মিলে গেল ছাত্রলীগ


ঢাকা
Published: 2019-05-20 03:40:11 BdST | Updated: 2019-06-20 16:55:18 BdST

নিজেদের মধ্যে আর ভুল বোঝাবুঝি নয়। এখন থেকে দুই পক্ষই সংগঠনের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সম্মান করে এবং ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এক পতাকাতলে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

রোববার রাত সাড়ে আটটা থেকে মধ্য রাত অবধি ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার নেতা পুনরায় ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের নিয়ে বৈঠক করেন। প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে চলা এ বৈঠক হয়।

বৈঠক সূত্র জানায়, দায়িত্বশীল নেতারা ছাত্রলীগের উভয় অংশের প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কড়া বার্তা দেন। এরপর কয়েক ঘন্টাব্যাপী বৈঠকে উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছান। দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের কয়েকটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনাগুলো হল, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মধুর ক্যান্টিনে যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে সেই ঘটনায় যারা দোষী তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া, কমিটিতে স্থান পাওয়া যাদের বিরুদ্ধে বিতর্ক উঠেছে প্রমাণ স্বাপেক্ষে তার সত্যতা নিশ্চিত করে দলীয় পদ থেকে দ্রুত অব্যাহতি দিয়ে পদ শূন্য ঘোষণা করা এবং ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করে পদায়নের নির্দেশ, সংগঠনের সাংগঠনিক নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করার দাবি জানালে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা নেত্রীর সময়ানুযায়ী দেখা করার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

তার আগে ছাত্রলীগের উভয় অংশকে সংগঠনের ঐক্যের স্বার্থে একসাথে চলার কড়া নির্দেশ দেন।

বৈঠক থেকে বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসারকে সমন্বয়ক করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বৈঠকে অংশ নেয়া বিদ্রোহী গ্রুপের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে গিয়ে অনশন ভাঙ্গার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তারা সকলে মিলে একসঙ্গে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে অনশনরতদের অনশন ভাঙ্গান।

বৈঠকে ছাত্রলীগের উভয় অংশের নেতারা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের প্রতিশ্রুতি দেন, আজ সোমবার থেকে মধুর ক্যান্টিনে তারা একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে সংগঠনের সকল ধরনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন। আর নিজেদের মধ্যে কোন ভুল বোঝাবুঝি থাকবে না। এখন থেকে দুই পক্ষই সংগঠনের ইতিহাস ঐতিহ্যকে সম্মান করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এক পতাকাতলে চলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান শেষে গ্রুপ ফটোসেশনে অংশ নেন।

বৈঠক শেষে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজুয়ানুল হক চৌধুরী শোভন সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের কিছু সংখ্যক ছাত্রলীগ কর্মীর কিছু মান অভিমান ছিল। তাদের মান অভিমান শোনা হলো। তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে ১৭টি পদ নিয়ে অভিযোগ আছে, সে অভিযোগের ভিত্তিতে নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাদের দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের বিষয় খোঁজ নিতে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সে পদ শূণ্য হওয়ার সুযোগ আছে এবং সেখানে যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, গত দুইদিন ধরে যারা ক্ষোভ প্রকাশ করছিল এবং ক্ষোভের বহিপ্রকাশ স্বরূপ বিভিন্ন রকম কর্মকান্ড করছে আজ থেকে সব ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা কাজ করবো। মধুর ক্যান্টিনে এক সঙ্গে বসে আড্ডা দিব। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠা করা সংগঠন ছাত্রলীগকে কীভাবে আরও সুসংগঠিত করা যায় এ বিষয়ে আমরা বসেছিলাম। আশা করছি আমরা সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাব।

‘আপনারা বলছেন ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং অন্যদিকে পদবঞ্চিতরা ৯৯ জনের তালিকা দিয়েছে’ এমন প্রশ্নের জবাবে শোভন বলেন, আমরা যেসব অভিযোগ পাব তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিব। তিনি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তাদের বিষয়ে খোঁজ নিবেন। আমরা চাই আরও অনুসন্ধান হোক। অনুসন্ধানে যারা বিতর্কিত প্রমাণ হবেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ পদটি শূন্য করে নতুনদের জায়গা দেওয়া হবে। তবে এতটুকু বলতে চাই যে কমিটি হয়েছে সেটি থাকবে।

গোলাম রাব্বানী বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদের প্রত্যেকে গত কমিটিতে একাধিক পদে ছিল। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পূর্ববর্তী নেতারা ক্রস চেক করেই তাদের পদ দিয়েছে। এখন আমরা তাদের ডেডিকেশন তাদের সক্রিয়তা দেখে পদ দিয়েছি, তাদের মধ্যে কেউ যদি গোপনে বিয়ে করে তাহলে কী করার আছে। তারপরও বলব তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিব।

এদিকে, গত ১৫ মে ছাত্রলীগের সদ্য ঘোষিত ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দুপুরে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে ডেকে এ নির্দেশ দেন। এ সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, উপদফতর সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া এবং কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এস এম কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ তালিকায় থাকা ১২ থেকে ১৫ জন বিতর্কিত নেতার নাম কালি দিয়ে চিহ্নিত করে তাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। তালিকায় যদি আরও কোনো বিতর্কিত নেতা থাকেন খোঁজ-খবর নিয়ে তাদেরকেও বাদ দিতে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই নির্দেশনায় শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের ব্যাপারে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেন এবং কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদেরকেও অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে যাদের নামে খুনের মামলা আছে, যারা বিবাহিত, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে, যারা জামায়াত-বিএনপি পরিবার তথা মানবতাবিরোধী পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদেরকেও চিহ্নিত করে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়াও যারা কমিটি ঘোষণার পর থেকে ক্ষোভ প্রকাশের নামে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে তাদের ব্যাপারেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

ওইদিন রাতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কয়েক ঘন্টার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের শীর্ষ এই দুই নেতা জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পাওয়া বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে।

তারাা বলেন, ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পাওয়া বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খতিয়ে দেখে এর সত্যতা পাওয়া গেলে তাদেরকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। যে পদগুলো খালি হবে সেখানে ত্যাগী ও বঞ্চিতদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এখন পর্যন্ত আমরা ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছি। এদের বিরুদ্ধে বিবাহিত হওয়া, মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিএনপি-জামাত পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, সেসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের অব্যাহতি দেয়া হবে। এর বাইরেও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগের সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হবে, বলেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত ১৭ জনের নাম ঘোষণা করেন গোলাম রব্বানী।

গত সোমবার (১৩ মে) ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এ কমিটিকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে তা ভেঙে নতুন কমিটি দেওয়ার দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার (১৪ মে) ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন পদবঞ্চিতরা। এদিন দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে এ হুমকি দেওয়া হয়।

এতে লিখিত বক্তব্যে বিগত কমিটির প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন বাবু বলেন, বিগত দিনগুলোয় যারা সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের একটি বৃহৎ অংশকে বাদ কিংবা সঠিক মূল্যায়ন না করে ছাত্রলীগে নিষ্ক্রিয়, চাকরিজীবী, বিবাহিত, অছাত্র, গঠনতন্ত্রের অধিক বয়সী, বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদকসেবী, মাদকব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে আজীবন বহিষ্কৃতসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে। এমন ব্যক্তিদের পদায়ন ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে আমাদের ব্যথিত করেছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এ কমিটি ভেঙে দিয়ে আরও খোঁজ-খবর নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি।

বৈঠকে আওয়ামী লীগের যু্গ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনসহ পদ বঞ্চিত নেতাদের কয়েকজন প্রতিনিধি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।