সাবেকদের বাগড়ায় থমকে আছে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি!


ঢাকা
Published: 2019-04-16 12:15:26 BdST | Updated: 2019-05-27 03:54:58 BdST

ছাত্রলীগে গ্রুপিং রাজনীতি আবারো সক্রিয় হচ্ছে। সংগঠনটির বর্তমান কমিটির সর্বোচ্চ দুটি পদের নাম ঘোষণার পর ৯ মাস চলে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। বর্তমান কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক চাইলেও সাবেকদের কারণে আটকে আছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এ নিয়েই বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে বিরাজ করছে দ্বন্দ্ব।

সম্প্রতি এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতা কয়েকবার বৈঠক করে তা মিটমাট করার চেষ্টা করেছেন। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে বলে জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগ ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনের পর কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও শীর্ষ পদের নেতৃত্ব বাছাইয়ে সময় নেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছর ৩১ জুলাই শেখ হাসিনা অর্পিত ক্ষমতাবলে মো. রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ২ বছরের জন্য ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করেন।


ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রের ১১ (খ) ও (গ) ধারায় বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকাল দুই বছর। এর মধ্যে সম্মেলন না হলে কমিটির কার্যকারিতা থাকবে না। সেই হিসেবে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি এরই মধ্যে নির্ধারিত সময়ের একটা অংশ পার করে ফেলেছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়াই। কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে বলে বারবার মিডিয়াকে বলা হলেও এখনো করতে পারেনি। পূর্ণাঙ্গ কমিটির করার ক্ষেত্রে বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে পদপদবি নিয়ে চলছে টানা-হেঁচড়া। বর্তমান কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে গেলেও হোচট খেতে হয়েছে সাবেক ছাত্রলীগ ও বর্তমান কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কারণে। মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তাদের অনুসারীদের পদপদবিতে বসাতে চাচ্ছেন। এমনকি বর্তমান কমিটির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন তারা।

সূত্রে জানা যায়, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে ১২ এপ্রিল আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার ধানমণ্ডির নিজস্ব অফিসে ছাত্রলীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও ঢাবি শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সাথে নিয়ে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ চার নেতা। সেখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক আলোচনা হয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে; কিন্তু সেই বৈঠকেও চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্তরা। বৈঠকে থাকা এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, আমরা বৈঠক করেছি, সেখানে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সেই দিন রাতে ছাত্রলীগ অন্তর্কোন্দলের দ্ব›দ্ব প্রকাশ হয়। রাত ১টার দিকে ছাত্রলীগের আয়োজিত চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখবরণে কনসার্টে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। কনসার্টের মূল মঞ্চ, ফ্রিজ ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ভাঙচুর করে তাঁবু উল্টে ফেলা হয়। ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হয়। খবর পেয়ে ডাকসুর জিএস ও ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস এবং ডাকসুর এজিএস ও ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ঘটনাস্থলে আসেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে রাত ৩টা পর্যন্ত নেতাকর্মীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে মহড়া দেন গোলাম রাব্বানী, সনজিত চন্দ্র দাস ও সাদ্দাম হোসেন।

অন্যদিকে রাতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কিছুক্ষণ পর এএফ রহমান হলে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মীর ওপর হামলা করা হয়। হল ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষার জানান, তার কক্ষের দরজা ভাঙচুর করা হয়েছে। ৩১৩ ও ৩১৫ নম্বর কক্ষে তালা দেয়া হয়েছে। এ কক্ষগুলোতেও তুষারের অনুসারীরা থাকতেন। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে কনসার্ট পণ্ড হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠানের অনুমতি স্থগিত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টার দিকে ভিসির বাসভবনে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যান। সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার আওয়ামী লীগের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস এবং ডাকসুর এজিএস ও ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনকে নিয়ে দরবারে বসেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।

সেখানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএ মোজাম্মেল, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস ছিলেন। বৈঠক সূত্রে আরো জানা যায়, আওয়ামী লীগের নেতারা ছাত্রলীগ শীর্ষ চার নেতাকে নেত্রীর পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন তাদের অনুসারীদের জন্যও ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ-পদবি দাবি করছেন। তাদের সাথে পদ-পদবির ভাগবাটোয়ারা না হওয়ার কারণেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হচ্ছে না- এমনটাই মানবকণ্ঠকে জানিয়েছে একটি সূত্র।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা দায়িত্ব নিয়েছেন, যারাই এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, বিএ মোজাম্মেল ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এই দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা তাদের কাছে নাম দিয়েছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখানে টাকা-পয়সার কোনো বিষয় নেই। ছাত্রলীগের ১২ জনের নাম দেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ ছাত্রলীগের পদধারী আবার অনেকে ছাত্রলীগ কর্মী; যারা দুষ্কৃতি তাদের কোনো পরিচয় নাই। সাবেকরা পদ চেয়েছে এটা আমার জানা নাই। তবে ছাত্রলীগের সভাপতিকে বার বার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আমরা একটি বৈঠক করেছি। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ছাত্রলীগের কনসার্টের যারাই হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে তাদের তালিকা পেয়েছি এবং আরো বের করার কাজ চলছে। প্রমাণ মিললেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল তা সমঝোতা হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই কাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করব। আমরাই কাজ করছি। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, কমিটির বিষয়ে তাদের বলা হয়েছে। তাদের যে দ্ব›দ্ব ছিল তা মিটমাট করা হয়েছে। এখন আর দ্ব›দ্ব নেই। তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।

মানবকন্ঠ

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।