১৮তম বছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়


Desk report | Published: 2023-05-28 19:14:15 BdST | Updated: 2024-06-14 15:06:03 BdST

লালমাটির সবুজ ক্যাম্পাস, তার মাঝে ছোট বড় পাহাড়ের হাতছানি। যতদূর চোখ যায় শুধু নীলাচলের মতই মন কাড়ে। পাখির কিচিরমিচির শব্দ চারিদিকে ভেসে আসে। মনকে এক অজানা অনুভূতিতে জাগিয়ে তোলে। এরই মাঝে লালমাই পাহাড়ের পাদদেশ ঘিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মধ্য-পূর্বাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ মে ১৮তম বছরে পদার্পণ করেছে ক্যাম্পাসটি। প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যদিয়ে এবার দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, কুমিল্লা কোটবাড়িতে উঁচু নিচু পাহাড়, টিলা, আর সবুজের বুক চিরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায় ২০০৬ সালের ২৮ মে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম. আবদুল মঈন বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করাই এখন আমাদের নতুন ভিশন। আর এই ভিশনকে বাস্তবায়ন করার জন্য আমি চাই আমার ছাত্র, শিক্ষক এবং আমার অফিসারসহ আমাদের কমিউনিটির যারা আছে তারা সবাই যেন কাজ করে।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব ডিপার্টমেন্ট খোলা রাখার জন্য বলা হয়েছে এবং প্রাক্তন যারা আসবে তাদের স্বাগতম জানানো জন্যও বলা হয়েছে।

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সে ধারা অব্যাহত থাকুক। আমাদের সবার সহযোগিতায় আমরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাব। সেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা প্রাক্তন শিক্ষার্থী আমরা তাদের পাশে চাই। ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিক কোলাবরেশনের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। সেই সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় যারা জড়িত ছিল তাদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই কুমিল্লার মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা নগরীতে একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় তার কাঙ্ক্ষিত মান উন্নয়নের লক্ষে আমরা সবাই মিলে কাজ করব প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই আমাদের অঙ্গীকার হোক।

২০০৬ সালের ২৮ মে মাত্র ৫০ একর নিয়ে দৃষ্টিনন্দন লালমাই পাহাড়ে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন শালবন বিহারের কোল ঘেঁষে দেশের ২৬তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় অন্যতম এক উচ্চশিক্ষার আবাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে মেগা প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আড়াইশো একরের ক্যাম্পাস। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের ১৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার মেগাপ্রকল্প পাশ হওয়ার পর গেল বছরে পুরো উদ্যোমে কাজ শুরু হয় নতুন ক্যাম্পাসটির।

মাত্র ৭টি বিভাগে ৩০০ জন শিক্ষার্থী, ১৫ জন শিক্ষক ও ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে এ বিদ্যাপীঠে ৬টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন বিভিন্ন বিভাগের ১২টি ব্যাচ। তাদের অনেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে দেশ তথা মানবজাতির কল্যাণে বেরিয়েছে। তাদের পদচারণা দেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাসহ দেশের বাহিরেও বিদ্যমান।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নানাভাবে ঐতিহ্য বহন করছে। ধারণা করা হয়, মাটির নিচেও এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, আবার মাটির উপরেও বর্তমানে আছে। প্রাচীনকালে প্রাচীন বাংলার ‘সমতট’ রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল ‘লালমাই-ময়নামতী’। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে (কারও কারও মতে সপ্তম শতাব্দী) দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ওই রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ৫০০ মাইল। সপ্তম শতাব্দীতে চন্দ্রবংশীয় রাজা ভবদেব এখানে আনন্দ বিহার বা শালবন বিহার প্রতিষ্ঠা করেন।

শিক্ষা, সংস্কৃতি দিক থেকে পূর্ব থেকেই সমৃদ্ধ ছিল কুমিল্লা জেলা। কোটবাড়ি অঞ্চলের রাস্তার পাশ ঘিরে রয়েছে ক্যাডেট কলেজ, পলিটেকনিক্যালসহ বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জানা যায়, ষাটের দশক থেকে কুমিল্লাবাসীর দাবি ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার। তাদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন সরকার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সব প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রামে। এরপর থেকেই কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে কুমিল্লায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০০৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কুমিল্লার জনসভায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেন। এরপর ২০০৬ সালের ২৮ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ঠিক এক বছর পরে ২০০৭ সালের ২৮ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাতজন। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম. আবদুল মঈন নিয়োগ পান ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ৮টি নীল বাস এবং বিআরটিসির ৯টি ভাড়া বাসসহ সর্বমোট ১৭টি বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্যও যাতায়াতের জন্য রয়েছে বাস, মিনিবাস ও মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫টি আবাসিক হল রয়েছে। যেখানে ছাত্রদের জন্য তিনটি, ছাত্রীদের জন্য রয়েছে দুইটি আবাসিক হল। এছাড়াও শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে ২ ডরমিটরি ও একটি গেস্ট হাউস।

তবে প্রতিষ্ঠার ১৭তম বর্ষে এসেও মেলেনি প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসেব। হিংসাত্মক রাজনীতির কারণে বারবার সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। এখনও কাটেনি আবাসন সংকট, পুরোপুরি কাটেনি সেশনজট। চলমান রয়েছে পরিবহণ সংকট, হল ও ক্যাফেটেরিয়ায় নিম্নমানের খাবার এবং লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই সংকটসহ নিয়মিত সমাবর্তন না করার ব্যর্থতা।

প্রিয় বিদ্যাপীঠকে ঘিরে প্রত্যাশা থাকবে শিক্ষা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্পচর্চায় বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সেরা র‍্যাংকিং এ অবস্থান করবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আরও বেশি অবদান রাখবে। জন্মদিনের শুভক্ষণের প্রাণের ক্যাম্পাসের প্রতি রইলো নিরন্তর ভালোবাসা ও শুভকামনা।