শখ থেকে শুরু, উদ্যোক্তা সামিহার ঘরে বসেই আয় লাখ টাকা


আব্দুল্লাহ রাকিব | Published: 2023-03-10 09:11:01 BdST | Updated: 2024-05-25 13:17:57 BdST

'পাটকে সোনালি আঁশ বলা হলেও বর্তমানে এ নিয়ে মানুষের আগ্রহ একেবারে তলানীতেক্ষতির পরিমান বাড়তে থাকায় দেশের জুট মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছেঅথচ, এদেশ থেকে কাঁচামাল নিয়ে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করে বিদেশি কোম্পানিগুলো। সেগুলো আবার হাত বদল হয়ে দেশে আসে আমদানি পণ্য হিসেবে। এর পেছনের কারণগুলোর মধ্যে— চিরায়ত ধারা থেকে বের হতে না পারা এবং দক্ষ জনশক্তি উৎপাদনে ব্যার্থতা— বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমরা চাই দক্ষ জনবল তৈরী করে এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এই শিল্পকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করতে,’ ডেকোরালের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে বলছিলেন ডেকোরালের সত্বাধিকারী সামিহা হোসেন।

এ শিল্প ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বদ্ধপরিকর তিনি। তার কথা এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা থেকে তার কিছুটা অনুমান করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি এ নিয়ে (দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার) হোম ডেকোর তৈরির কথায় ভাবছি। সেজন্য আমাকে আগে এ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করতে হবে— তারজন্যে আগে আমি পড়াশোনা করতে চাই, তা চলমান রয়েছেও। তারপরেই এ বিজনেস দেশের মধ্যেই শুরু করবো।’

শুধু পাট নয় হোগলা পাতাসহ দেশীয় অন্যান্য কাঁচামালের ব্যবহার করে হোম ডেকোর কীভাবে তৈরি করা যায় তার রূপরেখাও প্রণয়ন করেছেন তারা। তবে ব্যাবসায়িক গোপণীয়তা রক্ষায় সেগুলো খোলাশা করতে নারাজ এই উদ্যোক্তা।

শুরুর গল্প

দুই সন্তানের মা সামিহা হোসেন। ২০১৭ সালে তার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়— নাম রাখেন শারলিজ। ছোট্ট শারলিজের জন্য নতুন নতুন জামা-কাপড় ও খেলনা কেনা রীতিমত শখ হয়ে উঠছিল সামিহার। ছোট্ট শারলিজের জন্য শখ করে কেনা সেসব জিনিসপত্র সময়ের ব্যবধানে অকেজো হয়ে উঠেছে। শখের সেসব পণ্য হয়ে উঠেছে ফেলনা।

এসব ফেলনা জিনিসের সমাধান খুঁজতে ফেসবুকের সাহায্য নেন সামিহা। সেখানে খোঁজ পান পুরাতন জিনিস ক্রয় বিক্রয়ের একটি গ্রুপের। অনেকদিন পর্যবেক্ষণ করার পর ঠিক করলেন, বাচ্চার সেসব পুরাতন জামাকাপড় বিক্রি করে দিবেন।

Caption

সেই ভাবনা থাকলেও আগ্রহ পাননি তেমন, পরে কৌতুহলী হয়েই সেই গ্রুপে একটি পোস্ট দেন। বাচ্চার পুরাতন জামা বিক্রি করতে আগ্রহী জানিয়ে দেওয়া সেই পোস্টের পর অনেকেই তার সাথে যোগাযোগ করেছেন। কেউ কিনতে চেয়ে যোগাযোগ করেছেন, তো আবার কেউ যোগাযোগ করেছেন সেসব জিনিসের প্রাপ্তিস্থান জানতে। যাইহোক, প্রথম পণ্যটি বিক্রি হয়ে গেল স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে। তারপর একে একে বিক্রি করে দিলেন শারলিজের সব পুরাতন জিনিসপত্র।

তারপর বাসা পরিবর্তনের সময় অনেক পুরাতন হোম-ডেকোর ফেলে দেওয়ার জন্যে জড়ো করা হলো। পরে তিনি সেসবও পুরাতন জিনিসও গ্রুপের মাধ্যমে বিক্রি করে দেন। সেসব পোস্টে মানুষের সাড়া পেয়ে তিনি বুঝতে পেরেছেন তার পছন্দসই জিনিসের চাহিদা নেহাত কম নয়। তার আগ্রহ ও ভালো লাগা কাজ করলেও পরবর্তীতে করোনাভাইরাসের কারনে শুরু করা হয়ে ওঠেনি। দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও একটি বছর।

২০২১ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। বসে বসে গল্প করছিলেন বাড়ির গৃহকর্মীদের সাথে। এমন সময় কথা ওঠে উৎপাদন সক্ষমতার নিয়ে। গৃহকর্মীরা বলে ‍উঠেন, ‘আপা আমরা তো আয় করি, কিন্তু আপনার তো সেই অর্থে কোন আয় নাই।’ তিনি ভাবতে থাকলেন তা নিয়ে, গৃহকর্মীদের কথাই সঠিক হিসেবে পেলেনদেখলেন, উচ্চ মধ্যবিত্তের সংসারে মহিলাদের অর্থনৈতিক অবদান নেই। সে থেকে ভাবলেন তিনি আর পাঁচজনের মতো হবেন না। এবারে তিনি বদ্ধপরিকর— কালক্ষেপন না করেই শুরু করবেন নিজের ব্যবসায়।

বলছিলাম, ডেকোরালের স্বত্বাধিকারী সামিহা হোসেনের অনলাইনব্যবসা জগতে প্রবেশের গল্প

শুরুটা পুরাতন জিনিসপত্র দিয়ে হলেও শেষটা এতেই করার মোটেও ইচ্ছে ছিলো না তার। অনলাইনে নিজের শপ শুরু করার কথা ভাবতে শুরু করলেন।

খুবই নিবদ্ধ হওয়ায় আর দশজনের মত ব্যবসা শুরুর পর কাজের সেক্টর ঠিক করার পক্ষপাতি নন তিনি। গুনে গুনে পা ফেলার পক্ষপাতিফিজিবিলিটি টেস্ট করেই নামতে চান ব্যবসায়। সব যাচাই বাচাই শেষে ঠিক করলেন হোম ডেকোর নিয়েই কাজ করবেন।

১০ হাজার টাকা বছর ঘুরে দশ লাখ!

নিজের সঞ্চয় দশ হাজার টাকা নিয়েই শুরু করলেন ব্যবসায়। প্রথমে দেশ থেকে কিছু পণ্য কিনে তা দিয়ে শুরু করেন। পরবর্তীতে ঠিক করলেন, বিদেশ থেকেও পণ্য আনাবেন তিনি।

যেই ভাবা সেই কাজ, চায়নার এক ভেন্ডরের সাথে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে তিনি প্রথম চালান আনেন ডেক্সটপ ক্যালেন্ডার। শিশুদের জন্য ব্যবহার্য সেসব ক্যালেন্ডার মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল ভালোমতই। প্রথম চালানে যা আসলো তা কমই পড়লো মানুষের চাহিদার তুলনায়। তার দেখাদেখি সে ক্যালেন্ডার আনালেন অন্যান্য কোম্পানিও। তারপর অন্যান্য কোম্পানিগুলোরও আনা শুরু করার পর সেগুলো নিয়ে আর আগ্রহী হননি তিনি। নতুন নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন বলে তিনি সবসময় খোঁজ করেন নতুন নতুন ডিজাইনের হোম ডেকোরের। তিনি বলেন, ‘আমি দেশের মানুষকে নতুন নতুন হোম ডেকোরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই এবং সে লক্ষ্যে কাজ করছি।’

তার এই নতুন নতুন জিনিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজটি মানুষের পছন্দই হয়েছিল। তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

ফেসবুক পেইজের আকার বাড়ছে একই সাথে বাড়ছে ব্যবসার আকারও— বাড়ছে বেচা-কেনা। গতবছরের সেপ্টেম্বেরে দশ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করা হোম ডেকোর বছর ঘুরতেই হয়ে উঠেছে দশ লাখ টাকার ব্যবসায়। ব্যবসার পরিস্থিতির কথা বলার পর তিনি বলেন, ‘নাফিউর (সামিহার স্বামী) সবসময়ই আমাকে সাপোর্ট করতো। তবে মাঝে মাঝে আমার কষ্ট আর লাভের হিসেব মিলিয়ে এসব বন্ধ করার পরামর্শই দিতো।’ একটু জিরিয়ে, মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে বললেন, ‘এখন সে আমার ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে চায়।’

এখানে পাওয়া যাবে

ঘর সাজানোর উপকরণে ভিন্নতা ও নতুনত্ব আসতে থাকে প্রতিনিয়ত। সামিহা তার ফিজিবিলিটি টেস্টের সময়ই এসব বিষয়ে জেনেছেন। তাই এই প্রতিযোগিতা তার পরিচিত, মাঠও পরিচিত। মন দেন নতুন এবং ‘ইউনিক’ জিনিসের প্রতি।

সোর্সিংয়ের জন্যে দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন শপে ঢুঁ মারার অভ্যাসও সেই থেকে। তাই তিনি জানতেন কই পাওয়া যাবে কাঙ্খিত সেসব পণ্য। পছন্দ করলেন চীনের বিভিন্ন শপের কিছু পণ্য। সেগুলো ভেন্ডরকে ছবি পাঠিয়ে জানতে চাইলেন বাংলাদেশে পাঠানো যাবে কি না। ওপাশ থেকে হ্যাঁ সূচক উত্তর, হয়ে গেল শুরুটা।

একে একে আনতে শুরু করলেন বিভিন্ন পণ্য। এর শুরুটা হয়েছিল, বাচ্চাদের টেবিল সাজানোর উপযোগী ডেক্সটপ ক্যালেন্ডার দিয়ে। একে একে যুক্ত হতে থাকে সব পণ্য। তবে এসবের মাঝে কিছু জিনিসের কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

স্টিলের বিভিন্ন কাঠামো, সেগুলো ধরে আছে কাঁচের টিউব। টিউবের ভেতরে পানি রেখে তার ভেতরে ফুল। আকর্ষণীয় কাঠামোর কারনে এই ফুলদানী হয়ে উঠেছে মানুষের অন্যতম পছন্দ। কার পার্কিং করার পর পেছনের ভেতর থেকে কোন গাড়ি বের করার ঝামেলার সাথে প্রায় সবাই পরিচিত। বিপত্তি দীর্ঘ হয় যখন মালিককে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেইসব সমস্যার সমাধানে এই কার পার্কিং বোর্ড কাজ দিবে। এই বোর্ডে দেওয়া থাকবে মালিকে নাম্বার ও ডিটেইল।

রয়েছে হরেক রকমের পুতুল, পাট ও হোগলা পাতা দিয়ে তৈরি করা ফ্লাওয়ার পট, উইন্ড চাইমসহ নানা পদের হোম ডেকোর। আছে সামিহার নিজের তৈরি জিনিসও। রেজিন দিয়ে তৈরি করা বোর্ড ও কাদামাটির তৈরি পণ্যও।

এসব পণ্য কিনতে হলে যেতে হবে ডেকোরালের ফেসবুক পেইজ Decorall এ। তবে এই নভেম্বরেই ধানমন্ডিতে চালু হবে এর আউটলেট, তখন সেখানে পণ্য পরখ করে দেখারও সুযোগ পাবেন ক্রেতার।

ছবি ও ক্যাপশনে গুরুত্ব দিতে হবে

শুরু থেকেই তিনি তীক্ষ্ নজর রাখতেন গ্রুপগুলোর পোস্টের দিকে। পর্যবেক্ষণ ও অনলাইন শপে কেনা বেচা করে সামিহা বুঝতে পারেনসঠিক ছবি নির্বাচন ও সেই ছবির যথাযথ ক্যাপশন দেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, পেইজে ক্রাউড পাওয়া অনেকাংশে নির্ভর করে যথাযথ ছবি ও এর ক্যাপশনের উপর। যদি এই কাজটি যথাযথভাবে করা যায় তবে অর্ধেক কাজ শেষ।’

তবে ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকার আহবানও করেন তিনি। বলেন, ‘লাইটিংয়ের কারসাজি করে অনেকে পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি তোলেন। পরবর্তীতে ক্রেতারা তা কিনে ছবির সাথে মিল না পেয়ে হতাশ হয়ে যান।’ তিনি সে দিকে যেতে চান না। রিটার্ন কাস্টমারে বিশ্বাসী বলেই তিনি পণ্যের ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকেন।

আর ক্যাপশনের ক্ষেত্রে সামিহাকে খুঁতখুঁতেই বলা চলে। তাইতো কর্মী থাকা সত্ত্বেও নিজেই প্রতিটি প্রোডাক্টের ছবি ও ক্যাপশন লিখার কাজ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এর মাধ্যমে যেমন ক্রেতারা আকর্ষিত হয় তেমনি বিকর্ষিতও হয়ে থাকে।’  

‘ওয়ার্কস্পেসে’ কাজ করবেন তরুরা

সামিহা তার ভবিষ্যত পরিকল্পনাও সাজিয়েছেন সুনির্দিষ্টভাবেই। ভেবে রেখেছেন কীভাবে শুরু করলে পাট, হোগলা পাতাসহ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে। ঠিক করে রেখেছেন এসব কাজের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবেন তরুণদের। এতে করে এই শিল্প বেঁচে থাকবে বহুকাল, প্রচারণাও পাবে একইসাথে কর্মসংস্থান হবে তরুণদের।

‘হোগলা পাতা ও পাট দিয়ে হোম ডেকোর বানানোর ক্ষেত্রে কাজ করবেন তরুণদের নিয়ে। এতে করে এই শিল্প কমপক্ষে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর স্থায়ী হবে। সেখানে যদি অপেক্ষাকৃত বড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন তবে তার স্থায়ীত্ব হবে ১৫ থেকে কুড়ি বছর,’ বলেন সামিহা। দেশীয় শিল্পকে অনন্য মাত্রায় তুলে ধরতে চান এবং একইসাথে একে রপ্তানিযোগ্য করে তুলতে চেষ্টা করবেন।

দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরির পরিকল্পনাই তার প্রধান লক্ষ্য তবে রেজিনের তৈরি ডেকোর আইটেমের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক তাই তিনি এসব পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান কম মূল্যে। তিনি বলেন, ‘আমরা ডেকোরালের যে ফ্যাক্টরিতে বাইরে কাঁচামাল এনে কাজ করলেদামও কমবে একই সাথে দেশে কর্মসংস্থানেরও তৈরি হবে।

তবে প্রথমেই তার এই চিন্তা আসেনি— আমদানি করা পণ্যে জমে উঠেছে ব্যবসাযখন ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে বেশি টাকা পাঠানোর প্রয়োজন হ তখন দেশের ভিতরে ফ্যাক্টরি করার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করেন।

প্রথমদিকে যখন আমদানি করার জন্যে ১৫০ ডলার কিংবা ২০০ ডলার বাইরে পাঠাতে হতো তখন বিষয়টি পীড়া দিত না। তবে যখন এই ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকলো তখন থেকে দেশের টাকা বাইরেপাঠানোর বিষয়টি পীড়া দিতে শুরু করে,’ বলছিলেন সামিহা।