অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, রাজু ভাস্কর্য প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদের সে শিক্ষা দিবে। শহীদ মিনার সব সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মাথা নত না করার শিক্ষা দিবে। কিন্তু গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী করে, গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপজীব্য ধরে ছাত্র রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিক হতে হবে, শিক্ষক রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিক হতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক রাজনীতিকে প্রাসঙ্গিক হতে হবে। জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত সকলের একটি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে, অঙ্গীকার থাকতে হবে। সে জায়গা থেকেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাকে সামনে এনেছে; যাতে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার আঙ্গিকে ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তন ঘটতে পারে, নবায়িত ধারণা আসতে পারে, শিক্ষক রাজনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটিকে তাই মৌলিক ধারণা হিসেবে নিতে হবে।

গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান যে বাজেট তাতে বড় একটি উল্লম্ফন প্রয়োজন। ৮০০ কোটি টাকার বাজেটকে যদি ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকায় রুপান্তরিত করা যায় তাহলে বড় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মৌলিক সংকট হল আবাসন সংকট। এই সংকট সমাধান না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। সেটি সম্ভব হলে ছাত্র রাজনীতিতে যে নেতিবাচক গুণ রয়েছে, সকল সংগঠনের মধ্যে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার যে প্রবণতা রয়েছে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটির সাথে সংগঠনগুলো মানিয়ে নিতে বাধ্য হবে। নতুন আবাসিক বাস্তবতাকে ভিত্তি করে ছাত্ররাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, পরিচালিত হবে। ফলে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রভুত উন্নয়ন সম্ভব হবে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যে অনুপাত রয়েছে তাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন প্রয়োজন। বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালগুলোতে দশ-বারোজন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছে, সেখানে আমাদের সংখ্যাটা অনেক বেশি। শিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে বা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার্থী সংখ্যা পুনঃনির্ধারণ করে এটি নিশ্চিত করতে হবে।

সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ব্যতিব্যস্ততার কারণে আমাদের শিক্ষকরা পঠন-পাঠনে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। এতে করে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায় না। শিক্ষকদের কাজ শুধুমাত্র পঠন-পাঠনে সম্পৃক্ত হওয়া নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে স্কুল বা কলেজ শিক্ষকদের পার্থক্য এটাই যে এখানে তারা গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত হবে। সারাদিন যদি ক্লাস নিতেই ব্যস্ত থাকতে হয় তাহলে শিক্ষকদের গবেষণার কাজে মনোযোগী হওয়ার সুযোগ কম। ফলে সন্ধ্যাকালীন কোর্সগুলোর ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রণোদনা, সমঝোতা স্মারক ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসিদ্ধ শিক্ষক-গবেষকদের আনতে হবে। এটি কঠিন হলে বহির্বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙালি যেসকল স্বনামধন্য শিক্ষক-গবেষক রয়েছেন তাঁদের এখানে শিক্ষকতার জন্য আনতে হবে। ফলশ্রুতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন সাধিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রয়োজন। পূর্বাচলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের দেয়া জায়গায় যদি দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ করা যায় তাহলে 'টিচিং ইউনিভার্সিটি' হিসেবে এখন যে কর্মকাণ্ড রয়েছে সেগুলো বর্তমান ক্যাম্পাসে চালু রেখে মাস্টার্স, এমফিল কিংবা পিএইচডি ও আনুষঙ্গিক উচ্চতর গবেষণার কাজগুলো দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে নেয়া যেতে পারে। সেখানে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর গবেষণার মাধ্যমে একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হবে। টিচিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা পালন করবে বিদ্যমান ক্যাম্পাসে, রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হিসেবে নতুন ক্যাম্পাস ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে গবেষণায় খরা কাটিয়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একটি সম্পর্ক প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে গবেষণায় অর্থায়নের সমস্যাটি সমাধান করা সম্ভব হবে। আধুনিক বিশ্বে যেসব গবেষণা হচ্ছে সেসব বিষয়ে আমদের বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণা করতে পারবে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কী ধরণের কর্মসংস্থান প্রয়োজন, মানবসম্পদ প্রয়োজন সবকিছু তৈরি করা সম্ভব হবে যদি সঠিকভাবে ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্ক তৈরি করা যায়।

এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি, আদানপ্রদান-লেনদেন, গবেষণার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লিডারশিপ অবশ্যই ভিশনারি হতে হবে। প্রশাসনে যারা নেতৃত্ব দেন তারা যদি উপযুক্ত নেতৃত্ব প্রদান করেন, তাহলে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থেই বৈশ্বিক মানে উপনীত হতে পারবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসেছে। এখন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাতারাতি কিছু অর্জন করার সুযোগ নেই। রাতারাতি সমাধানের কথা যদি বলা হয়, তাহলে মূল সমস্যার সঠিক সমাধান হবে না। নামমাত্র পপুলিস্ট আইডিয়া দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সংকট সমাধান করতে, বৈশ্বিক মানে উপনীত করতে একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন, একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন, একটি ইশতেহার প্রয়োজন, একটি রূপকল্প প্রয়োজন। সেটি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক মানে উন্নীত হতে পারবে।

- সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

দ্রষ্টব্যঃ গত ২৫ জুন 'ক্যাম্পাস টাইমস প্রেস' কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকার থেকে অনুলিখন।