নিরাপদ মাতৃত্বে শেখ হাসিনার অবদান


Sifat Harun Abdullah Khan | Published: 2024-05-28 21:08:20 BdST | Updated: 2024-07-23 20:18:07 BdST

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(১) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা দেশের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে।যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেকোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে চিকিৎসা সেবাকে নিশ্চিত করতে স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালেই নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণে জীবিত থাকাকালীন সময়েই দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যেনো বাংলাদেশ সরকার তার জনগণকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে পারেন।কিন্তু জাতির মৌলিক এই অগ্রযাত্রা থেমে যায় ৭৫' এ বিপথগামী সেনাবাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু ও তার পুরো পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মত ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছিলো দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা কে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে হবে এবং জনগণের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে অন্যসকল কিছু থেকে এই অধিকারপূরণে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসেই বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন করেন এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি-২০০০ প্রণয়ন করেন।এছাড়া দেশব্যাপী স্থাপন করেন ১০,৭২৩ টি কমিউনিটি ক্লিনিক।দুর্ভাগ্যের বিষয় ২০১১ সাল পর্যন্ত এই স্বাস্থ্যনীতি নিয়েই দেশ চলতে থাকে।উক্ত সময়ের মধ্যে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও আর কোনো নীতি বাস্তবায়ন তো করতেই পারে নি বরং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করেছিলো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপার ২০১১ সালে হাতে নেওয়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো সকলের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ২০২১ সালের মধ্যে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার সর্বনিম্নে নামিয়ে নিয়ে আসা।

১৯৯৭ সাল থেকে ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন করে আসছে বাংলাদেশ সরকার।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে।সারা পৃথিবীতে মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসের জন্য সাধারণ জনগণ,সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে দিবসটি যথাযথভাবে অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের পালিত হয়ে আসছে।

সৃষ্টির শুরু থেকেই মা-সন্তানের বন্ধন চিরন্তন,শাশ্বত।সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এ বন্ধন তৈরি হয়ে যায়।সন্তান গর্ভে ধারণ করার মধ্য দিয়েই একজন নারীর মাতৃত্বের মত কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন বাসা বাধতে শুরু করে।গর্ভের সন্তানকে এই পৃথিবীর আলো দেখাতে একজন মায়ের কতই না পরিশ্রম।কিন্তু অনেক অনুন্নত দেশে পর্যাপ্ত ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল থাকায় সন্তান জন্মদানের সময় অনেক মা অকাল মৃত্যুবরণ করেন।

সাধারণত গর্ভাবস্থা, প্রসবকাল ও প্রসবের পর ৪২ দিনের মধ্যে মায়ের মৃত্যু হলে তা মাতৃমৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।২০০৯ সালে দেশরত্ন শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসের পর্যালোচনা করলেই শেখ হাসিনার অভূতপূর্ব সাফল্যের কথা পরিলক্ষিত হয়।সারাদেশে গ্রাম-বাংলার মা,বোনদের কাছে শেখ হাসিনার অভাবনীয় জনপ্রিয়তার পেছনেও ইহা গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মা ও শিশু মৃত্যুহার কমানোর কৌশলপত্রের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে প্রতি লাখ সন্তান প্রসবে মাতৃমৃত্যু হার ছিল ২৫৯।নিপোর্টের ২০০১ সালে জরিপে দেশে মাতৃমৃত্যুর হারছিল ৩২২।নিপোর্টের রিপোর্ট মতে ২০১৬ সালে মাতৃমৃত্যু হার ছিলো ১৯৬ এবং ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই হার ছিলো ১৬৮।পরবর্তীতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত সপ্তাহে ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২’অনুযায়ী ২০২২ সালে মাতৃমৃত্যু হার ছিলো ১৫৩।অর্থ্যাৎ প্রতি লাখ সন্তান প্রসবে ১৫৩ জন মারা মারা যান।

তবে জাতিসংঘের দুইটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে এই হার হলো ১২৩।যদিও জাতিসংঘ এবং বিবিএস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্থ্যকের তারতম্য দেখা যায়,তবু এই হার খুবই আশানুরূপ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন,"আমরা যদি জাতিসংঘের পরিসংখ্যান আমলে নেই তা হলে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে। আবার বিবিএসের পরিসংখ্যানকে গুরুত্ব দিলে বলতে হবে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঠিক পথে আছে।"

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।সরকারের ইনিশিয়েটিভ গ্রহণ এবং আরো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আগামী ছয়বছরের মধ্যে সরকার এই সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা যায়।

শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার জন্য অল্প সময়ে অসাধারণ কর্মগুণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা 'এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০' লাভ করেন।এছাড়া মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাকে আরো আধুনিক করে তুলতে তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ আওতায় নিয়ে আসায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী 'সাউথ সাউথ'অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।

এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরীর উদ্যোগটিকে 'শেখ হাসিনা ইনিশিয়েটিভ' নামে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার যেসকল উদ্যোগ মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা নিম্নরূপ:

১.সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু

২.পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরী,জরুরি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পরামর্শ।

৩.সংবিধানে,পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা,স্বাস্থ্যনীতি,স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা এবং পুষ্টিখাত কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব এসব বিষয়ে।

৪.৩৩৬৪ টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে।২১৮৯ টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৪/৭ প্রসবসেবা চালু আছে।

৫.পুরাতন ৯৬ টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৭০ টিন কেন্দ্রে জরুরি প্রসূতিসেবা প্রদান করা হচ্ছে।

৬.৫৯ টি জেলা হাসপাতাল এবং ১৩২ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি প্রসূতিসেবা চালু আছে।
এছাড়া ২০১০ সালে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ৩০ হাজার ধাত্রী নিয়োগের অঙ্গীকার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী যার ধারাবাহিকতায় আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ২০ হাজার ধাত্রী নিয়োগ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এসকল উদ্যোগ গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং সজাগ দৃষ্টিতে ফলোআপ করার কারণে উক্ত পদক্ষেপগুলোর সুফল সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পেরেছে।সেইসাথে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা দোরগোড়ায় পৌছায় দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকসহ এসকল উদ্যোগকে রোলমডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

বিবিএসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে মাতৃমৃত্যুর সাতটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো প্রসবকালে জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ, গর্ভকালে রক্তক্ষরণ, জটিল গর্ভপাত, গর্ভধারণে জটিলতা, ধনুষ্টংকার ও বিলম্বিত প্রসবে মৃত্যু।

আগামীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশে সকল ধরনের কারণ রোধে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সারাবিশ্বের কাছে মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে ইতিহাস হয়ে থাকবে। আর এই ইতিহাসের পাতায় সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নাম।

আজকে জন্মগ্রহণ করা প্রতিটি শিশু একদিন সেই ইতিহাস পড়ে জানবে শেখ হাসিনার নাম এবং একটি সুস্থ,সুন্দর দেশে তারা তাদের আলোকিত জীবন গড়ে তুলবে,যেখানে থাকবে সাম্য,যেখানে থাকবে প্রতিটি জীবনের মূল্য।মৌলিক অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না বরং প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে।

ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা, আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার কর্মে,আপনি বেঁচে থাকবেন গ্রাম বাংলার মা-বোনের দোয়া ও ভালোবাসায়।

লেখক
সহ-সভাপতি,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।