আসলেই কি আলোর গতিতে পৌছানো সম্ভব?


Dhaka | Published: 2022-03-10 14:56:00 BdST | Updated: 2022-05-20 20:37:51 BdST

জি.এম তাহসিন হামিম
মানুষ এখন পর্যন্ত ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৪০ হাজার কিলোমিটার গতি অর্জন করতে পেরেছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির যতই উন্নতি সাধিত হোক না কেন মানুষ সর্বোচ্চ আলোর গতির 99.99 শতাংশ গতি অর্জন করতে পারবে। একমাত্র ভরহীন বস্তু অর্থাৎ যে বস্তুর ভর শূন্য। সেই সকল বস্তুর সর্বোচ্চ আলোর গতি অর্জন করতে পারবে। আপনাদের মধ্যে যারা sci-fi মুভি দেখে থাকেন তারা অবশ্যই এমন অনেক মুভি দেখেছেন যেখানে আলোর চেয়ে বেশি বেগ অর্জন করে টাইম ট্রাভেল দেখানো হয় যা আমাদেরকে পুলকিত করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানকে যততা জেনেছি এবং বুঝেছি সেই অনুযায়ী আলোর চেয়ে বেশি বেগে অর্জন করা সম্ভব নয়, এবং সর্বোচ্চ আলোর বেগ ঐ সকল বস্তুই অর্জন করতে পারবে যাদের ভর শূন্য।
১৯০৫ সালে আইনস্টাইন আপেক্ষিকতার যে বিশেষ তত্ত্ব নিয়ে আসেন তার একটি স্বীকার্য ছিল, শূন্যস্থানে এবং বায়ুমাধ্যমে সকল পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর বেগ সমান। আলোর উৎস এবং পর্যবেক্ষকের বেগ আলোর বেগকে প্রভাবিত করতে পারে না। অন্যকথায় আলোর চেয়ে দ্রুত বেগ অর্জন করা সম্ভব নয়।
ব্যাপারটি একটু জটিল হয়ে গেল চলুন একটু সহজে বোঝা যাক! উপরের কথাগুলো থেকে হয়তো আপনাদের সহজেই একটাই প্রশ্ন মাথায় ঘুরছে কেন আলোর থেকে বেশি বেগ অর্জন করা সম্ভব নয়? কেনই বা ভরহীন বস্তু সর্বদায় আলোর বেগে গতিশীল থাকবে?
এই মহাবিশ্বে এমন কোন বস্তু নেই যা আলোর চেয়ে বেশি বেগ অর্জন করতে পারবে বা আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারবে। যার ফলে আলোর গতিকে বলা হয় Cosmic Speed Limit । অর্থাৎ সর্বোচ্চ আলোর বেগ অর্জন করা সম্ভব, তাও আবার একমাত্র ঐ সকল বস্তু আলোর বেগ অর্জন করতে পারবে যার ভর শূন্য। এবং এই বিষয়টি মহাবিশ্ব অবস্থান করার সকল বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে যদি মহাবিশ্বের কথা বলেন তবে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রযোজ্য নয়, কারণ বিগ ব্যাং এর পর থেকে মহাবিশ্ব আলোর চেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছে এবং এখনও আলোর চেয়ে বেশি বেগে প্রসারিত হচ্ছে।


কেন আলোর চেয়ে বেশি বেগ সম্ভব নয়?

আলোর চেয়ে বেশি বেগ অর্জন করা সম্ভব নয় কারণ আলোর চেয়ে বেশি বেগ causality principle কে ভঙ্গ করে সহজ ভাষায় কার্যকারণ নীতি কে মানে না। বিষয়টিকে আরো একটু সহজে বোঝার যাক! আমরা যদি একটি টিমকে ভাঙ্গা অবস্থাই দেখি তবে আমরা বলতে পারি যে ডিমটি নিচে পড়েছে এবং ভেঙে গিয়েছে অর্থাৎ প্রথমে পড়েছে তারপর ভেঙেছে। এখানে পঢ়ে যাওয়াটা কারণ cause বা কারণ এবং ভেঙ্গে যাওয়াটা effect বা প্রভাব। এখন আলোর চেয়ে বেশি বেগ কিভাবে এই causality principle কে ভঙ্গ করে?
আমাদের এই মহাবিশ্বের সব কিছু আমরা আলোর মাধ্যমে দেখতে পাই। সুতরাং আমরা ইফেক্ট আগে দেখবো তারপর কারণ দেখতে পাবো এইটাই causality principle কে ভঙ্গের মূল কারণ।


আলোর চেয়ে দ্রুতবেগ অর্জন করার ঘোষণা এসেছিল
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে পদার্থবিজ্ঞানী অ্যান্টোনিও এরিডিটাটো (Antonio Ereditato) আলোর চেয়ে দ্রুত বেগ অর্জন করা গেছে এমন একটি বক্তব্য দেন যার পরিপেক্ষিতে বিজ্ঞানী মহলে হৈচৈ পড়ে যায় । অপেরা প্রকল্পের ১৬০ জন বিজ্ঞানীদের একটি টিম ইউরোপের CERN ("Conseil Européen pour la Recherche Nucléaire") সাথে এক যৌথ পরীক্ষার পর জানায় তারা দেখতে পেয়েছেন নিউট্রিনো কণিকা আলোর চেয়েও দ্রুত বেগে চলতে পারে।
আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুসারে এমনটি হবার কথা নয়, আর এরকম হলে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের অনেক ধারণাই রাতারাতি বদলে যেতে বাধ্য।
পরে দেখা যায় বিজ্ঞানীদের এ পর্যবেক্ষণে ত্রুটি ছিল।
অবশ্য অ্যান্টোনিও এরিডিটাটো (Antonio Ereditato) এবং তার টিমের বিজ্ঞানীরা কখনোই দাবি করেননি যে তাদের পর্যবেক্ষণ শতভাগ নিভুল। তারা বরং অন্যান্য গবেষকদের তাদের এ পর্যবেক্ষণ যাচাই করে দেখতে অনুরোধ করেছিলেন।
আসলে যা ঘটেছিলো
নিউট্রিনো কণিকার পরিভ্রমণে কত টা সময় লেগেছিল তা যে সেন্সরের মাধ্যমে কাজ করত সেটি আবার অত্যন্ত নিখুঁত জিপিএস (Global Positioning System) এর সাহায্য নিত। পার্টিকেল এক্সিলারেটর বা কণা ত্বরকে কেবলের সংযোগে ত্রুটি থাকায় নিউট্রিনোর ভ্রমণের সময় ৭৩ ন্যানোসেকেন্ড কম মনে হয়েছিল। মাসের পর মাস বার বার পরীক্ষা করেও বিজ্ঞানীরা একই রকম তথ্য পাচ্ছিলেন। পার্টিকেল এক্সিলারেটরের মত জটিল যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে চালানো পরীক্ষায় এ ধরনের ভুল অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে এ ঘটনার পর অ্যান্টোনিও এরিডিটাটো (Antonio Ereditato) ইস্তফা দিয়েছিলেন।


আলোর বেগ অর্জনে বিকল্প চেষ্টা
পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র যেসব কণিকা (যেমন ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন) রয়েছে সেগুলো অনেক দ্রুত বেগে ছুটতে পারে। ১৯৬০ সালে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রনকে দ্রুত থেকে দ্রুততর বেগে চালিত করার প্রচেষ্টা করেন। সমধর্মী চার্জ বা আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। ইলেকট্রন ঋণাত্মক চার্জগ্রস্ত, তাই অন্য কোন ঋণাত্মক চার্জগ্রস্ত বস্তু কাছাকাছি রাখলে সেটি ইলেকট্রনকে বিকর্ষণ করবে। কাজে ই চার্জের মাত্রা যত বাড়ানো হবে ইলেকট্রনকে তত দ্রুতবেগে ধাবিত করা যাবে। এজন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়।
প্রযুক্ত শক্তির মাত্রা বাড়িয়ে ইলেকট্রনের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছানো গেলেও কখনোই আলোর বেগ অর্জন করা সম্ভব হয়নি।যে বস্তুর ন্যূনতম কিছুটা হলেও ভর রয়েছে সেই বস্তু কখনো আলোর বেগ অর্জন করতে পারবে না এবং আলোর চেয়েও বেশি বেগ সেটা তো এক ধরনের বিলাসিতা বলা যায়। যদিও কিছু কনসেপ্ট রয়েছে যার মধ্যে দেখা যায় আলোর চেয়ে বেশি বেগে ট্রাভেল করা সম্ভব এবং এই কনসেপ্টগুলো হচ্ছে ওর্য়ামহোল, ওয়াপট্রাইপ ইত্যাদি। যদিও এই কনসেপ্ট গুলো এখনো শুধু থিওয়োরীতেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া অনেকেই মনে করেন এক ধরণের মৌলিক কণা থাকতে পারে যার নাম tachyon। এই tachyon আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে চলতে সক্ষম। কিন্তু এই tachyon পার্টিকেল এটিও থিয়োওরীতেই সীমাবদ্ধ।