সরকারি নির্দেশনা মানছে না নামি স্কুল


Dhaka
Published: 2020-12-15 13:00:05 BdST | Updated: 2021-01-27 21:51:13 BdST

রাজধানীর নামিদামি বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশনা মানছে না। ইচ্ছেমতো টিউশন ফি আদায় এবং লটারির বদলে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছে তারা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার টাকা ছাড়া শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক অ্যাসাইনমেন্ট জমা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে আছে তহবিল তছরুপ, কেনাকাটায় হরিলুট, নিয়োগে অনিয়মসহ আরও নানা অভিযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামপুরা স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাড়তি টিউশন ফি আদায়, অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। বাড়তি সব ফি বাতিল করে শুধু টিউশন ফি আদায় করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকে নির্দেশনা দেয়া হলেও এসব প্রতিষ্ঠানে সেটি মানা হচ্ছে না।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা ভর্তি নীতিমালা, শাখা খোলার জন্য প্রণীত নীতিমালা, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা, নিয়োগ নীতিমালার কোনোটাই মানা হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলোতে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের তহবিল তছরুপ, ভর্তি দুর্নীতি, কোচিং ও সেশন ফির নামে অভিভাবকদের কাছ থেকে গলাকাটা ফি আদায়, নিয়োগে অনিয়ম, কেনাকাটায় হরিলুট, নিম্নমানের সহায়ক বই শিক্ষার্থীদের গছিয়ে দিয়ে প্রকাশক প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন গ্রহণসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিও চলছে এসব প্রতিষ্ঠানে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও টিউশন ফি সংক্রান্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) নির্দেশনা অমান্য করে পরীক্ষার ফি, উৎসব ও সাংস্কৃতিক ফি, বার্ষিক ক্রীড়া, ম্যাগাজিন, নাস্তাসহ নানা ধরনের বরাদ্দ যুক্ত করে টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে। কোনো অভিভাবক প্রতিবাদ জানালে শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন।

অন্যদিকে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতির মধ্যে লটারিতে শিক্ষার্থী ভর্তির নির্দেশনা দেয়া হলেও তা মানছে না চার্চের অধীনে পরিচালিত রাজধানীর হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট গ্রেগরি, সেন্ট যোসেফ, এসওএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সেন্ট যোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ব্রাদার লিও বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের আয়োজন থাকে বলে টিউশন ফির সঙ্গে বাড়তি অর্থ নিতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও আমাদের অধিকাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠিকমতো চালাতে হলে বাড়তি অর্থ নিতে হবে।’

লটারি পদ্ধতির বদলে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়, এবারও সেভাবে করতে আমরা গত ১৪ নভেম্বর ভর্তি ফরম বিক্রি শেষ করেছি। বর্তমানে যাচাই-বাছাই কাজ শেষ করা হয়েছে। আগামী ১৮ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে।’

নীতিমালা জারির আগে প্রথম শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শেষ করেছে সেন্ট গ্রেগরি স্কুল। এবার প্রতিষ্ঠানটি অন্য স্তরের ভর্তি প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ ব্রাদার প্রদীপ প্লাসিড গোমেজ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৭ ডিসেম্বর প্রথম শ্রেণির ভর্তি শেষ করা হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এবার লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যস্তরের শূন্য আসন চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেসব ক্লাসেও লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে।’

টিউশন ফির সঙ্গে বাড়তি অর্থ আদায় করার বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফৌজিয়া বলেন, ‘গভর্নিং বডির নির্দেশে টিউশন ফির সঙ্গে বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তবে যারা সমস্যায় রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে বাড়তি অর্থ আদায় ছাড়া কোনো রাস্তা নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘সরকার যে নির্দেশনা দেয় তা মনিটরিং করে না। কে মানছে, মানছে না তা খোঁজ নেয় না বলে নির্দেশনা ভঙ্গ হচ্ছে। রাজধানীর আইডিয়াল, ভিকারুননিসার মতো বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় বড় অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অন্যরা অন্যায় করার সুযোগ পাচ্ছে। সরকার যদি বড়দের অন্যায়ের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করে তবে তা সবার জন্য উদাহরণ হবে।’

তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ অসহায় অবস্থায় দিন পার করলেও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের কাছে অর্থ আদায়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

যারা আইন অমান্য করছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে যেন অ্যাসাইনমেন্ট জমা নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো ফি না নেন। এরপরও যদি কোনো শিক্ষক ফি কিংবা টাকা নিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট করে দেন, তার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা হার্ডলাইনে আছি।’

তিনি বলেন, ‘টিউশন ফি সংক্রান্ত আমরা একটি নির্দেশনা জারি করেছি, সে মোতাবেক শিক্ষার্থীদের কাছে অর্থ আদায় করা যাবে। অতিরিক্ত অর্থ আদায় করলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তিতে এ বছর সবাইকে লটারির আয়োজন করতে হবে। কেউ যদি এসব নির্দেশনা অমান্য করে তবে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এক্ষেত্রে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ, এমনকি এমপিও বাতিলের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানান তিনি।