ভাষা টিকে থাকে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির উপর


Dhaka | Published: 2022-02-21 14:48:25 BdST | Updated: 2022-06-29 07:19:29 BdST

যে কোন ভাষারই ভিন্ন কোন সত্ত্বা নাই। ভাষা টিকে থাকে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির উপর নির্ভর করে। হিব্রু ভাষা হয়তোবা হারিয়েই যেতো ইজরাইল নামক রাষ্ট্রের জন্ম না হলে। কুর্দিদের ভাষার হরফ কেমন হবে তা ঠিক হয় নাই; কারন ছন্নছাড়া কুর্দিরা! তাই জাতিগত ভাবে দুই হরফে লেখালেখি চালিয়ে যায় তারা!

মাতৃভাষা মূলত যে কোন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক ভাষা। আমরা বাঙালী, আমাদের মায়ের মুখের ভাষা বাংলা।
তবে আমরা জাতিগত ভাবে যতই শিক্ষিত হচ্ছি ততই আঞ্চলিক ভাষাকে এড়িয়ে যাওয়াতে প্রচেষ্টারত।

অথচ "মা'গো... ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়" এই বাক্য বাধার কারনেই সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। যেখানে পাকিস্তানের শতকরা ৫৬% মানুষের মুখের ভাষা বাংলা, সেই রাষ্ট্রে পাকিস্তানী শাসকেরা গায়ের জোরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে চেয়েছিলো!

রাষ্ট্রভাষার বর্ণ যদি অন্য কোন ভাষার হয় তবে মায়ের ভাষার গুরুত্ব ও প্রভাব এমনিতেই হারিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। আয়ারল্যান্ডে তো নিজস্ব ভাষা ছিল অথচ ব্রিটিশদের শোষণে তা হারিয়ে গেছে। আয়ারল্যান্ডের স্কুলগুলাতে বর্তমানে তাদের মাতৃভাষা (আইরিশ) শেখানোর চেষ্টা হলেও আইরিশ শিক্ষার্থীরা তা শিখতে আগ্রহী নয় কারণ জাতীয়তাবাদী আবেগ ছাড়া এই ভাষার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নেই। তাই সেখানকার শিক্ষার্থীরা ইংরেজি শিখতেই বেশি আগ্রহী।

কাঁধে ভর করে যেমন মাথা টিকে থাকে তেমনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির উপর ভাষা টিকে থাকে। কলকাতার তরুণেরা বাসার বাহিরে গেলেই নাকি হিন্দি অথবা ইংরেজিতে কথা বলে বলেই শুনেছি। অথচ আমরা জাতিগত ভাবে বহুপূর্ব থেকেই পশ্চিমবঙ্গের গান ও সিনেমার ভক্ত! অথচ কলকতার অধুনাদের সামাজিক বাস্তবতা সম্পূর্নরুপে ভিন্ন।

শোষকের শাসনে ভাষা বেঁচে থাকে! এই নির্মতা যদি সত্য নাই হবে, তবে কেনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিক থেকে নয় শুধুমাত্র ক্ষমতার জোরে সংখ্যালঘু উর্দু পূর্ব অথবা পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার হবার দাবি রাখে?

ইউরোপের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র আছে; জনসংখ্যার দিক থেকে যাদের আমাদের রাজধানী ঢাকার থেকেও কম মানুষ আছে তারাও জাতিগত ভাবে নিজেদের ভাষাকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে।
অথচ আমাদের রাষ্ট্রের সুবর্ণ জয়ান্তীতেও স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের ভাষায় একটা গ্রন্থ অনুবাদ হয়নি। আমাদের দেশের সর্বচ্চ আদালতের দাপ্তরিক ভাষা ইংলিশ। সরকারী অফিসগুলাতে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ফাইল চালাচালি চলে ইংরেজীতে! অধুনিক বাবা মা তাদের অধুনিক সন্তানদের বাবা মা ডাকাতে উৎসাহিত করার বদলে মাম্মি ডাড্ডি ডাকেই বেশি সন্তুষ্ট হচ্ছে। আর এই সকল ব্যর্থতা থেকে আমাদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে মাতৃভাষার প্রতি ঘৃণা। কেবল "অমর একুশে" ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আসলেই মাতৃভাষার প্রতি দরদ ভালোবাসা বেড়ে যায়। বসে অমর একুশের বই মেলা! অথচ মেলা শব্দটিকে ব্যবহার করা হয় বাণিজ্যিক শব্দের অর্থে! আমাদের দেশে ভাষা নিয়ে চলে ব্যবসা! কিন্তু আজ প্রযন্ত কোন দায়িত্বশীল মানুষ প্রশ্ন করে না; বাংলাদেশের একজন নাগরিক হয়ে কেন সুপ্রিম কোর্ট কিংবা সরকারী কাগজ পড়তে গেলে আমাকে ইংরেজিতে পড়তে ও জানতে হবে, কাগজগুলো কেন মাতৃভাষায় লিখিত নয়?

একটি দেশের ভাষার অবস্থান জানা যায় সেই রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণির সন্তানেরা কোন শিক্ষায় পড়ছে তা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে যারা শাসন ও শোষণ করছে তাদের কোন সন্তান দেশের বাংলা মিডিয়াম কিংবা সরকারী স্কুলে পড়তে আগ্রহী নয়। অমর একুশে নিয়ে আজকের দিনে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ভাষা নিয়ে অনেক বড় বড় ভাষণ দেবে! ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে অনেক আলোচোক আলোচনা করবে সভা হবে অথচ তাদের পরিবারের অনেকেই আছে বাংলা ভাষার এই কৃষ্টিটাকে ধারণ করে না। অথচ অনেক রক্তের বিনিময়ে অনেক ত্যাগে অর্জিত ভাষার নাম বাংলা। জাতিসংঘ আমাদের ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের বহুরাষ্ট্রে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই মাতৃভাষা দিবস পালন হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই।

এটাই বাংলাভাষার জন্য গর্ব, এটাই বাংলাদেশের গর্ব।
বাঙালীই একমাত্র জাতি, যাদেরকে রক্তের বিনিময়ে ভাষাকে অর্জন করতে হয়েছে। এটা যেমন আমাদের জন্য গর্বের তেমনি ভাষা আন্দোলন ও অর্জনের সত্তর বছর অতিবাহিত হলেও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে না, এটা লজ্জার!

আজকের এই মহান দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করি সকল ভাষা সৈনিক ও ভাষা শহীদগনের প্রতি যাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে ভাষা বাংলা আজ বিশ্বের বুকে সুমাহান। শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করি তৎকালীন ছাত্রলীগ যোদ্ধাদের, এই মহান ভাষা নিয়ে সংগ্রাম ছিলো পিতা মুজিবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের প্রথম ত্যাগ ও অর্জনের স্বারক! বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই শহীদ রফিক জব্বার সালাম বরকত সহ নাম না জানা সৈনিকদের। রক্ত দিয়ে কেনো এই ভাষা বাংলা হোক আমাদের দাপ্তরিক ভাষা, রাষ্ট্রের কাছে এটাই চাওয়া।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
বাঙালীর অবিনাশী চেতনা চিরজীবী হোক।

লেখকঃ ফুয়াদ হাসান-আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ