বাংলাদেশে ব্লক চেইন প্রযুক্তি এবং নিরাপদ লেনদেন ব্যবস্থা


Dhaka
Published: 2020-07-14 14:37:45 BdST | Updated: 2020-08-06 19:51:53 BdST

ইংরেজীতে ডাবল স্পেন্ডিং নামে একটি বিষয় রয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার দুই বার ব্যবহারের ঝুঁকিকে ডাবল স্পেন্ডিং বলা হয়ে থাকে। তবে আমরা জানি যে, একই ক্যাশ দুবার ব্যবহার অসম্ভব। ডাবল স্পেন্ডিং ঝুঁকি এড়াতে সেজন্যই আমাদেরকে কোন তৃতীয় পক্ষ কিংবা কোন বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক এর কাছে যেতে হয়। এজন্যই সেই প্রতিষ্ঠান আমাদের উপর চার্জ আরোপ করে থাকে থাকে। কেউ যদি প্রতি লেনদেনে ৫ শতাংশ হারে চার্জ প্রদান করে, তাহলে তাকে ১০০ বার লেনদেনেও ঠিক একই পরিমাণ চার্জ প্রদান করতে হবে। ব্লক চেইন প্রযুক্তি এমন এক প্রযুক্তি, যেটা এই ডিজিটাল মুদ্রার এসব সমস্যা দূর করবে।

প্রশ্নঃ ব্লক চেইন প্রযুক্তি কী?
উত্তরঃ ব্লক চেইন হচ্ছে গ্রাহক থেকে গ্রাহকে লেনদেনের একটি ব্যবস্থা, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তৃতীয় কোন পক্ষের সাহায্য ছাড়াই লেনদন সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আপনার বন্ধুর কাছে টাকা পাঠাতে চাইবেন, তখন আপনাকে ব্যাংকের সহায়তা নিতে হবে, যা মূলত তৃতীয় পক্ষ। আপনি যদি এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈধ উপায়ে মুদ্রা পাঠাতে চান, তাহলে আপনাকে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় আপনি লেনদেন করতে পারবেন না। ঠিক এখানেই ব্লক চেইন প্রযুক্তির সুবিধা বিদ্যমান, যেটার মাধ্যমে তৃতীয় কোন পক্ষের সাহায্য ছাড়াই আপনি লেনদেন করতে পারবেন।

প্রশ্নঃ ব্লক চেইন প্রযুক্তি নির্ভর লেনদেন কেনো নিরাপদ?
উত্তরঃ আপনারা জানেন যে ব্যাংকের সকল শাখায় সমস্ত লেনদেন রেকর্ড করার জন্য একটি খতিয়ান থাকে। যে ব্যাংকগুলিতে ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, তাদের ডাটাবেইসে এই রেকর্ড জমা থাকে। বড় আকারের এই খতিয়ানকে লেজার বলা হয়। বৈধ লেনদেনের জন্য ব্যাংককে অবশ্যই সেই খতিয়ানে প্রবেশ করতে হবে। ব্লক চেইন এই রকমই একটি লেজার, যেখানে একের পর এক ব্লক যুক্ত রয়েছে। এই ব্লকটিতে বিশ্বজুড়ে সমস্ত লেনদেনের তথ্য থাকবে। এসমস্ত তথ্য এনক্রিপ্ট অবস্থায় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তার মানে এই তথ্য প্রত্যেকে দেখতে পাবে, কিন্তু এটি পড়ার জন্য প্রত্যেকের ব্যক্তিগত চাবি বা কী জানতে হবে। আপনি যদি এখানে লেনদেন করেন তবেই কেবলমাত্র আপনি আপনার ব্যক্তিগত কী বা চাবি ব্যবহার করে আপনার লেনদেনের সমস্ত বিবরণ পড়তে পারবেন, অন্যথায় কেউ এটি করতে পারবে না। তবে অন্য লোকেরা এখানে লেনদেনের পরিমাণ দেখতে পাবে। কিন্তু কার টাকা কার কাছে গেল, এটা কেউ জানবে না। অর্থ কেবল নির্দিষ্ট ঠিকানা দিয়ে চলে যাবে। প্রাপক বা দাতার কোন পরিচয়ও থাকবে না।

প্রশ্নঃ ব্লক চেইনে লেনদেন কিভাবে সম্পন্ন হবে?
উত্তরঃ যখন ব্লক চেইনগুলির ব্লকের মধ্যে কোন ডেটা বা তথ্য সরবরাহ করা হয়, তখন সেই ডেটা মুছতে বা ডেটাতে কোন পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য যে, একটি সম্পূর্ণ ব্লক চেইনের প্রতিটি ব্লকে মূলত তিনটি অংশ থাকে, যেমন- ডেটা, হ্যাশ এবং এর আগের ব্লকের হ্যাশ। প্রতিটি ব্লকের নিজস্ব ডেটা, ব্লকের নিজস্ব হ্যাশ এবং এর পিছনে থাকা আগের ব্লকের হ্যাশ রয়েছে। এখন মনে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে, হ্যাশ কি? হ্যাশ মূলত একটি আইডেন্টিফায়ার। প্রতিটি ব্লকের হ্যাশ ইউনিক এবং এটি প্রত্যেকের জন্য সুনির্দিষ্ট। অর্থাৎ দুটি ব্লকের হ্যাশ কখনই এক হবে না। এই বিষয়টি অনেকটা মানুষের আঙুলের ছাপের মতো। দুজনের আঙুলের ছাপ যেমন কখনই এক হয় না, দুটি ব্লকের হ্যাশও কখনো একই হবে না। এখন আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন কীভাবে এই হ্যাশগুলি তৈরি করা হয়? এই হ্যাশগুলি প্রতিটি ব্লকে সঞ্চিত ডেটা বা তথ্য অনুযায়ী তৈরি করা হয়। তার মানে যদি কোন ব্লকের ডেটা কোনভাবে পরিবর্তন করা হয়, তবে সেই ব্লকের হ্যাশও পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এখন চিন্তা করুন তো, কেনো প্রতিটি ব্লকে তার আগের ব্লকের একটি হ্যাশ রয়েছে। প্রতিটি ব্লকে যদি ইতিমধ্যে আগের ব্লকের হ্যাশ যুক্ত থাকে, তবে কোন ব্লকের ডেটা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। সুতরাং এটি বলা যেতে পারে যে, ব্লক চেইনে প্রদত্ত প্রতিটি ডেটা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব।

সুরক্ষিত ব্লক চেইনের পিছনে আর একটি বড় কারণ হল, এর নেটওয়ার্ক ডিস্ট্রিবিউটেড। এটি মূলত পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক তৈরি করে। পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্ক বা পি-টু-পি হচ্ছে এমন এক ধরণের নেটওয়ার্ক যেখানে কম্পিউটার হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার কোন সার্ভারের সাহায্য ছাড়াই একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারে। পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কে প্রত্যেক ইউজার তাদের রিসোর্স অন্যের সাথে শেয়ার করতে পারে। এ প্রকার নেটওয়ার্কে প্রতিটি কম্পিউটার একইসাথে সার্ভার এবং ওয়ার্কস্টেশন। এখানে প্রতিটি মেশিন ডিসেন্ট্রালাইজ বা ছড়ানো ছিটানো থাকে। ফলে রিসোর্স শেয়ারিং এর ক্ষেত্রে সমান ভূমিকা পালন করে থাকে। উন্নত বিশ্বে ৪৮ শতাংশ মানুষ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন মানিব্যাগের বিকল্প হিসেবে মুঠোফোন ব্যবহার করছেন। যার নাম ডিজিটাল ওয়ালেট। সেই ডিজিটাল ওয়ালেটের ডিজিটাল মুদ্রার নাম হচ্ছে বিটকয়েন, যা বর্তমান ক্রিপ্টোকারেন্সি দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় লেনদেনের ডিজিটাল মুদ্রা। পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক হওয়ায় বিটকয়েনের লেনদেন বা লেনদেন সেবা প্রেরক এবং প্রাপকের ওয়ালেট থেকে ওয়ালেট পর্যন্ত করা হয়। বিটকয়েন ওয়ালেটে সংরক্ষণ করা হয়। ব্লক চেইনের প্রত্যেকেই ইন্টারনেটে ব্লক চেইন ডেটা যাচাই করতে পারে। যখন কোন নতুন ব্যক্তি এই ব্লক চেইন নেটওয়ার্কটিতে নিবন্ধন করে, সে আগের এবং পরের সমস্ত ব্লকের একটি অনুলিপি সে পেয়ে যায় এবং সে প্রতিটি ব্লক যাচাই করে এবং নিশ্চিত করে যে ব্লক চেইনের প্রতিটি ডেটা এখনও বৈধ।

.


মনে করুন আপনার কাছে ১০০ বিটকয়েন রয়েছে এবং আপনি আমাকে সেখান থেকে ৫০ বিটকয়েন প্রেরণ করতে চান। সেক্ষেত্রে এই পরিমাণটি আপনার ওয়ালেট থেকে আমার ওয়ালেটে স্থানান্তরিত হবে। আপনি যখন আমার ওয়ালেট ঠিকানায় বিটকয়েনগুলি প্রেরণ করবেন, এই লেনদেনের সমস্ত বিবরণ সহ বিদ্যমান ব্লক চেইনে একটি নতুন ব্লক চেইন তৈরি করা হবে। এই ব্লকের ডেটাতে প্রেরক অর্থাৎ আপনার ওয়ালেট ঠিকানা, রিসিভার অর্থাৎ আমার ওয়ালেটের ঠিকানা এবং আপনি যে পরিমাণ বিটকয়েন প্রেরণ করবেন তা থাকবে। এই নতুন ব্লকটি যাচাই করতে ব্লক চেইনে সংযুক্ত প্রত্যেকের জন্য অপেক্ষায় থাকবে। যখন তারা সকলেই এই ব্লকটি নিশ্চিত করে বা সবকিছু ঠিক আছে তা নিশ্চিত করবে, তখনই এই লেনদেনের রেকর্ড স্থায়ীভাবে ব্লক চেইনে থাকবে এবং আমাদের লেনদেন সম্পন্ন হবে। এবং এই যাচাইকরণের কাজটি কে মাইনার বলে। যেহেতু ব্লক চেইনে ডিস্ট্রিবিউটেড এবং বিকেন্দ্রীভূত সিস্টেম রয়েছে, একই ব্লক চেইনের সমস্ত ব্যবহারকারীর কাছে একই ব্লক চেইনের সমস্ত ব্যবহারকারীর হুবহু অনুলিপি রয়েছে। সুতরাং এক বা একাধিক সার্ভার বা কম্পিউটারগুলি একসাথে নষ্ট হয়ে গেলেও ব্লক চেইনে কিছুই ঘটবে না।

প্রশ্নঃ বর্তমানে বিদ্যমান প্রযুক্তির তুলনায় ব্লক চেইন প্রযুক্তির সুবিধা কী?
উত্তরঃ ব্লক চেইন লেনদেন পরিচালনার জন্য কোন তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। ফলস্বরূপ, আপনি কোনও ঝামেলা ছাড়াই বিশ্বের যে কোন জায়গায় লেনদেন করতে পারবেন, যা সাধারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খুব ঝামেলাজনক। পেপাল লেনদেন সিস্টেমের কথা চিন্তা করুন, এখানে প্রেরিত অর্থ বা ব্যবহারকারীর ডেটা যে কোন সময় চুরি করা যেতে পারে, যেখানে ব্লক চেইন সিস্টেমে সকলের পরিচয় গোপন থাকে এবং ডেটা নিয়মিত আপডেট হয়, চুরি বা দুর্নীতির কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে ব্লক চেইন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ কী?
উত্তরঃ বাংলাদেশ সরকারের সমর্থন ব্যতীত, দেশে ব্লক চেইনের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্লক চেইন ভিত্তিক ব্যবসাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। যদি এটি সরকারী লেনদেন পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়; ভেবে দেখুন বাংলাদেশে সরকারী লেনদেন পরিচালনায় দুর্নীতির হার কত কম হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আমরা হয়ত অবগত আছি যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্ট থেকে ৮০৮ কোটি টাকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে গচ্ছিত ছিল। ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হলে, এই ধরণের অযাচিত ঘটনা বন্ধ করা যেতে পারে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে ব্লক চেইন প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলো কী কী?
উত্তরঃ
১। বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক শিল্প যেমন রেমিট্যান্স, ক্রেডিট এবং পেমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি,ট্রেড প্রসেসিং এন্ড সেটেলমেন্ট, ক্রস-বর্ডার পেমেন্টস তাদের লেনদেন ব্লক চেইনের মাধ্যমে উন্মুক্ত, নিরাপদ ও অপরিবর্তনীয় করার নিশ্চয়তা দিতে পারে।
২। বাড়ি ঘর কিংবা জায়গা জমি হস্তান্তরে ব্লক চেইন প্রযুক্তি জালিয়াতি দূর করতে পারবে।
৩। ব্লকচেইন হেলথ কেয়ারে খুবই ভালো ফল দিতে পারবে। যেমন ব্লক চেইনের মাধ্যমে রোগীর সব ইতিহাস চিকিৎসক জেনে ফেলতে পারবেন নিমিষেই। ফলে চিকিৎসা দিতে সুবিধা হবে।
৪। ব্লকচেইন গভর্নেন্স (ভোটদানের মতো ই-গভর্নেন্স)সরকারের কর্মকান্ডে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
৫। অনলাইনে কেনাকাটা, ব্লকচেইন মিউজিক, বিচার ব্যবস্থায় ব্লক চেইন নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
৬। ব্লকচেইন আইডেন্টিটি, পাসপোর্ট, জন্ম-বিবাহ-মৃত্যু সনদ এবং ব্যক্তিগত আইডেন্টিফিকেশনের মতো বিভিন্ন কাজে ব্লক চেইনের ব্যবহার হতে পারে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে ব্লক চেইনের কোন চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি?
উত্তরঃ অবশ্যই এতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রকের আত্মবিশ্বাস, প্রযুক্তির ব্যয়, ডেটা সুরক্ষা (পিআইআই তথ্য) এবং বিদ্যমান সিস্টেমের সাথে প্রযুক্তির সংযোগ স্থাপন ও বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগের ব্যাপারটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

ব্লকচেইন বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু স্বতন্ত্র গোপনীয়তা পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীদের সরিয়ে দিতে পারে। ব্লকচেইনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, জালিয়াতি এবং দুর্নীতি নির্মূল করার মাধ্যমে নাগরিককে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশে ব্লক চেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

লেখক: মোঃ আরিফুল ইসলাম
লেকচারার 
রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়