বিশ্বজুড়ে মাহে রমজানের সংস্কৃতি


Wali Khan Raju/ Islamic Commentator
Published: 2019-05-31 04:47:05 BdST | Updated: 2019-10-18 04:29:27 BdST

পবিত্র রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের মাস। রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস। মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বোচ্চ সম্মানের এই মাস ইবাদাতের পাশাপাশি উম্মাহ হিসেবে মুসলিমদের একতাবদ্ধতার জানান দেয়।

এ মাস সম্বন্ধে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ঘোষণা হয়েছে, ‘শাহরু রমাদান আল্লাজি উনজিলা িফহিল কোরআন, হুদাললিন্নাসি ওয়া বায়্যিনাতিম মিনাল হুদা ওয়াল ফুরকান। অর্থাৎ, রমজান মাস এমন মাস যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে, আর যা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শকরূপে ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা ও সত্যের পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে এ ধরায় এসেছে। (সূরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এই পৃথিবীতে হরেক রকমের ভাষা,নানা জাতি, শতাধিক ধর্ম, হাজারো সংস্কৃতি বিদ্যমান। তবে ইসলাম ধর্মের মত বৈশ্বিক প্রসার আর কোন মত, পথ, ধর্মের হয় নি।
ভাষার ভিন্নতা, পোশাক আষাকে ভিন্নতা, সীমান্তে ভিন্নতা, খাদ্যরুচিতে ভিন্নতা স্বত্তেও যেই মাসটি বিশ্বের প্রায় দেড়শত মিলিয়ন মানুষকে একই সুতোয় গেথে দিতে পারে সেই মাসটি হল পবিত্র রমজান। রমজান মাস পালনে মুসলিম উম্মাহর বিধানবলী এক হলেও সময়ের তারতম্য, খাদ্যভ্যাস, কৃষ্টি কালচার ভেদে সীমান্ত পেরিয়ে কিছু প্রথা , নানাবিধ বৈশিষ্ট্য পরীলক্ষিত হয়।

*সউদি আরব -
সউদি আরব বা প্রাচীন হেজাজ ভুমি মুসলিম উম্মাহর জন্য পবিত্র ভুমি। ইসলামের যাত্রা শুরু হয় এই হেজাজ অঞ্চলের মক্কা নগরী থেকেই। আর তাই ঐতিহাসিকভাবেই সউদি আরবের কিছু গুরুত্ব রয়েছে। রমজানে পুরো সউদি আরবে এক উৎসবের ঢেউ দৃশ্যমান হয়। ইবাদাত বন্দেগী, দান সাদকাহ, শিশুদের গিফট প্রদান, আলোকসজ্জা সহ নানা রঙে সজ্জিত থাকে পুরো হেজাজ অঞ্চল। রমজানের পূর্বে পবিত্র শাবান মাস থেকেই প্রস্ততি চলে রমজান মাসের। রমজান মাস এর আগমণ হলেই রিয়াদ, জেদ্দা সহ বড় বড় শহরগুলোতে ড্রোন বিমানের সাহায্যে শহরের বিল্ডিং গুলোতে রমাদ্বান কারীম চিত্রিত করা হয়৷ বড় বড় রাস্তা,বিল্ডিং এ আলোকসজ্জা করা হয়।
পবিত্র নগরী মক্কা মদীনাতে রমজানে অভূতপূর্ব দৃশ্য নজরে আসে। মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী সহ বিভিন্ন মসজিদে রোজাদার মুসল্লীদের ইফতার করানোর জন্য স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যস্ত থাকেন , উমরা আদায় করতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলিমদের জন্য মদীনাবাসী হৃদয়গ্রাহী আতিথেয়তা প্রদর্শন করেন, মক্কা ও মদিনাবাসী শিশুরা মুসল্লীদের মাঝে বিনামুল্যে খাবার, পানীয়, জুস, দই, চিকেন বিতরণ করেন।
আল আহসা অঞ্চলে রমজানের আগমনী চাঁদ উদিত হলেই শিশুরা সেজে গুজে বড়দের থেকে সালামী আদায় করেন, প্রতিবেশীরা পরস্পর খাবার বিনিময় করেন, শিশুরা সেজে গুজে প্রতিবেশীদের থেকে চকলেট, মিষ্টান্ন সংগ্রহ করে।
এছাড়া আন নাহদা অঞ্চলে রমজান উপলক্ষে গাবাগা নামক সাংস্কৃতিক উৎসবের প্রচলন রয়েছে।
গাবাগা উৎসবে শিশু ও মহিলারা নিজেদের মধ্যে খাবার, পোশাক পরিচ্ছেদ উপহার বিনিময় করেন।

*ইয়েমেন-
ইয়েমেন ইসলামী ইতিহাসে একটি প্রসিদ্ধ দেশ। বর্তমানে যুদ্ধ বিদ্ধস্ত এই দেশটিতে বহু সাহাবার স্মৃতি রয়েছে।
ইয়েমেনের মুসলমান ব্যবসায়ীগন রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যের দাম সাধ্যমত হ্রাস করেন। রমজান উপলক্ষে ইয়েমেনে 'খুশকা ' নামক খাদ্য আইটেম ব্যপক জনপ্রিয়, খুশকা অনেকটাই বিরিয়ানীর মত, যাতে চিকন চাল, মুরগী বা চিকেন এর মিশ্রণ থাকে।
এছাড়া ইফতারে সামবুসিক নামক খাবারের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি যা মুলত মাংস, চীজ মিশ্রিত।
এছাড়া সাফুত নামক এক প্রকার খাবার ও বেশ জনপ্রিয়।
বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিতে মহামারী, বেকারত্ব, দুর্ভিক্ষ,দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি স্বত্তেও মুসলমানরা মুসলিম উম্মাহর সাথে তাল মিলিয়েই রোজা পালন করছেন।

*মধ্যপ্রাচ্য -
মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশ আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, ব্রুনাই,্জর্দান প্রভৃতি দেশগুলো বিশ্বঅর্থনীতিতে অন্যতম চালিকাশক্তি। অসংখ্য অমুসলিম পর্যটক, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী এসব দেশগুলোতে ভীড় করেন। পবিত্র রমজান মাসে এসব দেশগুলোতে সাধারণের চেয়ে ভিন্ন চিত্রে দেখা যায়৷ শাবান মাস থেকেই রমজান মাসকে স্বাগত জানানো হয় এসব দেশগুলোতে। উপসাগরীয় এসব দেশগুলোতে মধ্য শাবানে নফল ইবাদতের পাশাপাশি 'হাগ আল লায়লা ' খুবিই প্রসিদ্ধ। আরব আমিরাত, কাতার,কুয়েত,বাহরাইন,ওমানে মুলত এই হাগ আল লাইলার রাতে শিশুরা সুন্দর পোষাকে আশেপাশে প্রতিবেশীদের বাসায় যায়, প্রতিবেশীদের বাসা থেকে তারা চকলেট, বাদাম, উপহার সামগ্রী ইত্যাদি উপহার পেয়ে থাকে।
রমজানের প্রথম ইফতার পরিবার প্রধান বা বংশীয় প্রধান তথা দাদার সাথে করার রেওয়াজ মধ্যপ্রাচ্যে পরিলক্ষিত হয়।
রমজান উপলক্ষ্যে আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমানে প্রকাশ্যে গানবাজনা নিষিদ্ধ থাকে, সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট, নাইটক্লাব, বার বন্ধ থাকে।
পাবলিক প্লেইসে দিনের বেলার খাবার গ্রহণ, পানাহার আইনত অবৈধ। ওমানে রমজানে দিনের বেলায় পাবলিক প্লেইসে কেউ পানাহার,খাবার গ্রহণ করলে এর শাস্তি তিন মাসের কারাদন্ড, কুয়েতে এক মাসের কারাদন্ড এবং আরব আমিরাত, কাতারে নগদ অর্থ জরিমানার বিধান রয়েছে।
পুরো রমজান মাস জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যের স্কুল কলেজ বন্ধ থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে জুড়ে
ইফতারের সময় কামানের গোলা নিক্ষেপের মাধ্যমে উচ্চ আওয়াজ করে ইফতারের সময় জানান দেয়া হয়।
যাকে ' ইফতার ক্যানন' বা 'মিদফা আল ইফতার ' বলা হয়। রমজানে প্রধান সড়কগুলোতে রমজান উপলক্ষে আলোকসজ্জা থাকে। মুসলিমদের মাঝে দান সদকা করার প্রবণতা খুব বেশি দৃশ্যমান হয়। আরব আমিরাত, কাতার সহ বিভিন্ন দেশ বিশ্বের দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করে। মসজিদগুলোতে তারাবীহ সালাতের পাশাপাশি কিয়ামুল লাইল এর ব্যবস্থা থাকে। রমজানে আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতে আন্তর্জাতিক কুরআন তিলাওয়াত এর আয়োজন করা হয় যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাফেজে কুরআনরা অংশগ্রহণ করে থাকে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ইসলামি স্কলারদের নিয়ে মাসব্যাপী সেমিনারের আয়োজন করা হয়৷

ইফতার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে খেজুর, দই এর পাশাপাশি 'হারিস' নামক স্যুপ বেশ জনপ্রিয় যেই স্যুপ গম ও মাংস মিশ্রিত।
এছাড়া চাল ও মাংস মিশ্রিত মাজবুস, মাংস, রুটি মিশ্রিত থারিড, মাংসের কাবাব, শর্মা, লোকমা নামের একপ্রকার মিষ্টান্ন, সবজি দ্বারা তৈরি ফালাফেল বেশ জনপ্রিয়।

* ইরান ও ইরাক
ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই ইরান, ইরাক প্রসিদ্ধ। নবী, রাসুল, আলেম উলামা, সুফী, মুসলিম সাহিত্যিক, দার্শনিকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এ দুটি জনপদ।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইরান মূলত শিয়া অধ্যুষিত।
ইস্পাহান, শিরাজ, কাজবিন,তাবরিজ, মাশহাদ ইত্যাদি ইরানী শহরসমূহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে রমজান মাসে প্রসিদ্ধ।
খলিফাতুল মুসলিমীন হজরত আলী বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু
ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এ ইরানে শায়িত আছেন।
শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে উন্নত ইরানে পুরো রমজান জুড়েই পবিত্র ও নির্মল পরিবেশ বিরাজ করে, সরকারি অফিস আদালতের কর্মসীমার সময় কমিয়ে দেয়া হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি থাকে। ইফতার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পার্ক, লেইকে মানুষের প্রচন্ড ভীড় লক্ষ্য করা যায়। ইফতার সামগ্রী হিসেবে ইরানীরা সাধারণত চা,রুটি চীজ,কাবাব, ভেজিটেবল, খেজুর এবং জুলবিয়াহ ও বামিয়েহ নামক খাবারকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অন্যন্য মুসলিম দেশের মত ইরানেও শিশুদের গিফট, দরিদ্রদের দান সাদকাহ করার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয় পুরো রমজান জুড়েই। ইরানী শহর মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে প্রতিদিন প্রায় হাজারো রোজাদারকে বিনামুল্যে ইফতার করানো হয়, ইরানী গনমাধ্যমের দাবি এটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইফতার । এছাড়া ইস্পাহান, শিরাজ, তাবরিজের মত বিখ্যাত ঐতিহাসিক শহরগুলোতেও ইফতার মাহফিল, ইসলামী সেমিনার পুরো রমজান জুড়েই আয়োজন করা হয়।

মার্কিন আগ্রাসনে বিদ্ধস্ত ইরাকে রমজান একটি ইবাদতমুখর, উৎসবমুখর মাস। ইরাকে তারাবীহ সালাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। সারাদিন রোজা রেখে সবাই একসাথে ইফতার করেন, ইফতারে বিভিন্ন প্রকার ফলের জুসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দেশ ইরাকে মানুষ ইফতারের পরপর নামাজ শেষে কফি হাউজে ভীড় করেন। কফি হাউজে স্থানীয় ভাষায় 'কুসসাখুন' বা গল্পকার থাকেন, তিনি উপস্থিত জনতার মাঝে বিভিন্ন বীরত্বের গল্প, প্রেমের উপাখ্যান, মজাদার গল্প বর্ণনা করে সবাইকে বিনোদিত করে তোলেন।
ইরাকে ইফতারের পর পরিবার পরিজন, বন্ধু বান্ধবের
সাথে সংগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় , ইরাকে যা আল কিনিয়া নামে পরিচিত, এ অনুষ্ঠানে মূলত ধর্মীয় সংগীত চর্চা করা হয়, ইরাকীদের কাছে এ প্রথা খুবই জনপ্রিয়। তারা ভাবেন এমন অনুষ্ঠান ইফতারের পরের ক্লান্তি দূর করা সহ নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এছাড়া মেহিবিস নামক আরেকটি প্রথা ইরাকী সমাজে বিদ্যমান যা মুলত রিং খেলা। ইফতারের পর ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রতিবেশীরা এই খেলার আয়োজন করে থাকে।।
ইরাকি শিশুদের নিকট ' মাজেনা ' ব্যপক জনপ্রিয়, তারা বড়দের থেকে বিভিন্ন কৌশলে গিফট আদায় করে যা 'মাজেনা' নামে পরিচিত।

*ভারতীয় উপমহাদেশ*
ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বে বৃহৎ একটি মুসলিম জনপদ। বাংলাদেশ, ভারত,পাকিস্তান, আফগানিস্তান মিলে এ উপমহাদেশে প্রায় ৫৫ কোটি মুসলমানের আবাস। রমজান মাসে এ চারটি দেশে প্রায় একই পরিবেশ বিরাজ করে। সেহরী ইফতারে সাইরেন বা বাশি বাজানো, ভোররাতে রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগ্রত করার জন্য দলবেঁধে রাস্তায় কবিতা আবৃত্তি, গজল আবৃত্তি করতে দেখা যায়। জামায়াতে তারাবীহ সালাত, টিভি রেডিওতে ইসলামী অনুষ্ঠান, কুরআন তিলাওয়াত, হামদ নাত প্রতিযোগিতা , মাসব্যাপী মাদ্রাসা মাদ্রাসায় দরসে কুরআন দরসে হাদীস ইত্যাদি রমজান জুড়ে পালন দৃশ্যমান হয়। এ জনপদের মানুষ সারা বছর না পারলেও অন্তত রমজান মাসে চেষ্টা করেন কুরআনের খতম দিতে। রমজানে মাসে এখানকার মানুষ চেষ্টা করে আলেম -উলামা তালিবে ইলমদের আপ্যায়ন করতে। মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ পাকিস্তান আফগানিস্তান এবং ভারতের কিছু অঞ্চলে দিনের বেলায় হোটেল রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মত এখানে পাবলিক প্লেইসে খাবার পানাহারে জেল জরিমানা নেই। ইফতারেও এখানকার মানুষ খেজুর, দই, রুটি, কাবাব, আলু, চপ সবজি, বিরিয়ানী, পিয়াজু, ছোলা বুট, ড্রিংকসকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে এত বিশাল মুসলিম জনপদে রমজানে পণ্যের মুল্য হ্রাস করার সংস্কৃতি দেখা যায় না বরং কতিপয় ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে পন্যের মুল্য বৃদ্ধি করে দেন।

*মালদ্বীপ
অপরুপ সৌন্দর্য্যের লীলাভুমি বিশ্বের সবচেয়ে নীচু রাষ্ট্র মালদ্বীপ একটি দ্বীপ রাষ্ট্র যা দ্বীপ দ্বারা বেষ্টিত। মালদ্বীপে ১০০ ভাগ মুসলিম জনসংখ্যা। রমজানের আগমনের আগের রাতে মালদ্বীপবাসী মাহিফুন নামক খাবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যা প্রতিবেশীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। রমজানকে স্বাগত জানিয়ে তারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। রমজানকে স্বাগত জানিয়ে মালদ্বীপের মানুষ বাড়ি ঘরে নতুন রঙ করেন। ১৩ ঘন্টা দিনব্যপী রোজা রেখে তারা ইফতারের পর দ্বীপে বাইক ভ্রমণ করেন, কফি পান করেন, ক্যারম খেলায় মেতে উঠেন। জামাতে তারাবীহ সালাতকে মালদ্বীপে গুরুত্ব দেয়া হয়, পাড়া প্রতিবেশী বন্ধু বান্ধব একত্রে তারাবী সালাত আদায় করে থাকে। প্রথম রমজান মালদ্বীপে হলিডে হিসেবে পালন করা হয়।

*শ্রীলংকা -
দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকায় জনসংখ্যার দশভাগ মুসলিম। ব্যবসা বাণিজ্যে শ্রীলংকান মুসলিমগন দেশে একটি প্রভাব বিস্তার করে তাই রমজান মাসকে শ্রীলংকায় কিছুটা গুরুত্ব দেয়া হয়। শ্রীলংকায় ইফতারে পাকুরা, সামুচা, কিনজি নামক স্যুপ সবচেয়ে জনপ্রিয়। সাধারণত মুসলিম নারীরা ঘরে নামাজ পড়লেও শ্রীলংকায় রমজান মাসে তারাবীহ সালাত আদায়ের জন্য মহিলাদের আলাদা নামাজের ব্যবস্থা থাকে।

* ইন্দোনেশিয়া *
মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয় পবিত্র মাহে রমজান। মুসলিম জনসংখ্যায় সর্ব বৃহৎ এদেশে প্রায়৩ ০০ টিরও বেশি নৃগোষ্ঠী বিদ্যমান। রমজানে বিভিন্ন গোষ্ঠী পুরো মাস জুড়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে উদযাপন করে থাকেন। পবিত্র রমজানে দেশটির বেশিরভাগ মসজিদে মুসল্লিরা ভীড় করেন। শুধু নামাজের সময়ই নয়, বরং দিনের বেশিরভাগ সময় মসজিদগুলোতে তারা জিকির, কুরানুল কারীম, তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকেন।

শিশূ কিশোর তরুণরা রমজানের সময়টুকু কোরআন শিক্ষায় কাজে লাগান। বড় বড় মসজিদে তারা কোরআন শিক্ষায় অংশ নেন। মসজিদে তারাবীর নামাজে মহিলারা ব্যপকহারে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

এছাড়াও রমজানকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন ঐতিহ্য রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায় যেমন, মশাল মিছিল, রমজানের শুরুতে বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলে এই মশাল মিছিল করা হয়। এছাড়া শহরাঞ্চলে রমজান উপলক্ষে মোটর বাইক প্যারেড দেখা যায়। এছাড়া আছে তারাবীহ উপলক্ষে তারবিহ প্যারেড হয়, যেই প্যারাডের পোস্টারে লেখা থাকে "আসুন সবাই মসজিদে! "

রমজানকে স্বাগত জানিয়ে দেশটিতে মিউগাং নামের ঐতিহ্য পালন করা হয়। এ ঐতিহ্য অনুসারে রমজানের দু-একদিন আগে পশু জবাই করা হয় এবং রমজান মাসের জন্য মাংস সংরক্ষণ করা হয়।

রমজান মাসে পুরো ইন্দোনেশিয়া জুড়ে নাইকার বা কবর জিয়ারত পালন করা হয়। রমজানের আগে কবর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় এবং মাসজুড়ে জিয়ারত করা হয়।

.

রমজান মাস আত্নশুদ্ধির মাস, তাই আত্নশুদ্ধিতা অর্জনের জন্য রমজানের শুরুতে বিশেষ গোসলের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা রমজানকে বরণ করে নেন, এই বিশেষ গোসলকে স্থানীয় ভাষায় "পাদুসান" বলা হয়, ইন্দোনেশীয় মুসলমানরা এই পাদুসান বা বিশেষ গোসলের মাধ্যমে পবিত্র রমজানে মাসের আগমন উদযাপন করেন, ইন্দোনেশিয়ার জাভা প্রদেশে এই প্রথার প্রচলন সবচেয়ে বেশি।

এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পবিত্রতম রজনী লাইলাতুল কদরকে বরণ করে নিতে হয় এলা এলা উৎসব।

শেষ রমজানের ইফতারের পর রাস্তায় বের করা হয় তাকবীর প্যারেড।

ইফতারে ইন্দোনেশিয়ানদের নিকট পছন্দনীয় খাবার হল খেজুর, কিচাক, কোলাক ইত্যাদি।

* মালয়েশিয়া *

দক্ষিণ - পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ মালয়েশিয়া। যার জনসংখ্যার ৬২ ভাগই মুসলিম।রমজান মাস মালয়েশিয়াতে গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়, রমজানের শুরুতে স্থানীয়রা তাদের মসজিদ, বাসাবাড়ি পরিষ্কার করে রমজান কে স্বাগত জানান। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে গোটোং রোয়োং।

মালয়েশিয়াতে একত্রে সবাই ইফতার করেন যাকে ইফতার জাময়ি বলা হয়।

ইফতারে তাদের প্রিয় খাবার কোলাক, বুবুর লাম্বু, বুবুর নাছি।

মালয়েশিয়ার মসজিদে জামাতে বিশ রাকাত তারাবীহ সালাত আদায় করা হয়। তারাবীহ এর শুরুতে কুরান হাদীসের দরস দেয়া হয় যাকে স্থানীয় ভাষায় তাজকিরাহ বলা হয়।

সাহরিতে মালয়েশিয়ায় রাস্তায় যুবকেরা দফ বাজিয়ে হামদ নাত গেয়ে সুহুর সুহুর বলে সবাইকে ডাকাডাকি করে।

এছাড়া দান সাদকাহ অসীম আকারে করা হয়।

ইফতার উপলক্ষে মালয়েশিয়াতে বাজার বসে যাকে স্থানীয় ভাষায় পাসার রামাদ্বান বলা হয়।

স্থানীয় ভাষায় ইফতারকে বেরবুকা বলা হয়ে থাকে।

ফিলিপাইনের জনসংখ্যার প্রায় ১২ ভাগ মুসলিম, যা সংখ্যায় ৫ মিলিয়ন। ফিলিপাইনের মিন্দানাও এবং রাজধানী ম্যানিলায় মুলত মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস। ফিলিপাইনের মুসলিমরা ইফতারে সাধারণত বিফ কুর্মা, পিয়াংগাং চিকেন, সুগ ইত্যাদি খাবার গ্রহণ করে থাকেন।

থাইল্যান্ডে মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশের প্রায় ৫ ভাগ। ৮ মিলিয়ন মুসলমান থাইল্যান্ডে বাস করে। দেশের দক্ষিনাঞ্চলে মুলত মুসলিম জনগোষ্ঠী বেশি। থাইল্যান্ডে রমজানে সবাই মসজিদে এসে ইফতার করেন, ইফতারে তারা খেজুর, জুস দিয়ে ইফতার সম্পন্ন করেন।

মিশর - মিশর হল ইসলামী জগতের এক প্রসিদ্ধ দেশ। নানা ইতিহাস, ঐতিহ্যে নবী রাসুল, সাহাবায়ে কেরাম, আলেম উলামা সুফীদের পদচারণায় মিশর অতীত কাল থেকেই উদ্ভাসিত । মিশরে রমজান প্রধানতম মাস, ইবাদাতের মাস, উৎসবের মাস, দান সাদকাহর মাস, কুরআন তিলাওয়াতের মাস। শাবান মাস থেকেই মিশরে রমজানের প্রস্তুতি শুরু করা হয়, নিস্ফ শাবান থেকেই ইবাদাতের মাধ্যমে রমজানের আগমনী বার্তা মিশরে প্রকাশ পায়। রমজানের আগে মিশরে আলোকসজ্জা করা হয়। মিশরের রমাদানকে স্বাগত জানিয়ে রমাদ্বান লন্ঠন জগত জুড়ে বিখ্যাত।

যা ফানুস’ নামে মিশর সহ আরবজুড়ে পরিচিত।সালাউদ্দিন আইয়ুবীর সময় থেকেই এই লণ্ঠন বা ফানুস ব্যাপক জনপ্রিয়তা প্রায়। রমজান শুরুর আগেই মিসরের দোকান পাট বাজারে ছোট-বড় নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা। বাসা,বাড়িতে অফিসে তারা এই ফানুস, লন্ঠন ব্যবহার করে থাকে।

মিশর আলেম উলামার দেশ। তাই রমজানে ব্যপকভাবে ইলম চর্চা বৃদ্ধি পায়, মসজিদে,মাদ্রাসায়, জামেয়াতে দারসুল কোরআন, দারসুল হাদীস আয়োজন করা হয়। রাস্তাঘাটে কুরআন তিলাওয়াত এর আওয়াজ শুনা যায়। আলেম -সুফীদের মাজারে মানুষ জিয়ারতে যায়। রমজানে প্রচুর মানুষ ইসলামী ঐতিহ্য সংবলিত মিশরের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে যায় ইফতারে মিশরে কোনাফা, ভেড়ার গোশত, চেবাকিয়া, খেজুর, মাহশি ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়। ( বাকি অংশ আগামীকাল প্রকাশ হবে )

লেখক - ওয়ালি খান রাজু, শিক্ষার্থী , ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়