আমি ‘দুশ্চরিত্রা’ হলে মামুন-সোহাগ কী: নূরকে প্রশ্ন ঢাবি ছাত্রীর


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Published: 2020-10-14 08:00:09 BdST | Updated: 2020-10-21 05:12:34 BdST

ধর্ষণ মামলার বাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ‘দুশ্চরিত্রা’ বলায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তুরিন আফরোজ।

ফেইসবুক লাইভে এসে ধর্ষণ মামলার বাদীকে ‘দুশ্চরিত্রা’ আখ্যায়িত করায় কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর। ওই বক্তব্যের জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিও উঠেছে একটি সমাবেশ থেকে।

নূরসহ মামলার বাকি চার আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে এখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রীও তার এই বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তরের ওই ছাত্রী মঙ্গলবার রাতে বলেন, “তিনি (নুরুল হক নূর) যা বলেছেন সব বানোয়াট, মনগড়া কথা। এরপরেও তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে যদি ধরেও নেই আমি দুশ্চরিত্রা, তাহলে তার সহযোগী সোহাগ বা মামুন কী? তারা কি চরিত্রবান? নূর তো শুরুতে বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমি ষড়যন্ত্র করেছি। ধর্ষককে রক্ষার জন্য আন্দোলন করেছে তারা। এখন আবার মামুন-সোহাগের দায় নেবে না বলছে।

ধর্ষক ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার দাবিতে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে একাই অনশনে বসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী, দুই দিন পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফের সেই জায়গায় এসে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ধর্ষক ও তাদের সহযোগীদের গ্রেপ্তার দাবিতে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে একাই অনশনে বসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী, দুই দিন পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ফের সেই জায়গায় এসে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

“ডাকসুর ভিপি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা ডাকসুর ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে। তার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে তিনি কতটা জঘন্য চরিত্রের মানুষ। আমি তার এই বক্তব্যের বিচার চাই। আমি আর কত মামলা করব? প্রতিনিয়ত তারা আমার চরিত্র নিয়ে কটূক্তি ও অপপ্রচার করছে। আমি যথাপোযুক্ত বিচার চাই।”

গত ২১ ও ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর লালবাগ ও কোতোয়ালি থানায় ধর্ষণ, অপহরণ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চরিত্রহননের অভিযোগে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরসহ ছাত্র অধিকার পরিষদের ছয় নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ছাত্র অধিকার পরিষদের কর্মী হওয়ায় এই পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনের সঙ্গে তার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ হয়। সেই সম্পর্কের জের ধরে ৩ জানুয়ারি লালবাগের বাসায় নিয়ে তাকে ‘ধর্ষণ করেন’ মামুন। তখন সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হাসান সোহাগ তার পাশে দাঁড়ান। চিকিৎসায় সহায়তা করার পর মামুনকে খুঁজে পেতে সাহায্যের কথা বলে চাঁদপুরে নিয়ে ফেরার পথে নাজমুল সোহাগও লঞ্চের মধ্যে তাকে ‘ধর্ষণ করেন’। পরে ঘটনার প্রতিকার চেয়ে তিনি নূরসহ তাদের অপর সহকর্মীদের কাছে গেলে প্রথমে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও পরে ‘বাড়াবাড়ি করলে চরিত্রহননের’ ভয় দেখান।

তার মামলা দায়েরের ১৭ দিন পরেও আসামিদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে রাজু ভাস্কর্যে পাদদেশে অনশন শুরু করেন ওই ছাত্রী। এরমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লে শনিবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে।

রোবাবার রাতে রাজধানীর আজিমপুর ও মগবাজার থেকে মামলার দুই আসামি সাইফুল ইসলাম ও নাজমুল হুদাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

আসামি ধরতে মধ্যরাতে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের অভিযানের মধ্যে ফেইসবুক লাইভে এসে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় কথা বলেন নুরুল হক নূর। এক পর্যায়ে ওই ছাত্রীকে ‘দুশ্চরিত্রাহীন’ বলেন তিনি।

রোববার মধ্যরাতে ফেইসবুক লাইভে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর ধর্ষণের মামলা নিয়ে কথা বলেন নুরুল হক নূর।

মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে নূর বলেন, “ভিক্টিমের পরিচয় তো ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের না কি ছাত্রী…। তার ভাই বলেছিল, নাজমুল হাসান সোহাগ তাদের বাসায় যাওয়া-আসা করত। তাদের সাথে বিয়ের কথাবার্তাও পাকাপোক্ত হয়েছিল।

“নাজমুল সোহাগের সাথে যে একটা ছবি ফেইসবুকে ভাইরাল হয়েছে আপনারা দেখেছেন, লঞ্চের কেবিনে হাসিখুশিভাবে। যে লঞ্চের কেবিনে মেয়েটি ধর্ষণের অভিযোগটি এনেছিল, সেই লঞ্চের কেবিনে। একেবারেই হাস্যরসাত্মক, ছিঃ! আমরা ধিক্কার জানাই যে, এত নাটক করছে, যেই দুশ্চরিত্রাহীন। যে ধর্ষণের নাটক করছে। স্বেচ্ছায় একজন ছেলের সাথে বিছানায় গিয়ে, লঞ্চে হাসিখুশিভাবে।”

তার এই বক্তব্যের সমালোচনা চলছে নানা মহল থেকে। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে বিকালে রাজু ভাস্কর্যে অনশনরত ওই ছাত্রীর সাথে সংহতি জানিয়ে সেখানে সমাবেশে মিলিত হন যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট, পূর্ণিমা রানী ফাউন্ডেশন, ঐক্য একাত্তরসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

নূরের এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে সমাবেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, “আমরা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আইন পেতে যাচ্ছি। কিন্তু শুধু আইন করেই সব কিছু হয় না৷ আইনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন দরকার। যেখানে আমরা একজন নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছি, সেখানে একজন নির্লজ্জ কুলাঙ্গার তাকে চরিত্রহীন বলছে৷

“এই যে ধৃষ্টতা সে দেখাচ্ছে, সেই নুরুলের সাহস আসলে কোথায়? আমি জানি, আইন তার নিজের গতিতে চলবে৷ একজন নির্যাতিত নারীকে দুশ্চরিত্রা বলার দায়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আটক করা না হলে আমরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব।”

সমাবেশে যোগ দিয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান বলেন, “নুরুল সেই সমাজের প্রতিনিধি যে সমাজ নারীকে ঘরে বন্দি করতে চায়৷ সরকার ঠিক কিসের ভয়ে নুরুলসহ ধর্ষকদের কেন গ্রেপ্তার করছে না? ধর্ষণের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল করতে হবে, প্রত্যেক থানায় নারী সেল গঠন করতে হবে, আইন সংশোধন করতে হবে৷”

অবিলম্বে নূরের গ্রেপ্তার দাবি করে ‘অপরাজেয় বাংলা’ নামের সংগঠনের সদস্য সচিব এইচ রহমান মিলু বলেন, “ধর্ষণের এই ঘটনা নিয়ে অপরাজনীতি করার চেষ্টা হচ্ছে৷ ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে থাকলে নুরুল কেন নয়? নুরুলের ক্ষেত্রে কেন আইনের শাসন কাজ করে না? সে কি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নাকি প্রধান বিচারপতি? নুরুলের পক্ষে এখন জামায়াত ও বিএনপি কাজ করছে। সব ধর্ষক গ্রেপ্তার হয়, নুরুল কেন গ্রেপ্তার নয়?”

গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক নবেন্দু নির্মল সাহা বলেন, “নারীকে চরিত্রহীন বলে ব্যারিস্টার মাইনুল হোসেনকে যদি জেলে যেতে হয়, তাহলে একই অপরাধে নুরুকে গ্রেপ্তার কেন নয়?”

সমাবেশে যোগ দিয়ে ২০০১ সালে ধর্ষণের শিকার পূর্ণিমা রাণী শীল বলেন, “নিপীড়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষককে জুতাপেটা করে শাস্তি দেওয়া উচিত। এখনও মামলার জন্য মাঝেমধ্যে আমাকে আদালতে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। আমি তার (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী) পাশে আছি। নুরুলসহ সব আসামিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে৷”

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে অভিবাসীদের প্রতি মালয়েশিয়া সরকারের আচরণ নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলায় গত অগাস্টে সেদেশে কারাবরণ করতে হয়েছিল রায়হান কবিরকে।

এই সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, “আমি মালয়েশিয়ায় বাংলার মেহনতি মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে কারাভোগ করেছি, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি। আজকে সেই আমাকেই নিজের দেশে ব্যানার হাতে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে। দেশে ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখে হতভম্ব ও লজ্জিত হই। আমিও পুরুষ, লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে৷

“সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি সব ধরনের ধর্ষকদের বিরুদ্ধে। যখন যৌক্তিক আন্দোলনকে রাজনৈতিক মোড়ক দেওয়া হয় তখন আমার কষ্ট হয়। ধিক্কার জানাই, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুলকে, যিনি লাইভে এসে নির্যাতিত ছাত্রীকে নিয়ে খারাপ কথা বলেছেন। এটা পটেনশিয়াল ধর্ষকের লক্ষণ৷”

bdnews24.com