নতুন বইয়ের ভাঁজে কোমল প্রাণের উচ্ছ্বাস

হাতে হাতে নতুন বই


নিজস্ব প্রতিবেদক
Published: 2018-01-01 17:01:55 BdST | Updated: 2018-12-11 20:19:27 BdST

বই উৎসবের মধ্য দিয়ে সারাদেশের স্কুলগুলোতে উদযাপিত হলো নতুন বছরের প্রথম দিনটি। সোমবার (০১ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুলে শিক্ষামন্ত্রী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে গণশিক্ষামন্ত্রী বই উৎসবের উদ্বোধন করেন। বই হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। এবার সারাদেশে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৬ হাজার ৮৯৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেয়া হয়।

‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে, ফুলের মতো ফুটবো/বর্ণমালার গরব নিয়ে, আকাশ জুড়ে উঠবো’- বর্ণমালার আধার হলো বই। এই বই জ্ঞানের রাজ্যে বিচরণের মাধ্যম। তাই বইয়ের যে অধিকারী সেই তো গর্ব করতে পারে। দেশের অনাগত ভবিষ্যৎকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার লক্ষ্যে সরকার প্রতি বছরের মতো এবারও বছরের প্রথম দিন নতুন বই তুলে দিয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে।

এবার নিয়ে টানা অষ্টমবার প্রথম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পেল পাঠ্যবই। বছরের এই একটি দিনে একসঙ্গে সারা দেশের শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে বই নিয়ে উৎসবে। নতুন বইয়ের অন্যরকম গন্ধে হয় আলোড়িত-উজ্জীবিত। নতুন বই নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাসটা যেন মুক্ত বিহঙ্গের নীলাকাশে ডানা মেলে ওড়ার মতোই। সারাদেশের শিশু-কিশোরদের এই উল্লাস দেখেই কবি কামাল চৌধুরীর কলমে উঠে আসে উল্লিখিত পক্তিমালা।

বই উৎসব

 

নতুন বইগুলো ছিল যেন উনুন থেকে সদ্য নামানো ভাঁপা পিঠার মতো। মলাটে আর পাতায় পাতায় জড়িয়েছিল উষ্ণতা। উচ্ছ্বাস ছিল এমন যেন এখনই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে হবে সব বই। অনেক শিশুকে দেখা গেছে, বই হাতে পেয়েই পড়তে বসে গেছে। কেউ পড়ছে বাংলা বইয়ের কবিতা বা গল্প, কেউ খুলেছে ইংরেজি বই। বিজ্ঞান, গণিতও মেলে দেখেছে কেউ কেউ।

এবার সারাদেশে সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীকে ৩৫ নতুন বই দিচ্ছে সরকার। উৎসবমুখর পরিবেশে হচ্ছে বই বিতরণ উৎসব। রঙ-বেরঙের সাজে সেজেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ। কচি-কাঁচাদের হাতে হাতে নানান রঙের সাজ, আকাশে রঙিন বেলুন, মাঠজুড়ে কোলাহল, ব্যান্ডের তাল- সব মিলে বর্ণিল আয়োজন। এই মাঠে বই উৎসবের আয়োজন করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেন। সঙ্গে ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন, সদস্য আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসেন, প্রাথমিক শিক্ষার সচিব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচাকসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা ছিলেন অনুষ্ঠানের মধ্যমনি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ঢাকায় দু’টি কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে। দুই মন্ত্রণালয়ই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উৎসব করে বই বিতরণ করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজন করেছে আজিমপুর গার্ল স্কুলে।

প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের আগে থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হলেও ২০১০ সাল থেকে প্রথম থেকে নবম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীকে এ সুবিধার আওতায় এনেছে আওয়ামী লীগ সরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি বলছে, গত বছরের চেয়ে এবার ১০ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষার্থী বেড়েছে। ফলে এবার ৭১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৬৯টি বই বেশি ছাপানো হয়েছে।

গত আট বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২২৫ কোটি ৪৫ লাখ ১১ হাজার ৭৫০টি বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেছে সরকার।

নববর্ষে এসে মোট ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ এক হাজার ৯১২টি বই বিতরণকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুলে শিক্ষামন্ত্রী বই উৎসবের উদ্বোধন করেন।

 

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, এবারের বইগুলো ভালোমানের কাগজে ছাপা হয়েছে। বইগুলো আকর্ষণীয় ও রঙিন। নবম-দশম শ্রেণির ১২টি সুখপাঠ্য বই দামি কাগজে রঙিন ছবিসহ ছাপা হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে দুই কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বই বিতরণ করা।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রাথমিকের শিশু শিক্ষার্থীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমরা পদ্ধপরিকর। আমাদের লক্ষ্য এখন গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। আমাদের লক্ষ্য ২০১৮ সালের মধ্যে সব সরকারি স্কুলে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। প্রতিটি স্কুলের অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে মিল পাঠাবে, সেই পদক্ষেপ আমরা নিতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে গণশিক্ষামন্ত্রী বই উৎসবের উদ্বোধন করেন।

 

আজকের এই দিনে ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও কারিগরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের অনেকেই খালি হাতে স্কুলে গিয়ে দুই হাত ভরে পাঠ্যবই নিয়ে বাড়ি ফেরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা খুব ভোরে এসেছেন এখানে। জানতে চাইলে বলে, নতুন বই নিতে এখানে এসেছি। মন্ত্রী স্যারের হাত থেকে নতুন বই নেবো। কী মজা, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।

নতুন বই পাওয়ার আকর্ষণে এদিন সকাল ৮টাতেই গিয়ে খেলার মাঠে হাজির সোনিয়া আক্তার। নতুন বই নিয়েই বাড়ি ফেরে সে। বকশিবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ইশতিয়াক আহমেদ রিফাত জানায়, নতুন বই পেয়ে তার অনেক আনন্দ হচ্ছে।

এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

বই বিতরণকে ঘিরে ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশেই উৎসবের আয়োজন ছিল। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ব্যান্ড বাজিয়ে নেচে-গেয়ে, আনন্দ-উল্লাস করে, প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নেড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।

এসএম/ ০১ জানুয়ারি ২০১৮

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।