স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে নিয়োগ দিতে মরিয়া ভিসি শহীদুর


খুলনা
Published: 2020-10-17 12:56:50 BdST | Updated: 2020-10-21 05:41:30 BdST

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুকৃবি) জনবল নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা শিথিল করেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। এছাড়া জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে খুলনার স্থানীয় প্রার্থীদের কৌশলে বাদ দিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ভিসির নিজ জেলা নোয়াখালী, রেজিস্ট্রারের (ভারপ্রাপ্ত) নিজ জেলা নরসিংদী এবং ভিসির স্ত্রীর নিজ জেলা বরিশালের লোকজনকে একচেটিয়া নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে পছন্দের লোক নিয়োগ দিয়ে একটি চক্র বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট অনেকেরই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৫ জুলাই সংসদে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয়। এরপর ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খান। তিনি ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর রেজিস্ট্রার পদের বিপরীতে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী (অ্যাডহক) ভিত্তিতে নিয়োগ দেন ডা. মো মাজহারুল আনোয়ারকে। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাতজন সহকারী অধ্যাপক, একজন সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং ১৪ জন প্রভাষকসহ ২৯ ধরনের পদের জন্য ৭৬ জন জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেই থেকেই অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ ও খুলনার স্থানীয় প্রার্থীদের কৌশলে বাদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অর্থ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং পরিবার ও আঞ্চলিকতাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অভিযোগের তীর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও নিয়োগ বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ড. শহীদুর রহমান খানের দিকে। নিয়োগ পেতে অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকসহ বিভিন্ন পদের জন্য ১২ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার অনিয়ম-দুর্নীতির এ প্রক্রিয়া সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন বলে ক্যাম্পাসে জনশ্রুতি রয়েছে। যার বিরুদ্ধে রংপুরের এনজিও আরডিআরএসের সিএলপি প্রকল্প এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিকালে নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।

চলতি বছরের ২৭ জুলাই ১৯ জন অধ্যাপক, রেজিস্ট্রার, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ ৩০ ধরনের পদে ৬৩ জন জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচয়ে ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার স্বাক্ষরিত ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে কৌশলে একের পর এক বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১৫ অনুযায়ী রেজিস্ট্রার সার্বজনীন পদ হলেও ‘কৃষি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর’-এর শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা দেশের অন্য কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়নি। আর রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচয়ে ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিজেই সেই পদের জন্য প্রার্থী হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নৈতিকতার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া এ পদে আবেদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত উল্লেখ থাকলেও মাজহারুল আনোয়ারের বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির অভিজ্ঞতা মাত্র ৯ বছর ৩ মাস। তিনি ২০০৯ সালের ১ জুলাই সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার পাতার বায়োডাটা দিয়ে কোনো আবেদনপত্র ছাড়াই সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এরপর দুই বছরের মাথায় কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ও লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই ওই পদে তাকে স্থায়ী করা হয়। শর্তের বহর পার করে খুকৃবিতে ১১ জন প্রার্থী রেজিস্ট্রার পদের জন্য আবেদন করলেও বাছাই কমিটির মাধ্যমে আটজন প্রার্থীকে বিভিন্ন অজুহাতে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ আবেদনের যোগ্যতা না থাকলেও যাচাই-বাছাইতে টিকে আছেন ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার। অন্য যে দুই প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ে টিকে আছেন তারা দুজনই ‘ডামি প্রার্থী’। তাদের মধ্যে একজন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবদুল আউয়াল এবং অন্যজন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েরই পরিচালক (জনসংযোগ ও প্রকাশনা) মো. আনিসুর রহমান। আগামীকাল রবিবার রেজিস্ট্রার পদের পরীক্ষা হবে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির স্ত্রী ছাতক উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌসী বেগম অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা পদে কর্মরত ভিসির ছেলে এবং আরেক মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের জন্য আবেদন করেছেন। এভাবে পোষ্যদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বোর্ডের প্রধান থাকায় ভিসি শহীদুর রহমান খানের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, আগামী দীর্ঘসময় খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হাতের মুঠোয় রাখতে রেজিস্ট্রার পদে ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপপরিচালক মোহা. আবদুল কাদের জিলানী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবদুল আউয়াল এবং পরিচালক (জনসংযোগ) পদে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিআরও মো. আনিসুর রহমানকে গোপন পরিকল্পনায় নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া ভিসির স্ত্রী ফেরদৌসী বেগমকে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার পর অনুষদের ডিন হিসেবে বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। আর এ ‘নিয়োগ সিন্ডিকেটের’ পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের একজন সদস্য ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক।

তবে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা-বানোয়াট। কর্র্তৃপক্ষের আদেশ পেয়েই আমি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। আমি প্রার্থী হলেও এখানে যাচাই-বাছাই কমিটি রয়েছে, যারা সবশেষ সিদ্ধান্ত দেবেন।’

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. শহীদুর রহমান খান রেজিস্ট্রার নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত শিথিলের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘যেহেতু আমার পোষ্যরা এখানে প্রার্থী হয়েছে, সেহেতু আমি ওই নিয়োগ বোর্ডের প্রধান পদে থাকব না।’

খুকৃবিতে জনবল নিয়োগে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও ভিসির স্ত্রীর আবেদনের বিষয়টি নৈতিকতা পরিপন্থী। আবেদন করতে হলে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থেকে তাকে কিছুদিনের জন্য হলেও সরে যাওয়া উচিত ছিল। তবে নির্ধারিত অভিজ্ঞতা পূর্ণ না করেই কীভাবে আবেদন করল এবং বাছাই কমিটি কীভাবে তার আবেদন গ্রহণ করল সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে স্ত্রী যেহেতু একজন প্রার্থী তাই নিয়োগ বোর্ডের প্রধান ও সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম থেকে ভিসিরও সরে যাওয়া উচিত।’